স্বাধীন সমাজে পরাধীনতার শেকল

প্রথমেই দুটি সামপ্রতিক ঘটনার সঙ্গে পরিচিত হওয়া যাক— ঘটনা : ১ ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মালপত্র ওঠানো-নামানোর কাজ করেন তিনি। টানাপড়েনের সংসার। কিন্তু একমাত্র মেয়ে শৈশব থেকেই পড়াশোনায় ভালো হওয়ায় তাকে ভর্তি করেন মেডিক্যাল কলেজে। মেয়ের পড়াশোনার জন্য গ্রামের ভিটেমাটি বিক্রি করেন, টাকা বাঁচাতে প্রতিদিন শুধু রুটি খেয়ে রাত পার করেন। বাবা-মার স্বপ্ন—মেয়ে একদিন বড় ‘ডাক্তার’ হয়ে তাদের সব দুঃখ-দুর্দশা দূর করবে। নিজের রক্ত পানি করা কষ্টের অর্থ দিয়ে মেয়েকে ‘শিক্ষিত’ করতে চেয়েছেন। জ্ঞানের শক্তি দিয়ে দুঃখ জয় করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হায়! বাবা-মা ভুলে গিয়েছিলেন, সর্বোপরি তার মেয়ে একজন ‘নারী’। ভুলে গিয়েছিলেন, জ্ঞান ‘নারী’-র শক্তি না, কারণ স্বাধীন সমাজের স্বাধীনতা প্রদানকারী ‘পুরুষ’-এর শক্তি এর চেয়ে ঢেরগুণ বেশি। তাই একটি বাসের সব পুরুষ মিলে সেই ‘নারী’-টিকে ভোগ করেছেন। ‘মেডিক্যালের শিক্ষার্থী’ নামক তকমাটি কিংবা ডিগ্রিটি তখন শুধুই বিশেষণ হয়ে পড়ে। ‘শক্তি’ না। ঘটনা : ২ ২০০৮ সালে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন সাজিয়া আফরিন। নিজের জীবনকে সাফল্যের চূড়ান্ত পরিণতি দিতে ছুটে আসেন রাজধানী ঢাকাতে। তিন মাস আগে তিনি রাজধানীর দক্ষিণখানের আমতলায় ব্র্যাক ক্লিনিকে খণ্ডকালীন চিকিত্সক হিসেবে চাকরি নেন। সামনে অনেক স্বপ্ন, সম্ভাবনা। বাবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালতে পুলিশের উপপরিদর্শক। মেয়ের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে পরিবার নিয়ে মেয়ের কর্মক্ষেত্রের পাশে (দক্ষিণখানের কাউলায়) বসবাস শুরু করেন। কিন্তু হায়! আমাদের এই স্বাধীন দেশের স্বাধীন সমাজের ‘পুরুষরা’ তো চাননি! তাই ২৯ নভেম্বর সেই পুরুষরা আবার প্রমাণ করলেন তারা অনেক বেশি ‘শক্তিশালী’, ‘ক্ষমতাধর’। তাই ক্লিনিকের একজন ‘কর্মচারী’/‘তত্ত্বাবধায়ক’-ও ‘এমবিবিএস’ ডিগ্রিধারী একজন ‘ডাক্তার’-কে শুধুই ‘নারী’ হিসেবে ‘ভোগ্যপণ্য’ রূপে গণ্য করার দুঃসাহস দেখাতে ভয় পাননি। ভয় পেয়েছেন সেই নারীটি। চিত্কার করেছেন, আর্তনাদ করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। ফ্র্যান্সিস বেকনসহ অনেক জ্ঞানী, বিদ্বান ব্যক্তিই বলেছেন, জ্ঞান-ই শক্তি। শৈশব থেকে আমিও এটা শুনেই বড় হয়েছি। এজন্য সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ‘শিক্ষিত’ হয়েছি এবং সর্বোপরি নিজের পরিচয়ে সমাজে টিকে থাকতে একটা ‘চাকরি’ করছি। কিন্তু আজ এই বিদ্বানদের মতকে ‘ভুল’ কিংবা ‘মিথ্যা’ বলার দুঃসাহস দেখাতে চাইছি। সম্ভবত তারা তাদের নিক্তিতে ‘পুরুষদের শক্তি’-কে মেপে দেখেননি। মেপে দেখেননি একজন মানুষ হিসেবে ‘পুরুষের’ কতটা শক্তি হলে স্বাধীন একটা সমাজে পরাধীনতার শেকলে বেঁধে রাখেন নারীদের। ইভ টিজিং, বাল্য বিয়ে, যৌতুক, ধর্ষণ, অ্যাসিড সন্ত্রাস দিয়ে তৈরি এই শেকল এতোটাই ভয়াবহ, মজবুত আর হিংস্র যেন ‘ভয়’ নামক একটি রোগ প্রতিটা নারীকে প্রতিনিয়ত পিছিয়ে রাখছে। নিজ দেশে স্বাধীন সমাজের কাছে একজন নারী প্রতিদিন, প্রতিটা মুহূর্ত শুধুই ‘নিরাপত্তা’-র জন্য হাহাকার করছেন। সমাজে পুরুষের ক্ষমতা, জেন্ডার-সম্পর্কিত ধারণা এবং নারীকে দখলে রাখার লড়াইয়ের একটা বৃহত্ সামাজিক প্রেক্ষাপটে ‘ধর্ষণ’ নির্মিত। পুরুষতান্ত্রিক বলয়ে নিজেদের অভিমত প্রকাশের উদ্দাম উন্মাদনা মাত্র। শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও একজন নারী তার অধীনস্ত পুরুষের কাছ থেকে নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকেন। একজন পুরুষ বাসা থেকে অফিস যাওয়ার সারাটা পথ তার কর্মের রূপরেখা, কর্মের সমস্যা, তার সমাধান নিয়ে চিন্তা করেন। পাশে একজন অফিস-যাত্রী নারীর চিন্তায় থাকে তার নিরাপত্তা! আপাতত অফিসে নিরাপদে পৌঁছানো। এরপর অফিসে নিজেকে নিরাপদে রাখার চিন্তা। সর্বশেষ বাসায় নিরাপদে ফেরা। পিছিয়ে যায় নারীরা। তাকে পিছিয়ে দেয় শক্তিশালী পুরুষ। স্বাধীন দেশের স্বাধীন সমাজে শক্তিশালী পুরুষরা তার শিক্ষার শক্তিকে শেকলে বেঁধে রাখেন। তার শিক্ষার শক্তি ম্লান হয়ে যায়। ঢাকা