বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক মাদক পাচারের প্রধান রুট

নাটোরের ‘বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক’ দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হচ্ছে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক। চোরাচালানিরা এসব মাদক ও অস্ত্র ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিচ্ছে নানা কৌশলে। তবে পুলিশের জনবল, পরিবহনসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি স্বল্পতায় ওই পাচার রোধ কার্যক্রম অনেকটাই সফল হচ্ছে না। মহাসড়কে বিভিন্ন পয়েন্টে ৮টি চেকপোস্ট বসিয়ে মাদক ও অস্ত্র পাচার রোধে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম থানা পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী ২০১১ সাল থেকে চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফেনসিডিল-৪০২১ বোতল, হেরোইন-১ কেজি ৩৫৬ গ্রাম ২৮ পুরিয়া, চোলাইমদ-৮৩১২ লিটার, গাঁজা-৪৩ কেজি ৭৫০ গ্রাম, গুলিসহ অস্ত্র ১০টি, প্রায় ১৫ হাজার বোতল অবৈধ বলবর্ধক ড্রিংকস, সোনা ও পিতলের মূর্তি উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৫৮টি, গ্রেফতার হয়েছে ২৬৩ জন। বিভিন্ন মেয়াদে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে মাত্র ২৫টি। তথ্য অনুসন্ধান ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয় সীমান্ত পার হয়ে নাটোরের লালপুর পাবনার ঈশ্বরদী, রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট, গুদাগাড়ী, মহিষালবাড়ি ও চাপাইয়ের শিবগঞ্জ হয়ে মোটরসাইকেল, বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, অ্যাম্বুলেন্স নছিমন, ভটভটিতে মালামালের ভেতর ও মানুষের শরীরে বিশেষ কায়দায় এসব অবৈধ অস্ত্র ও মাদক বহন করা হয়। পুলিশের তত্পরতায় কিছু উদ্ধার হলেও পুলিশের দৃষ্টি এড়িয়ে যথেচ্ছাভাবে দেশে ঢুকছে অবৈধ অস্ত্র আর মাদক। আর এসব মাদক পাচারের প্রধান রুট হচ্ছে ‘বনপাড়া-হাটিকুমরুল’ মহাসড়ক। সুত্র মতে, ‘বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কটি চলনবিলের মাঝ দিয়ে নির্মিত হয়েছে। নাটোরের গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম ও সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, উল্লাহপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল মোড়ে গিয়ে শেষ হয়েছে। মহাসড়কটি দীর্ঘ ৫৫ কি.মি.। এর মধ্যে গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলা অংশে পড়েছে ২৭ কি.মি. এলাকা। ২০০১ সালে এটি চালু হওয়ার পর থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৬টি জেলার যানবাহন চলাচল করে। মহাসড়কটি বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া গোলচত্বর থেকে শুরু হয়েছে। মহাসড়কটির দক্ষিণ-পশ্চিমের এলাকায় ভারতীয় সীমান্তবর্তী জেলা ও উপজেলা হওয়ায় মাদক-অস্ত্র ব্যবসায়ী ও পাচারকারিরা নানা কৌশলে বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কটি ব্যবহার করে থাকে। বড়াইগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ ইব্রাহিম হোসেন জানান, ভারত থেকে চোরাচালানিরা পদ্মা নদী পার হয়ে লালপুর সীমানায় ঢুকে পড়ে। পরে গ্রামীণ সড়ক ও চোরাপথে বনপাড়া হয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে পুলিশী তত্পরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় চোরাচালানিরা মোটরসাইকেল, শ্যালোচালিত ভটভটি ব্যবহার করছে। অনেকে আবার শরীরে বিশেষ কায়দায় বহন করছে। কারণ, বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের নিচের লেনগুলোতে হালকা যানবাহন চলাচল করে। এতে পুলিশের দৃষ্টি থাকে কম। গুরুদাসপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, শুধু লালপুর নয়- রাজশাহীর চারঘাট, গুদাগাড়ী ও চাপাইয়ের শিবগঞ্জ থেকেও অস্ত্র ফেনসিডিল, হেরোইন আসে। পথে পথে চেকিং পোস্ট ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘ পথ এলেও ‘বনপাড়া-হাটিকুমরুল’ মহাসড়কের গুরুদাসপুর উপজেলার কাছিকাটা টোলপ্লাজায় এসে ধরাপড়ে মাদক ও অস্ত্রের চালান। সূত্র মতে, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানিরা বহনকারি হিসেবে অভাবী-গরিব শ্রেণির যুবক ও মহিলাদের বহনের কাজে ব্যবহার করে। অনেক সময় বাস-ট্রাক, মাইক্রোবাসে বিশেষ কায়দায় মাদকের বড় চালান বহন করা হয়। বহনকারিদের ৫০০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেয়া হয়। পুলিশী তত্পরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ীরা বর্তমানে মহিলাদের ব্যবহার করছে। কারণ- মহিলারা তাদের শরীরে বিশেষ কৌশলে এগুলো বহন করে। বেশির ভাগ সময়ই বোরকা ব্যবহার করে থাকে। মহিলাদের প্রতি পুলিশের নজরদারি থাকে কম। তাছাড়া তল্লাশি কাজে মহিলা পুলিশ না থাকায় বিড়ম্বনার ভয়ে পুলিশের পুরুষ সদস্যরা বিব্রতবোধ করে। মাদক বহনকারি একাধিক ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সীমান্ত থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে কমপক্ষে ৩০ পয়েন্ট চেকিং হয়। মাদক ব্যবসায়ীরা অধিকাংশ থানা পুলিশ ও চেকিং পোস্টকে ম্যানেজ করে পার পেয়ে যায়। তবে মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা ও উপদলীয় কোন্দল শুরু হওয়ায় অনেকেই পুলিশকে গোপনে সংবাদ দিয়ে থাকেন।