মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে
যার নাম লেখা রবে না
সুশীল মালাকার, শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:১৩
নিভৃত পল্লীবাসীনি লালজান বেওয়া বয়সের ভারে ন্যূব্জ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তার অবদান লেখার কোন সুযোগ না থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াল দিনে তাঁর মাতৃ স্নেহে যারা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন তাদের রক্ত-মাংশের ভেতরে লুকানো ইতিহাসে তাঁর নাম আজও লেখা আছে।
১৯৭১ সালের পহেলা রমজান কোম্পানী কমান্ডার রফিজউদ্দিন রেফাজের নেতৃত্বে ৮১ সদস্যের মুক্তিযোদ্ধা দল সীমান্ত পেরিয়ে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় পাক বাহিনীর ক্যাম্প আক্রমণ করতে এসেছিল। পাক বহিনীর মাইনের আঘতে শাসছুল হক নামের এক মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। মাইন বিস্ফোরনের শব্দ শুনেই পাক বাহিনী বৃষ্টির মত গুলি বর্ষণ শুরু করে। ফলে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধা দল।
সহযোদ্ধারা আহত শামছুল হককে উদ্ধার করে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেয়। এরপর দলটি পুনরায় সংগঠিত হয়ে আক্রমনের চেষ্টা করে। কিন্তু পাক বাহিনীর আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের মুখে তাদের প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়। এসময় মির্জা আব্দুল খালেক, আব্দুস সাত্তার, নূরুল ইসলাম, হাতেম আলী, বাবর আলী ও অজ্ঞাত নামা আরো দু’জন গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। পাক বাহিনী শহীদদের মধ্যে মির্জা আব্দুল খালেক, আব্দুস সাত্তার ও নূরুল ইসলামকে একটি ধান ক্ষেতে পুঁতে রাখে। দলের অবশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্ত থেকে ৩ কিলোমিটার দূরবর্তী রামচন্দ্র কুড়ার নূর মোহাম্মদের বাড়িতে আশ্রয় নেয়।
এ প্রসঙ্গে লালচান বেওয়ার ছেলে নূর মোহাম্মদ জানান, একবাড়িতে এতোজন মুক্তিযোদ্ধার আশ্রয় গোপন রাখা যাবেনা। এ খবর রাজাকারদের নজরে এলেই পৌঁছে যাবে পাক বাহিনীর ক্যাম্পে। তাই ভোরের আলো ফোটার আগেই তাদের কাঁধে লাঙ্গল, জোয়াল, কোদাল চাপিয়ে গরুর সাথে বের করে দেয়া হয়। তাঁরা বুড়ি ভোগাই নদীর পাড়ের ঘন জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। এ সময় লালজান বেওয়া জীবন বাজী রেখে নদীতে বাসন মাজার ছল করে হাড়ি, পাতিল, গামলায় করে গভীর মমতায় ঝোপঝাড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার পৌঁছে দিতেন। মুক্তিযোদ্ধা দলটি নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার শেষ পর্যন্ত লালচান বেওয়া ক্ষুধার্ত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ছিল মমতাময়ী মা। এখানে ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হলেও আজও সেকানে কোন স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়নি। সম্প্রতি শেরপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক এডভোকেট আব্দুল হালিম এলাকা পরিদর্শন করে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের ঘোষনা দিয়েছেন।
প্রায় শতবর্ষী লালজান বেওয়া বয়সের ভারে আজ নুব্জ। মুক্তি যুদ্ধে তাঁর অবদান কোথাও লেখা হউক সে দাবি তাঁর নেই। তিনি শুধু রাজাকার, আলবদরদের বিচার দেখে যেতে চান।