নির্বাচনকে সামনে রেখে সাজানো হচ্ছে প্রশাসন!
প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:০৫
আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান মেয়াদে জনপ্রশাসনে শেষদফা পদোন্নতি, নিয়োগ ও রদবদলের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ দফায় পদোন্নতি হবে অতিরিক্ত, যুগ্ম ও উপসচিব পদে। আর রদবদল বা নিয়োগ হবে শীর্ষ পদ সচিব ও মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে। নির্বাচনের আগেভাগে এ ধরনের উদ্যোগকে নির্বাচনে সরকারি চাকরিজীবীদের ব্যবহারের অভিপ্রায় বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন। তবে আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে উপজেলা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) প্রত্যাহার বা বড়সড় রদবদল করা সম্ভব হবে না। কেননা আগামী ২০১৪ সালের আগে ইউএনও হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করছেন না কোনো কর্মকর্তা।
নির্বাচনের আগে উপজেলা ও জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রশাসনের শীর্ষপদে নিজেদের অনুগত বিবেচনায় কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ আগের মতোই রয়েছে। এরকম বাস্তবতায় অতীতে সকল সাধারণ নির্বাচনের আগে বিরোধী দল বা জোটের পক্ষ থেকে প্রশাসনের সমতল মাঠ তৈরির দাবি উঠে। এখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকেই আঁকড়ে বিরোধীরা আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।
সাবেক একাধিক সচিবসহ বিএনপি-জামায়াত সমর্থক বলে পরিচিত একটি গোষ্ঠী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অনুগত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করার কাজও চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে বিএনপিসহ বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে অতীত রীতি অনুসরণ করেই প্রশাসনে রদবদল ও কিছু কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির দাবি উত্থাপন করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
অন্যদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নির্বাচনের সম্ভাব্য ১০ মাস বাকি থাকতেই জেলা প্রশাসক পর্যায়ে রদবদল করার কাজ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে ফেরুয়ারি মাসেই অন্তত ২০ জেলায় ডিসি পদে রদবদল ঘটানো হবে। ইতিমধ্যে নবম থেকে ১৩তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে যোগ্য জেলা প্রশাসকদের তালিকা (ফিট লিস্ট) তৈরির কাজও চূড়ান্ত পর্যায়ে। এসব কর্মকর্তার মৌখিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আব্দুস সোবহান সিকদার দেশে ফিরলেই যোগ্য ডিসির তালিকা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর এ তালিকা থেকে ডিসি নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। পরবর্তীতে বিরোধীদের দাবি উঠলে বা নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হলেও যাতে কিছুৃ পদে পরিবর্তন করা যায় সেজন্য ৫০ জনের মতো ডিসি হওয়ার যোগ্যতা অর্জনকারী কর্মকর্তা মজুত থাকবে সরকারের হাতে।
এছাড়া অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব এবং উপসচিব এই তিন স্তরে কর্মকর্তার পদোন্নতির তালিকাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। অতীতে বিভিন্ন পদে পদোন্নতি বঞ্চিত ১২শ’ কর্মকর্তার মধ্যে এবার ৫০/৬০ জনের মতো বিবেচনায় নেয়া হতে পারে। তিনটি পদে তিন শতাধিক কর্মকর্তার পদোন্নতি দেয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আগামী নির্বাচনের আগে শত দাবি উঠলেও ব্যাপকহারে ইউএনওদের প্রত্যাহারের সুযোগ থাকছে না। কারণ এখন ইউএনও পদে নিয়োগের মতো ৫০ জন কর্মকর্তা রয়েছে। কোথাও শৃংখলাজনিত কারণে কাউকে সরানোর প্রয়োজন হলে এদের মধ্যে থেকে নিয়োগ দেয়া হবে। তবে বড় রদবদলের প্রশ্ন আসলে সেক্ষেত্রে সরকারের কিছুই করার থাকবে না। কারণ আগামী ২০১৪ সালের আগে ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের কেউ ইউএনও হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবেন না। এখন ২৪ ও ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের বেশিরভাগই ইউএনও। ২৪তম ব্যাচ আগের মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত আর ২৫তম ব্যাচ বিএনপি-জামায়াত জোটের ২০০১-২০০৬ মেয়াদের প্রথম ব্যাচে নিয়োগপ্রাপ্ত।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারি কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে সরকার বঞ্চিত বা পদোন্নতি প্রত্যাশীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করতে চেয়ে থাকতে পারে। পদোন্নতি সময় মতো না হলে কর্মকর্তারা হতাশ থাকেন-সে মতো অবস্থায় পদোন্নতি দেয়া হলে সঙ্গত কারণে কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকবেন বলে ধারণা করা হয়। তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশার বিরুদ্ধে প্রকৃতপক্ষে সরকারি কর্মকর্তাদের কিছুই করার থাকে না। কিন্তু নির্বাচনের আগেভাগে এমনসব পদক্ষেপ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ককে বাড়ানো হয়। পরে এসব কর্মকর্তা অহেতুক হয়রানির শিকার হন।
এদিকে নির্বাচনকালীন সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ-বদলির নিয়ম, ডিসিরা কিভাবে রিটার্নিং অফিসার এবং ইউএনওরা কিভাবে সহকারি রিটার্নিং অফিসার হয়ে থাকেন এবং তাদের দায়-দায়িত্ব ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, ইসি থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রশ্নের জবাব দেয়া হয়েছে।
সূত্র বলছে, সরকারের মধ্যে সার্বিক নির্বাচনী প্রক্রিয়া কার্যত শুরু হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছে এ সরকারের সময়ে প্রতিশ্রুত উন্নয়ন কাজ দ্রুত শেষ করে উদ্বোধনের কার্যক্রম গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ধরনের কার্যক্রম দ্রুত করা হয়ে থাকে।