দুই তরুণের সংকল্পে হার মানলো বাধা

বেড়াতে এসে পরিচয়। তারপর বন্ধুত্ব। এরপরই দুই বন্ধুর সংকল্প। ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমরা যে ক্রমশ:ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি সে সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে’- প্রতিজ্ঞার কথা এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললেন আজাদ ও জহিরুল। আজাদের পুরো নাম মো. আজাদ হোসেন। আর জহিরুলের পুরো নাম মো. জহিরুল ইসলাম। জহিরুল কাজ করেন একটি ওষুধ কোম্পানীতে সার্ভেয়ার হিসেবে। থাকেন রাজধানীর বাংলামোটরে। গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি থানার তিলছড়া গ্রামে। আর আজাদের বাড়ি সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ থানার গণপতি গ্রামে। ঢাকায় আসেন বেড়াতে। উঠেন এক আত্মীয়ের ফ্ল্যাটে। পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন জহিরুল। সেটা ২০১১ সালের শেষের দিকের ঘটনা। অবশ্য এরইমধ্যে আজাদ জলবায়ুর ভয়াবহতা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে মাঠে নেমে পড়েছেন। ঘুরেছেন ১৪টি জেলা। সেই কথা জানালেন বন্ধুকে। বন্ধু জহিরুলও আগ্রহী হয়ে উঠলেন। অ্যাডভেঞ্চার আর ভালো কিছু করা দুই-ই হবে একসঙ্গে। সিদ্ধান্ত হলো, দুই বন্ধু সাইকেলে করে সারাদেশ ঘুরে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতার কথা তুলে ধরবেন। পাশাপাশি গাছ লাগানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলবেন। এত বড় একটা সিদ্ধান্ত ! কোনো বাধা আসেনি? ‘আসেনি আবার! সিদ্ধান্তের পরপরই একের পর এক আসতে থাকলো বাধা। প্রথম বাধা আসলো পরিবার থেকে’। জানালেন, আজাদ ও জহিরুল। আজাদ বলেন, আমি পড়াশুনা করি সাতক্ষীরা কালিগঞ্জ কলেজে। স্নাতক ১ম বর্ষে। আর জহিরুল পড়ে সাতক্ষীরায় সরকারি এসকে কলেজে। সেও স্নাতক ১ম বর্ষে। লেখাপড়া বাদ দিয়ে এ ধরনের কাজে (!) কেই-বা উত্সাহ দেবে, বললেন দু’জনই। তবে পরিবারকে বুঝিয়ে রাজি করালেন তারা। তবে এরপরই আসলো আর্থিক সমস্যা। সেটাও টপকালেন তারা। আজাদ বললেন, লেখাপড়ার পাশাপাশি আমি নিয়মিত টিউশনি করতাম। সেখান থেকে প্রায় ৩২ হাজার টাকা জমিয়েছিলাম। জহিরুল বলেন, ঢাকায় ঐ ওষুধ কোম্পানীতে ৭/৮ মাস চাকরি করে আমি প্রায় ৪০ হাজার টাকা জমিয়েছিলাম। এই ছিল আমাদের দু’জনের সম্বল। কারো কাছে আমরা হাত পাতিনি। ভালো কিছু করতে চেয়েছি নিজেদের চেষ্টাতেই। শুরু হলো অভিযান :‘গত বছরের ২৬ মার্চ। স্বাধীনতা দিবসেই আমাদের অভিযান শুরু হয় নরসিংদী থেকে। এরপর একে একে সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, সিলেট, রাঙ্গামাটিসহ বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার ৩০০টি উপজেলায় সাইকেল নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের দ্বারে দ্বারে গিয়েছি আমরা’ বললেন, আজাদ ও জহিরুল। জহিরুল বলেন, অনেক শিক্ষিত মানুষও জলবায়ু সম্পর্কে সচেতন নন। অথচ বৈশ্বিক উষ্ণতার ফলে অনুন্নত দেশগুলো আজ হুমকির মুখে। এত বিষয় থাকতে জলবায়ু সম্পর্কে মানুষকে সচেতনতার বিষয়টি কিভাবে মাথায় আসলো? এমন প্রশ্নের জবাবে আজাদ বললেন, আগেই বলেছি, আমার গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা। এর পার্শ্ববর্তী জেলা খুলনা, বাগেরহাট সমুদ্র তীরবর্তী হওয়ায় অনেক সময়ই পানিতে ডুবে যায়। কয়েক বছর আগে সিডর এসব এলাকার মানুষকে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে। প্রতিনিয়ত তারা মৃত্যুর মুখোমুখি হয়- অনেকটা উত্কণ্ঠিতভাবে বললেন আজাদ। পরে পড়াশুনা করে জানলাম, এসবের অন্যতম কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। জহিরুল বললেন, একটা ভালো কিছু করার উত্সাহ থেকেই মানুষকে সচেতন করার এই উদ্যোগ আমরা নেই। অসুস্থ হলেও হার মানিনি :আজাদ বললেন, দীর্ঘ সময় ধরে সাইকেল চালানোর ফলে জহিরুলের পা ফুলে গিয়েছিল। বেশ কয়েকবার আমরা দু’জনই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু কোন বাধাই আমাদের আটকাতে পারেনি। এছাড়া যেখানেই গিয়েছি, মানুষের অফুরন্ত সহযোগিতা পেয়েছি । বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসক থেকে শুরু করে, রাজনীতিবিদ, সাধারণ মানুষ সকলেই আমাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন। আমাদের অভিযান শেষ হয়েছে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর। অভিযানের দীর্ঘ ৯ মাসে আমরা প্রায় ৭০০টি স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীর কাছে গিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতার কথা তুলে ধরেছি। পাশাপাশি গাছ লাগানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছি। ছাত্র-ছাত্রীরা প্রত্যেকে অন্তত: একটি করে গাছ লাগানোর প্রতিজ্ঞা করেছেন। আসলে যেসব কারণে আজ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়ছে এর বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। লক্ষ্য এখন বিশ্ব ভ্রমণ :‘জীবনের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবেই আমরা জলবায়ুর পরিবর্তন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার এই উদ্যোগ নিয়েছি। কোন অবস্থাতেই লক্ষ্য থেকে আমরা পিছপা হবো না’- দৃঢ়ভাবে জানালেন জহিরুল ও আজাদ। পরবর্তী যাত্রায় আমাদের এই উদ্যোগে কেউ যদি সহায়তা দিতে এগিয়ে আসেন তাহলে আমরা স্বাগত জানাবো। শিগগিরই ভারতীয় ভিসার জন্য আবেদন করবো। কারণ, ভারতও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত একটি দেশ।