ধর্মীয় উদ্দীপনা সৃষ্টিতে বিশ্ব ইজতেমা
অধ্যাপক আ. ন. ম. আব্দুল মান্নান খান
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:০৭
প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব ইজতেমা মানুষের মধ্যে ব্যাপক ধর্মীয় উত্সাহ-উদ্দীপনা ও ভাব-গাম্ভীর্যময় আবেগ তৈরি করে আধ্যাত্মিক প্রেরণার উন্মেষ ঘটায়। বিশ্ব ইজতেমা মূলত তাবলীগ জামাতের মহাসম্মেলন হলেও সর্বস্তরের মুসলমান, যারা বছরের অন্য কোনো সময় তাবলীগ জামাতের কাজে ও কাফেলায় অংশগ্রহণ করতে পারেন না তারাও স্বতঃস্ফূর্ত এই বার্ষিক জামাতে শামিল হন। লাখো মুসলমানের এই মহাসমাবেশে এমন অনেক মুসল্লি আসেন, যারা আল্লাহর পথে সম্পূর্ণ নিবেদিতপ্রাণ ও আত্মসমর্পিত। অনেকে হয়তো সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য ও আল্লাহর পথে মানুষকে আহবানের কাজে সারাজীবনের জন্য বেরিয়ে পড়েছেন। এমন অনেকে এখানে শামিল হন যারা আল্লাহর প্রেমে মশগুল থেকে, ত্যাগ ও সাধনার মাধ্যমে সালেহীন অর্থাত্ পুণ্যবানদের মর্যাদায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। বিশ্ব ইজতেমার প্রতি ওয়াক্ত নামাজের শেষে মুনাজাত এবং আখেরী মুনাজাতে এসব পুণ্যবানেরা আল্লাহর দরবারে হাত উঠান। সেসব অচেনা-অজানা নেককার মানুষের সাথে এক জামাতে সালাত আদায় এবং তাদের সাথে পরম করুণাময় আল্লাহর দরবারে প্রার্থনার হাত উত্তোলনের আশায় মুসলমান মাত্রই আবেগাপ্লুত বোধ করেন। বিশেষ করে শেষদিনের আখেরী মুনাজাতে অংশ নেয়ার জন্যে যেভাবে মানুষ টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানের দিকে ছুটে যায় তা সত্যিই এক প্রচণ্ড আবেগ ও ধর্মীয় চেতনার বহিঃপ্রকাশ। সে কারণেই বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মত মানুষ এসে ভিড় করেন ইজতেমার ময়দানে। এবারো দেখা গেছে, আখেরি মুনাজাতের দিন ইজতেমা ময়দান ছাপিয়ে টঙ্গির পথ-অলিগলি সবখানে, এমনকি হজরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে মুসল্লিদের আল্লাহ নামের জিকিরে মুখরিত হয়ে ওঠে তুরাগের তীর। ইজতেমার দিনগুলোতে টঙ্গী পরিণত হয় মুসলমানদের উত্সব নগরীতে। যে যেখানে পারেন দু’হাত তুলে জায়নামাজ কিংবা খবরের কাগজ বিছিয়ে বসে পড়েন। আল্লাহর দরবারে ‘আমিন’ ‘আমিন’ বলে কায়মনোবাক্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। মানুষের মনের গহীন কোণে গভীর আশা, পুণ্যবান মানুষের ওছিলায় দয়াময় আল্লাহপাক হয়তো ঐশীপ্রেমের ঝরে পড়া অশ্রুধারায় সবাইকে ক্ষমা করে দেবেন। নূন্যতম ইসলামী মূল্যবোধসম্পন্ন লোকজন পর্যন্ত এতে অংশ নেয়ার জন্যে তাগিদ অনুভব করেন। যেহেতু বৃহত্ মজমা এবং মজমার অধিকাংশ মানুষ মুসাফির আর মুসাফিরের দোয়া কবুল হয়। তাছাড়া দেশের প্রধান প্রধান ব্যক্তিদের উপস্থিতি ও মজমার সামগ্রিক বিবেচনায় দীর্ঘ আখেরী মুনাজাত করা হয়। যেখানে দেশ, জাতি ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর শান্তি কামনা করা হয়। যেহেতু সবার কথাই মুনাজাতে বলা হয়, সেহেতু সকল পেশার মানুষ আখেরী মুনাজাতে শরীক হওয়ায় এর গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। কাজেই বিশ্ব ইজতেমা যে প্রচণ্ড