রাজধানীসহ সারাদেশে ১৮ দলের মানবপ্রাচীর
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১৭
নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন দাবিতে পূর্বঘোষণা অনুযায়ী গতকাল মঙ্গলবার রাজধানী ছাড়াও দেশের ৬৪টি জেলায় মানবপ্রাচীর কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। ঢাকায় মহাখালীর ফ্লাইওভারের নিচ থেকে শুরু করে পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকা পর্যন্ত সড়কে মানবপ্রাচীর তৈরি করেন হাজার হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থক। কর্মসূচি চলাকালে কোথাও তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে মূল সড়কে মানবপ্রাচীর সৃষ্টি করার কারণে ঢাকায় যানজট লেগে যায়, এতে কয়েক ঘণ্টা বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে যাত্রীদের।
মানবপ্রাচীর কর্মসূচি উপলক্ষে ১৮ দলের নেতা-কর্মীরা সকাল ১০টার পর থেকেই জড়ো হতে থাকেন রাজধানীর সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতে। এসময় বেশিরভাগ নেতা-কর্মী ফুটপাতের পরিবর্তে মূল সড়কে জড়ো হন, যার কারণে যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল বিঘ্নিত হয়। বিএনপি ও এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন ছাড়াও ১৮ দলের শরিক দলগুলোর নেতা-কর্মীরা কর্মসূচিতে অংশ নেন। সকাল ১১টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত এক ঘণ্টা কর্মসূচির সময়সূচি নির্ধারিত থাকলেও তা শেষ হতে প্রায় ২টা বেজে যায়।
রাজধানীর মহাখালীর ফ্লাইওভারের নিচ থেকে শুরু হয়ে তেজগাঁও, সাত রাস্তার মোড়, এফডিসির মোড়, মগবাজার মোড়, রমনা থানা, বেইলি রোড, কাকরাইল মসজিদ মোড়, মত্সভবন মোড়, হাইকোর্ট সড়ক, শিক্ষাভবন চৌরাস্তা, সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল মোড়, গুলিস্তান গোলাপ শাহ মাজার মোড়, নর্থ সাউথ রোড, বংশাল সড়ক, রায় সাহেব বাজার সড়ক, ধোলাইখাল চৌরাস্তা ও আদালত সড়ক হয়ে বাহাদুর শাহ পার্ক পর্যন্ত এই দীর্ঘ সড়কের এক পার্শে মানবপ্রাচীর গড়ে তোলেন ১৮ দলের নেতা-কর্মীরা। মানব প্রাচীরের বিভিন্ন পয়েন্টে নেতৃত্ব দেন ১৮ দলের নেতারা। মানবপ্রাচীরের বিভিন্ন স্পটে ব্যানার নিয়ে শো-ডাউন করেন জামায়াত নেতা-কর্মীরা। তাদের হাতে ছিল দলের শীর্ষনেতাদের মুক্তির দাবি সম্বলিত ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড। তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে নানা রকমের লিফলেটও বিতরণ করেন সাধারণ মানুষের মধ্যে।
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার অভিযোগপত্রের গ্রহণযোগ্যতার শুনানিতে অংশ নিতে ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতের উদ্দেশে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গুলশানের বাসা থেকে রওনা হন বেলা ১২টা ২০ মিনিটে। তিনি আদালতে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত মানবপ্রাচীরে অংশ নেয়া নেতা-কর্মীরা বেশিরভাগই রাস্তায় দাঁড়িয়ে তার জন্য অপেক্ষা করেন। আদালতে যাওয়ার পথে বেলা পৌনে ১টার দিকে মহাখালী এলাকায় পৌঁছান খালেদা জিয়া। এ সময় মানবপ্রাচীরে অংশ নেয়া নেতা-কর্মীরা তাকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। তার গাড়িবহর মহাখালী অতিক্রম করতে শুরু করলে পেছন থেকে মানবপ্রাচীর ভেঙ্গে নেতা-কর্মীরা সরে যেতে থাকেন।
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম একটি গাড়িতে চড়ে মানবপ্রাচীর কর্মসূচি পরিদর্শন করেন। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও যুগ্ম-মহাসচিব বরকতউল্যাহ বুলু। বেলা সাড়ে ১১টায় ইংলিশ রোডের বংশাল থানার সামনে মানবপ্রাচীরে যোগ দিয়ে সাংবাদিকদের কাছে তরিকুল বলেন, মানবপ্রাচীরের মাধ্যমে জনগণ সরকারের প্রতি গণঅনাস্থা জানিয়েছে। ৬৪ জেলায় লক্ষ-কোটি মানুষ এই মানবপ্রাচীরে অংশ নিয়েছে। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই- নির্দলীয় সরকার ছাড়া এদেশে কোনো নির্বাচন আমরা হতে দেব না। নির্দলীয় সরকারের দাবি সরকারকে মানতেই হবে।
সুপ্রিম কোর্টের সামনে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম আয়োজিত মানবপ্রাচীরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ১৮ দলীয় জোটের আন্দোলন আস্তে-আস্তে গণজাগরণের দিকে রূপ নিচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকার সব ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারকে ব্যর্থতার দায় নিয়েই ক্ষমতা ছাড়তে হবে।
