গুরুত্বপূর্ণ পানগাঁও কন্টেইনার টার্মিনাল চালু করা যাচ্ছে না

জেটি, কন্টেইনার, ফ্রেইট স্টেশন, সংযোগ সড়কসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাজ শেষ হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত পানগাঁও কন্টেইনার টার্মিনাল চালু করা যাচ্ছে না। চট্টগ্রাম ও মংলা থেকে কন্টেইনার আনা-নেয়ার জন্য বিশেষ ধরনের জাহাজের ব্যবস্থাও এখনো করা যায়নি। তবে অতি সম্প্রতি টার্মিনালটিকে পরিচালনা করবে সেই জটিল সমস্যার সমাধান হয়েছে। সে কারণে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় আশা করছে আগামী মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে সীমিত পরিসরে হলেও টার্মিনালটি চালু করা যাবে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় ২০ বছর আগে ১৯৯৩ সালের দিকে পাগলার বিপরীতে নদী ভিত্তিক এই কন্টেইনার টার্মিনালটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল সড়ক ও রেলপথের উপর চাপ কমানো এবং কম খরচে বন্দর থেকে পণ্য আনা-নেয়া। সে সময় জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) এটির সম্ভাব্যতা যাচাই করে। এর জন্য ৮৮ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। একই সঙ্গে কাঠামোগত নকশাও তৈরি করা হয়। প্রথমে কথা ছিল জাইকা এই প্রকল্পে অর্থায়ন করবে। কিন্তু পরবর্তীতে তত্কালীন সরকার একটি বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে এটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিলে আইনী জটিলতা বেধে যায়। কন্টেইনার টার্মিনালটির নির্মাণ কাজ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০০৫ সালের দিকে আবার এটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। তখন সিদ্ধান্ত হয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের ভৌত নির্মাণ কাজে অর্থায়ন করবে। আর বাংলাদেশ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নির্মাণ কাজটি করবে। তবে টার্মিনালটির পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে বেসরকারি খাত। একই সঙ্গে বন্দর থেকে বিশেষ ধরনের জাহাজে কন্টেইনার আনা-নেয়ার কাজটিও দেয়া হয় বেসরকারি খাতকে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বিআইডব্লিউটিএ’র মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী অর্থায়ন শুরু হলে কয়েক দফা পিছিয়ে মাস ছয়েক আগে ১৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের ভৌত নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের এই অংশের পরিচালক মুজিবর রহমান সরকার ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, পাগলার বিপরীতে কেরানীগঞ্জের পানগাঁওয়ে ৮৮ একর জমিতে কন্টেইনার ফ্রেইট স্টেশন, প্রশাসনিক ভবন, জেটি, পার্কিং ইয়ার্ডসহ অন্যান্য স্থাপনা তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। বুড়িগঙ্গা প্রথম সেতু পার হওয়ার পর টার্মিনালে যাওয়ার জন্য পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়কের নির্মাণ কাজও শেষ। এই নির্মাণ কাজের জন্য ব্যয় হয়েছে ১৫৪ কোটি টাকা। এই অর্থ বিনা সুদে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষকে দিয়েছে। টার্মিনালে একসঙ্গে ২৪০০ কন্টোইনার রাখা যাবে। এর বার্ষিক কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং ক্ষমতা হলো ১ লাখ ১৬ হাজার টিইউইএস বা ২০ ফুটের ১ লাখ ১৬ হাজার কন্টোইনার। ভবিষ্যতে যদি টার্মিনালটি সম্প্রসারণের প্রয়োজন হয় সে ব্যবস্থাও রাখা আছে। কিন্তু নির্মাণ কাজ শেষ হলেও আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টার্মিনাল পরিচালনার জন্য বেসরকারি অপারেটর নিয়োগ দিতে গিয়ে প্রকল্পটি আরেক দফা হোচট খায়। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী সব প্রক্রিয়া শেষে বেসরকারি অপারেটর চূড়ান্ত করে তা অনুমোদনের জন্য ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হয়। কিন্তু এই কমিটি টার্মিনালটি সরকারি-বেসরকারি অংশিদারিত্বের ভিত্তিতে (পিপিপি) পরিচালনার জন্য পরামর্শ দেয়। এ নিয়ে আইনী লড়াই শুরু হলে টার্মিনালটি চালু করার কাজ বিলম্বিত হতে থাকে। এরপর গত সপ্তাহে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেরাই এ টার্মিনালটি পরিচালনা করবে। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সীমিত আকারে হলেও দ্রুত পানগাঁও টার্মিনাল চালুর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। বন্দরের নিজস্ব উদ্যোগে জার্মানী থেকে একটি হারবার ক্রেন আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব কিছু ইক্যুইপমেন্ট পানগাঁওয়ে স্থানান্তরের মাধ্যমে এটি চালু করার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ ফরহাদউদ্দিন আহমেদও বলেছেন, বন্দরের নিজস্ব উদ্যোগে ইক্যুইপমেন্ট সংগ্রহ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে টার্মিনালটি চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব ইক্যুইপমেন্ট মার্চের আগেই চলে আসবে। আরো কিছু ইক্যুইপমেন্ট পরবর্তীতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের ভিত্তিতে কেনা হবে। এদিকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর থেকে কন্টেইনার আনা-নেয়ার জন্য বিশেষ ধরনের জাহাজ সংগ্রহের কাজটি এখনো খুব এগোয়নি। এ বিষয়টি দেখভাল করার জন্য নৌ মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি আছে। এই কমিটি এ পর্যন্ত ৪১টি অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলের উপযোগী বিশেষ ধরনের কন্টেইনারবাহী জাহাজের অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু নৌ-মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি তেমন সন্তোষজনক না হওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেরাই প্রাথমিকভাবে ৩ থেকে ৪টি কন্টেইনার জাহাজ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। তাছাড়া অনুমোদন পাওয়া বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অন্তত ৭ থেকে ৮টি জাহাজ নির্মাণের কাজ প্রক্রিয়াধীন আছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ মনে করছে একবার পানগাঁও টার্মিনাল চালু করা গেলে অনেক উদ্যোক্তাই জরুরী ভিত্তিতে অভ্যন্তরীণ রুটে চলতে পারে এমন জাহাজ নির্মাণ বা সংগ্রহের উদ্যোগ নেবে। নৌ-মন্ত্রণালয়ের দেয়া হিসাব অনুযায়ী এরকম একটি জাহাজের এক সঙ্গে ২০ ফুটের ১১০ থেকে ১২০টি কন্টেইনার বহনে সক্ষম হতে হবে। তাছাড়া এগুলোর প্রতি ৩ দিনে একেকটি রাউন্ড ট্রিপ (চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পানগাঁও) পরিচালনা করার কথা। চট্টগ্রাম বন্দরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এরকম একটি জাহাজ পরিচালনার মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে অন্তত ৫০টি ট্রাক প্রত্যাহার করা সম্ভব। প্রাথমিকভাবে তারা দিনে কমপক্ষে চারটি নৌযান পরিচালনা করতে চাচ্ছেন। নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান এমপি ইত্তেফাককে বলেছেন, প্রকল্পটি নিয়ে সব জটিলতার অবসান হয়েছে। আমরা আশা করছি এপ্রিলে এটি চালু করা যাবে।