সংবিধান পর্যালোচনা-৫
যে সরকারই হোক, প্রধানমন্ত্রী হবেন বর্তমান সংসদ থেকেই
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:২৭
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী কোনোভাবেই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা সম্ভব নয়। তবে সর্বদলীয় সরকার গঠন করা সম্ভব। সেই সর্বদলীয় সরকারের সদস্যদের মধ্যে কেবল এক-দশমাংশ অনির্বাচিত ব্যক্তি থাকতে পারবেন। তবে প্রধানমন্ত্রী পদটি নির্বাচিত ব্যক্তির জন্য নির্ধারিত। এই পদে কোনোভাবেই অনির্বাচিত কাউকে বসানো যাবে না। সেটা দলীয়, সর্বদলীয় বা অন্তর্বর্তীকালীন—যে নামের সরকারই হোক না কেন। এমনকি কোন কারণে সংসদ যদি বিলুপ্তও হয়, সেক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করতে হবে বিলুপ্ত সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন কোন সংসদ সদস্যকে।
বাংলাদেশের মূল সংবিধান প্রণেতাদের একজন এবং পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধন কমিটির কো-চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এমপি বলেছেন, বর্তমান সংবিধান বহাল রেখে নির্দলীয়, অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করা সম্ভব। তবে তার এই মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন খোদ আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। তিনি বলেছেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সংবিধানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কর্তৃক সরকার পরিচালনা করার কথা উল্লেখ রয়েছে। অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা আর সম্ভব নয়। আইনমন্ত্রী বলেন, সংবিধান মানতে হবে। যেকোনো আইন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে তা বাতিল হয়ে যাবে। আইনমন্ত্রীর এ মতের সঙ্গে দেশের অধিকাংশ সংবিধান বিশেষজ্ঞই একমত পোষণ করেন।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল এবং পঞ্চদশ সংশোধনীর পর বর্তমান সংবিধান যে রূপ নিয়েছে তাতে সংবিধান সংশোধন ছাড়া কোনভাবেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন সম্ভব নয়। সংবিধানের ৫৫(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা থাকিবে এবং প্রধানমন্ত্রী ও সময়ে সময়ে তিনি যেরূপ স্থির করিবেন সেইরূপ অন্যান্য মন্ত্রী লইয়া এই মন্ত্রিসভা গঠিত হইবে।’ ৫৬ অনুচ্ছেদের (২) উপ-অনুচ্ছেদের শর্তাংশে বলা হয়েছে, ‘তবে শর্ত থাকে যে তাহার সংখ্যার অন্যূন নয়-দশমাংশ সংসদ সদস্যগণের মধ্য হইতে নিযুক্ত হইবেন এবং অনধিক এক দশমাংশ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইবার যোগ্য ব্যক্তিগণের মধ্য হইতে মনোনীত হইতে পারিবেন।’
৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হইবেন, রাষ্ট্রপতি তাহাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করিবেন।’ ৫৬ অনুচ্ছেদের (৪) উপ-অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, ‘সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া এবং সংসদ সদস্যদের অব্যবহিত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তীকালে এই অনুচ্ছেদের (২) (প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপ-মন্ত্রী নিয়োগ সংক্রান্ত ) বা (৩) দফার অধীন (প্রধানমন্ত্রী) নিয়োগদানের প্রয়োজন দেখা দিলে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার অব্যবহিত পূর্বে যাহারা সংসদ সদস্য ছিলেন, এই দফার উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তাহারা সদস্যরূপে বহাল রহিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন।’ সংবিধানের ৫৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য হইবে যদি (ক) তিনি কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট পদত্যাগপত্র প্রদান করেন; অথবা (খ) তিনি সংসদ সদস্য না থাকেন।’
সংবিধানের ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ অনুচ্ছেদ একত্রে ব্যাখ্যা করলে এই দাঁড়ায় যে, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে মন্ত্রিসভা আছে যদি না তারা পদত্যাগ করেন তাহলে তাদের অধীনেই আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যদি কোন কারণে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন বা সংসদের আস্থা হারান তাহলেও নির্দলীয় কোন ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ নেই। এ প্রসঙ্গে সংবিধানের ৫৭ (২) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারাইলে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করিবেন কিংবা সংসদ ভাঙ্গিয়া দিবার জন্য লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শদান করিবেন এবং তিনি অনুরূপ পরামর্শদান করিলে রাষ্ট্রপতি, অন্য কোন সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন নহেন এইমর্মে সন্তুষ্ট হইলে সংসদ ভাঙ্গিয়া দিবেন।’
বর্তমান সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যই আওয়ামী লীগের। ফলে প্রধানমন্ত্রী কোন কারণে পদত্যাগ করলে স্বাভাবিকভাবে ধরে নেয়া যায় আওয়ামী লীগ থেকে আরেকজন প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হবেন। তবে রাজনৈতিক ঐকমত্য হলে একটি সর্বদলীয় সরকার গঠন করা সম্ভব। ওই সরকারের দশ ভাগের একভাগ সদস্য অনির্বাচিত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন। কিন্তু সংসদ সদস্য নন এমন কারো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ নেই।
প্রসঙ্গত ভারতের সংবিধানে অনির্বাচিত ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে নির্বাচিত হওয়ার ৬ মাসের মধ্যে সংসদের কোনো উপ-নির্বাচনে অনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে নির্বাচিত হয়ে আসতে হয়। এছাড়া ভারতের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার পর। যে কারণে সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন, রাষ্ট্রপতি তখন প্রধানমন্ত্রীকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনার অনুরোধ জানান। তবে ওই সরকার দৈনন্দিন কাজ ছাড়া নীতি-নির্ধারণীমূলক কোন কাজে অংশ নেয় না। এছাড়া নির্বাচন পরিচালনায় যুক্ত সকল সরকারি কর্মকর্তা নির্বাচন কমিশনের অধীন থাকে। ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে দীর্ঘদিন ধরে এই প্রথা চলে আসছে।
কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর পর বাংলাদেশের সংবিধান যে আকার ধারণ করেছে তাতে রাজনৈতিক ঐকমত্য না হলে একটি দলীয় সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচন করতে হবে। এই সরকারকে ভারতের আদলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলার কোন সুযোগ নেই। কেননা ভারতের ওই সরকার তাদের ম্যান্ডেটের বাইরের সময় অর্থাত্ মেয়াদের পরে (সংসদ বিলুপ্তির পরেও) দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী আমাদের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সংসদের মেয়াদ শেষের ৯০ দিনের মধ্যে। ফলে সরকারের পদত্যাগের প্রশ্নই ওঠে না। কোন কারণে যদি প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগও করেন তাহলেও সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আস্থাভাজন কাউকে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন।
সংবিধান অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার এখতিয়ার কারো নেই। প্রধানমন্ত্রী সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করতে পারেন। যদি তিনি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থা হারান অথবা রাষ্ট্রপতি সরকার গঠনের জন্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন কাউকে না পান, কেবল তখনই রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙ্গে দিতে পারেন।