বেলা ১২টার দিকে তেজগাঁও রাত রাস্তার মোড় এলাকায় কর্মসূচি পালনের শেষদিকে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, সরকার যদি অনড় অবস্থান থেকে সরে না আসে তাহলে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দাবি আদায় করা হবে। আগামী নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই হতে হবে। সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, সরকার যদি জনগণের সঙ্গে গোঁয়ার্তুমি করে তাহলে এজন্য যে কোনো পরিণতি সরকারকে ভোগ করতে হবে।
মগবাজার মোড়ে মানবপ্রাচীরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার বলেন, জনদুর্ভোগ যেন না হয়, সেজন্য আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নিচ্ছি। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবি না মানলে লাগাতার হরতাল, অবরোধ কঠোর আন্দোলন কর্মসূচির বিকল্প নেই।
মহাখালী এলাকায় বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান ও আ. স. ম হান্নান শাহ কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন। মানবপ্রাচীর কর্মসূচি শুরু হওয়ার প্রাক্কালে রাজধানীর মহাখালীতে উপস্থিত সাংবাদিকদের হান্নান শাহ বলেন, ১৮ দলের মানবপ্রাচীরে অংশ নিয়ে সাধারণ জনগণ সরকারকে অনাস্থা জানিয়েছে। কর্মসূচির মাধ্যমেই এ সরকারের পতন ঘটানো হবে। এই মানবপ্রাচীরে বিএনপি ছাড়াও ১৮ দলীয় জোটের শরীক দলের নেতারা রাজধানীর মত্স্য ভবন থেকে শিক্ষা ভবন পর্যন্ত সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে অংশ নেন।
এদিকে, সোমবার ১৮ দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল ফুটপাতে দাঁড়িয়ে নেতা-কর্মীরা মানবপ্রাচীর তৈরি করবেন, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। কোনো কোনো জায়গায় নেতা-কর্মীরা ফুটপাতে দাঁড়ালেও বেশিরভাগ স্থানে নেতা-কর্মীরা দাঁড়িয়েছিলেন একপাশের সড়কের মাঝখানে। এতে সড়কে স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হয়। সৃষ্টি হয় যানজট। দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। তাছাড়া বেলা ১১টা-১২টা পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলার কথা ছিল। তবে খালেদা জিয়ার আদালতে যাওয়ার কর্মসূচি থাকায় বেশিরভাগ পয়েন্টে নেতা-কর্মীরা বেলা প্রায় ২টা পর্যন্ত সড়কে অবস্থান করেন।
এদিকে রাজশাহী অফিস জানায়, বিএনপির স্থানীয় নেতাদের তীব্র মতবিরোধের কারণে রাজশাহীতে তিনটি পৃথক স্থানে মানবপ্রাচীর কর্মসূচি পালন করা হয়। এনিয়ে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। কর্মসূচিতে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য দলের শীর্ষ নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি চোখে পড়েনি।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জেলা বিএনপির উদ্যোগে মহানগরীর মণিচত্বর এলাকায় মানবপ্রাচীর কর্মসূচিতে নেতৃত্বে দেন বিএনপির কেন্দ বএনপির কেন্দ ীয় কমিটির যুগ্ম-মহাসচিব ও মহানগর সভাপতি মিজানুর রহমান মিনু। এছাড়া জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল মনির ও তার অনুসারি নগরীর আলুপট্টির দৈনিক বার্তা কমপ্লেক্স’র সামনে মানবপ্রাচীর কর্মসূচি পালন করেন।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট নগরীর পতেঙ্গা থেকে কর্ণফুলি সেতু পর্যন্ত সড়কে বেলা ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত মানবপ্রাচীর কর্মসূচি পালন করে। এ সময় শহরের কোনো কোনো এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। তবে কোথাও কোনো বিশৃংখলা অথবা ভাংচুরের ঘটনা ঘটেনি। কর্মসূচিতে বিএনপির কেন্দ ীয় নেতা এম মোরশেদ খান, আবদুল্লাহ আল নোমান, জামায়াত নেতা মওলানা শামসুল ইসলাম এমপি প্রমুখ অংশ নেন।
সিলেট অফিস জানায়, নগরীর ৮টি পয়েন্টে মানবপ্রাচীর কর্মসূচি পলিত হয়েছে। এতে অংশ নেন বিএনপির কেন্দ ীয় সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী, মহানগর সেক্রেটারী আব্দুল কাইয়ুম জালালী পংকি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ ীয় যুগ্ম মহাসচিব সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী, দিলদার হোসেন সেলিম প্রমুখ।
বগুড়া প্রতিনিধি জানান, বিকালে শহরের কেন্দউত্তরাংশে ও সাতমাথা থেকে শেরপুর রোডে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা মানবপ্রাচীর গড়ে তোলেন। এ সময় যুবদল ও ছাত্র শিবির পৃথক মিছিল করে। এতে পুরো শহর একঘন্টার জন্য প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। তীব্র যানজট সামলাতে ট্রাফিক বিভাগকে হিমশিম খেতে হয়েছে।