ধর্মীয় ভাবাবেগ তৈরির কারখানা ও মুমিন-মুসলমান তৈরিতে সত্যিই অতুলনীয় ও অনন্য তা বলাইবাহুল্য। বিশ্ব ইজতেমা আমাদের সংস্কৃতির ধর্মীয় ভিতটিকে মজবুত করেছে। তার মধ্যে সৃষ্টি করছে সচেতনতা, সতেজ সজীবতা। বিশ্ব ইজতেমার শেষদিন কার্যত টঙ্গীকেন্দ্রিক এলাকাজুড়ে জাতীয় উত্সবে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাব এতটুকু গড়িয়েছে যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা-নেত্রীসহ বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ কমপক্ষে একবার সেখানে বিশেষ করে আখেরী মুনাজাতের দিনে হলেও হাজির হন। ভ্রাতৃত্ববোধ ও সমগ্র মানব জাতির চিরকল্যাণ আর মুসলিম উম্মাহর শান্তি এবং উন্নয়ন কামনায় তাবলিগ জামাতের অন্যতম বিশ্ব ইজতেমা পরিসমাপ্ত হয়। মুসল্লিদের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ না করা গেলেও আয়োজকদের ধারণা, প্রতিবছর ৪০ লাখের বেশি মুসল্লির সমাগম ঘটে। একদিনের জন্য হলেও গোটা দেশকে ইজতেমা অভিমুখী করার একটি প্রতীকী মূল্য অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ধর্মীয় ইমেজ গঠনেও তাবলীগ ও বিশ্ব ইজতেমার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ও অনস্বীকার্য। পরম সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, তাবলীগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমার জন্য বাংলাদেশকে বেছে নেয়া হয়েছে। ৪৪ বছর ধরে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে টঙ্গির তুরাগ পাড়ে। বাংলাদেশসহ মোট ৬৬টি দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ ইতোপূর্বে বিশ্ব ইজতেমায় শরিক হন। পাঁচ মহাদেশ থেকেই মুসল্লিরা ইজতেমায় আগমন করেন। পৃথিবীর যেসব দেশে মুসলমানদের বসবাস রয়েছে প্রায় সব দেশ থেকেই অন্য বছরের মত ব্যাপক লোক সমাগম হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, চীন, সৌদি আরব, ওমান, কাতার, সুদান, সেনেগাল, আলবেনিয়া, তুরস্ক, মিয়ানমার, পর্তুগাল, ব্রাজিল, জার্মানী, আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অর্ধশতাধিক মুসলিম দেশের তাবলীগ জামাতের পুণ্যবান মুসল্লিরা অংশগ্রহণ করে থাকেন এই জামাতে। তাই বিশ্ব ইজতেমার মাধ্যমে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের একটি ইতিবাচক ও ধর্মীয় ইমেজ গড়ে উঠেছে এবং তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের মতো দেশের জন্য তা কম কথা নয়। মোটকথা, দেশের পরিচিতি সম্প্রসারণে ইজতেমার একটি ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। বিশ্ব ইজতেমা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও বিরাট ভূমিকা রাখছে। ইজতেমাকে কেন্দ্র করে টঙ্গী এলাকায় বিশাল বাজার গড়ে ওঠে। তদুপরি বিপুল সংখ্যক বিদেশী মেহমান ইজতেমায় আসার কারণে বাংলাদেশ অর্জন করছে বৈদেশিক মুদ্রা। ফলে অর্থনৈতিক দিক থেকেও আমাদের দেশ লাভবান হচ্ছে। গ্রাম-বাংলার লাখো লাখো মানুষ মহান স্রষ্টার স্মরণে নিজ খরচে ছুটে আসেন এ বিশ্ব ইজতেমায়। আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়াসহ যাবতীয় খরচ ব্যয় বহন করে নেন নিজ নিজ ব্যবস্থায়। তাছাড়া