কিছু প্রশ্নের উত্তর চায় বিশ্বব্যাংক

পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার ব্যাপারে কিছু প্রশ্নের উত্তর চেয়েছে বিশ্ব ব্যাংক প্যানেল। দায়ের করা এই মামলার তদন্ত পর্যালোচনা করতে বাংলাদেশে আসার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে প্যানেল। এছাড়া ষড়যন্ত্রের মামলার তদন্তের ব্যাপারে তদন্ত কর্মকর্তাদের দেশীয় আইন-কানুন আবারো বিচার বিশ্লেষণ করার পরামর্শ দিয়েছে তারা। প্রয়োজনে বিশ্ব ব্যাংকের প্যানেল দুদক কর্মকর্তাদের কারিগরি সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছে। সম্প্রতি বিশ্ব ব্যাংক দুদকে একটি চিঠি দিয়ে এসব কথা জানিয়েছে। গত ১৭ ডিসেম্বর মামলার পর বিশ্ব ব্যাংক এই প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানালো দুর্নীতি দমন কমিশনকে। বিশ্ব ব্যাংকের এই চিঠিকে দুর্নীতি দমন কমিশন ইতিবাচক বলে মনে করছে। এ ব্যাপারে দুদক কমিশনার মো. সাহাবউদ্দিন চুপ্পু দাবি করে বলেছেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিশ্ব ব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের কাছে এজাহারের কপিটি দাখিল করার পর বিশ্ব ব্যাংক সন্তোষ প্রকাশ করে তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তবে ঢাকায় অবস্থানরত দাতাদের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র ইত্তেফাককে বলেছেন, দুদকের সঙ্গে বিশ্ব ব্যাংকের গঠিত আন্তর্জাতিক প্যানেলের যোগাযোগ আছে। বিশেষজ্ঞ প্যানেল সম্প্রতি একটি চিঠি দিয়েছে দুদককে। এই চিঠিতে কিছু বিষয়ের পরিষ্কার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। দুদকের কার্যক্রম সন্তোষজনক অথবা সন্তোষজনক নয়— এমন কোনো মতই প্রকাশ করা হয়নি। কি ধরনের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে প্রশ্ন করা হলে দাতাসূত্র বলেন, সন্দেহজনক কারও কারও নাম এজাহারে আছে, আবার কারো কারো নেই। না থাকলে কেন নেই বা থাকলে কেন আছে মূলত এ সম্পর্কেই ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। দুদককে তার অবস্থান পরিষ্কার করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা অফিস থেকে আজ মঙ্গলবার একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়া হতে পারে। এদিকে দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে, দুদককে দেয়া বিশ্ব ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের মামলার মাধ্যমে তাদের অভিযোগ অনুযায়ী ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বাংলাদেশের ক্রয় সংক্রান্ত নীতিমালা পর্যালোচনা করে বিশ্ব ব্যাংক প্যানেল দেখেছেন, কোনো সংস্থার কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতি হলে সংস্থাটির প্রিন্সিপ্যাল একাউন্টিং কর্মকর্তা হিসেবে মন্ত্রী এর দায় এড়াতে পারেন না। অথচ মামলায় সচিবকে আসামি করা হলেও মন্ত্রীকে প্রত্যক্ষভাবে আসামি করা হয়নি। বিশ্ব ব্যাংক তত্কালীন ওই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করলেও মামলায় তার প্রতিফলন হয়নি। এসব ক্ষেত্রে মামলার কিছু জায়গায় ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মামলায় যাদের সন্দেহে রাখা হয়েছে তাদেরকে আসামি না করা হলে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না। পরামর্শক নিয়োগে উচ্চ পর্যায়ের কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততা থাকলে তা খতিয়ে দেখতে হবে। দুদক কার্যালয়ে গতকাল কমিশনার মো. সাহাবউদ্দিন চুপ্পু সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্ব ব্যাংক প্যানেল মামলার এজাহারের কপি পেয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। বিশ্ব ব্যাংক সামগ্রিকভাবে তাদের রিঅ্যাকশন ব্যক্ত করেছে, এতে হতাশার কিছু নেই। প্যানেল আমাদের কাজে সন্তুষ্ট বলেই আমরা মনে করছি। কমিশনার আরো বলেন, বিশ্ব ব্যাংক এই মামলার তদন্তের ব্যাপারে জানিয়েছে, মামলা দায়েরের পর তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিস্তর ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। মামলার তদন্তে বিস্তৃতভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এখন ষড়যন্ত্রে জড়িত সকলকে ভালোভাবে পরখ করা সম্ভব। যাদের আসামি করা হয়নি তাদের ব্যাপারে খতিয়ে দেখতে আর কোনো বাধা নেই। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীকে চার্জশিটভুক্ত করা হবে কি-না- এ প্রশ্নের উত্তরে কমিশনার চুপ্পু বলেন, তাদের বাদ দিয়ে তদন্ত করার অবকাশ নেই। সাবেক দুই মন্ত্রীকে চার্জশিটভুক্ত করতে বিশ্ব ব্যাংকের কোনো পরামর্শ ছিলো কি-না জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, তারা এ বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেনি। আমরা তদন্ত কার্যক্রম স্বাধীনভাবে করছি। এর থেকে বেশি বলা যাবে না। লুইস গাব্রিয়েল মোরেনো ওকাম্পোর নেতৃত্বাধীন ওই প্যানেল দুই দফা বাংলাদেশ সফরের পর দুদক মামলা করে। এই মামলার এজাহারের বিভিন্ন ব্যক্তি ও ঘটনার ব্যাপারে প্যানেলটি দুদকে পরামর্শ দেয়। এরপর গত ১৭ ডিসেম্বর পদ্মা সেতু দুর্নীতির মামলায় সাতজনের বিরুদ্ধে বনানী থানায় মামলা দায়ের করে দুদক। মামলায় মোট আসামি করা হয় সাতজনকে। এর মধ্যে বাংলাদেশের চারজন হচ্ছেন- সাবেক সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া, সেতুর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগে দরপত্র মূল্যায়নে গঠিত কমিটির সদস্য সচিব কাজী মো. ফেরদৌস, সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী রিয়াজ আহমেদ জাবের, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড প্ল্যানিং কনসালট্যান্ট লিমিটেডের (ইপিসি) উপ-পরিচালক মো. মোস্তফা। এছাড়া বিদেশি তিনজন হলেন- কানাডার নাগরিক ও এসএনসি লাভালিনের সাবেক পরিচালক (আন্তর্জাতিক প্রকল্প বিভাগের) মোহাম্মদ ইসমাইল, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশ শাহ ও কেভিন ওয়ালেস। তবে ওই মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, এসএনসি লাভালিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশের নোটবুকে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীকে পারসেন্টটেজ (কমিশন) প্রদানের বিয়ষটি উল্লেখ রয়েছে; কিন্তু পরিপূরক সাক্ষ্য সংগ্রহ করতে না পারায় এজাহারে তাদের নাম দেয়া হয়নি। তাদের অপরাধের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্তকালে খতিয়ে দেখা হবে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।