ক্যাডারদের জন্য ‘পুলিশের প্রেম’!
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:৩০
ছাত্রলীগ ক্যাডাররা ‘অদৃশ্য শক্তি’র কারণেই বেপরোয়া। আর এ কারণে ছাত্রলীগ নেতাদের নির্দেশেরও তোয়াক্কা করে না তারা। তাই চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে নানা অপকর্মেই জড়িত এসব ক্যাডার। আর বদনামের সব দায়দায়িত্ব বহন করতে হচ্ছে ছাত্রলীগকেই। এ বক্তব্য ছাত্রলীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার। তারা বলেছেন, আর পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না ভয়ে। আর এ কারণেই অনেক পুলিশ কর্মকর্তা এদেরকে সহায়তা করে থাকে। যাকে পুলিশের অলিখিত ‘পুলিশের প্রেম’ও বলা যেতে পারে।
ছাত্রলীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা কয়েকটি উদাহরণ টেনে বলেন, ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগের কতিপয় সদস্য নিউ মার্কেটসহ আশপাশ এলাকায় নিয়মিত চাঁদাবাজি করে আসছে। তাদের কাছে ঐ এলাকার ব্যবসায়িরা জিম্মি। এ অভিযোগের ভিত্তিতে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন সদস্যকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু বহিষ্কার করার পর তারা ‘অদৃশ্য শক্তি’র জোরে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এখানেই শেষ নয়। তাদেরকে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করে নিউ মার্কেট থানার একজন সাব-ইন্সপেক্টর। বিষয়টি শোনার পর ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির তরফ থেকে বিষয়টি ঢাকা মেট্রেপলিটন পুলিশের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তাকে জানানো হয়। এক পর্যায় তারা তদন্ত করে ঐ সাব-ইন্সপেক্টরকে বদলি করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রমনা জোনের একজন পুলিশ কর্মকর্তার প্রবল আপত্তির কারণে ডিএমপি সদর দফতর ঐ সাব-ইন্সপেক্টরকে বদলি করতে ব্যর্থ হয়। এখনও ঐ সাব-ইন্সপেক্টর নিউ মার্কেট থানায় বহাল রয়েছেন। তিনি আরো বলেন, ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে কয়েক মাস আগে অভিযোগ আসে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ আশপাশ এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ নানা অপকর্মে জড়িত। এ ঘটনা শোনার পর ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সেক্রেটারিসহ কয়েকজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সফর করেন। তখন তারা দেখেন ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ লাঠিসোঁটা, চাপাতি নিয়ে ক্যাম্পাসে অবস্থান করছেন। এ অবস্থায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ৩৭ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়। ভিসিকেও অনুরোধ জানান হয়, এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের। একই সময় থানায় পুলিশকেও জানানো হয়। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোন ধরনের এ্যাকশন নেয়নি। বরং তাদের সহায়তা দিয়েছে সেই ‘অদৃশ্য শক্তি’ ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। ফলে তারা আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠে। এর প্রমাণও দিয়েছে পথচারী বিশ্বজিত্ দাসকে হত্যা করে। এ ব্যাপারে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও এসব বক্তব্য সমর্থন করেন। তিনি বলেন, ছাত্রলীগ একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠন। কিছু সুবিধাভোগী ও চাটুকদারের কারণে ছাত্রলীগকে নানা বদনামের দায়ভার বহন করতে হচ্ছে। তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের। কিন্তু ‘অদৃশ্য শক্তি’র মদদে এদেরকে দমানো যায়নি। যার পরিণতিতে নিরীহ দর্জি দোকানী, পথচারী বিশ্বজিত্ দাসের মর্মান্তিক ঘটনার অপবাদ বহনকে করতে হচ্ছে ছাত্রলীগকে। অথচ নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের অনেক আগেই বহিষ্কার করা হয়েছিল। পুলিশের কতিপয় কর্মকর্তাও এদের ( বহিষ্কৃত) সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ছাত্রলীগ নামধারী ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে তাদের কিছু সমস্যা রয়েছে। আধিপত্য ধরে রাখার জন্য সরকারদলীয় স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী নেতা এদেরকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। পাশাপাশি এসব ক্যাডার বিভিন্ন অবৈধ সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য থানা পুলিশের কিছু সদস্য সহায়তা করে। আর এসব কারণেই পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা কোন ধরনের ঝুঁকি নিতে চান না। কারণ শেষটায় নিজেই বলি হতে হয়।
তবে ছাত্রলীগ ক্যাডারদের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ককে ‘পুলিশ প্রেম’ বলতে তিনি নারাজ। তার কথা হলো, ডিএমপিতে কোন পুলিশ কর্মকর্তার বদলির সহজে হয়ে ওঠে না। এ জন্য কারো না কারোর ‘আর্শীবাদ’ থাকতে হয়। ফলে সরকারদলীয় নেতাদের নির্দেশ মতই সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই তাদেরকে কাজ করতে হয়।
অপরদিকে সাম্প্রতিক সময় ফেল করা ছাত্রদের পাস করিয়ে দেবার দাবীতে ছাত্রলীগ ক্যাডারা তেজগাঁও পলিটেকনিকে ব্যাপক ভাংচুর করে। তাদের হামলায় তিনজন শিক্ষকসহ ১০ জন আহত হয়। কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য তেজগাঁও পলিটেকনিক বন্ধ ঘোষণা করেন। পলিটেকনিকের একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, পুলিশের সামনেই ছাত্রলীগ ক্যাডারা ভাংচুর ও শিক্ষকদের মারধর করে। কিন্তু পুলিশ ছিল সম্পূর্ণ নির্বিকার। জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও পুলিশ তাদের গ্রেফতারে পুরোপুরি নির্বিকার।