সহজ-সরল দিনযাপনে মানুষকে অভ্যস্ত করে বিলাসবহুল দ্রব্যসামগ্রীর চাহিদা কমাতেও তাবলীগের একটি ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমানের উপস্থিতিতে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ প্রান্তর সমবেত মুসল্লিদের ইবাদত-বন্দেগি, জিকির-আজকারে এক পুণ্যভূমির রূপ ধারণ করে। তাই অনেকে আবেগকে চেপে রাখতে না পেরে বিশ্ব ইজতেমাকে হজ্বের সাথে তুলনা করে বসে এটা কোনোমতেই শোভনীয় নয়। তাবলিগের বিশ্ব ইজতেমাকে হজ্বের সাথে তুলনা করা সম্পূর্ণ অন্যায়। কারণ হজ্ব হলো ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের একটি অন্যতম ফরজ ইবাদত। যা না করলে গুণাহগার হতে হয়। কিন্তু তাবলীগের ইজতেমায় আসা ফরজ নয় এবং না আসলে গুণাহগারও হতে হবে না। দু’টি বিষয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। যার একটির সাথে অন্যটির কখনোই তুলনা করা চলে না। হজ্বের মত লোক সমাগম হলেই সেটাকে
দ্বিতীয় হজ্ব বলা কোনোমতেই সমীচীন নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো তাবলীগের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো কথা কখনোই বলা হয় না। তবে কোনো সাধারণ মুসল্লি যদি এমন কথা বলে থাকেন তাহলে সেটা একান্তই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। ৩ বার ইজতেমার মাঠে আসা ৩ চিল্ল¬া দিলে এক হজ্বের সমান সওয়াবতুল্য- এসব ভিত্তিহীন কথা। বায়তুল্লাহ বা মক্কার কাবাগৃহের হজ্বের কোনো তুলনা নেই। ইসলামী সমাজ গঠনের ক্ষেত্রেও তাবলীগ ও বিশ্ব ইজতেমার একটি ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। যদিও চরিত্র, কর্মসূচি ও বক্তব্যের দিক থেকে তাবলীগ একটি নিছক অরাজনৈতিক ধর্মীয় আন্দোলন, তবুও তার প্রভাবে সমাজে ইসলামী চিন্তা-চেতনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইবাদত-বন্দেগীর প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। সাধারণ জনগণের মধ্যে ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষা প্রসারে তাবলীগের রয়েছে অন্য ভূমিকা। তাছাড়া আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণীর একটি অংশের মধ্যে দ্বীন পালনের আগ্রহ জোগাতে তাবলীগ জামাতের অবদানকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। পৃথিবীতে মানবতার কল্যাণে মুসলমানদেরকে দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে, তারই মহড়া ও দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয় এই বিশ্ব ইজতেমার মাধ্যমে। তাই একথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, ইসলামের প্রচার ও প্রসারে তাবলীগ জামাত অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে এবং বিশ্ব ইজতেমার মাধ্যমে দ্বীন ইসলামের ব্যাপক বিস্তার লাভ হচ্ছে ও দ্বীনি দাওয়াত সব দেশেই পৌঁছে যাচ্ছে। প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমার আয়োজনকে অনেকের কাছে রহস্যঘেরা এবং বিস্ময়কর বলে মনে হয়। টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর শৃঙ্খলা। লাখ লাখ লোকের কয়েকদিনব্যাপী অবস্থানকে শান্তিপূর্ণ করার জন্য ইজতেমার মাঠকে অনেকগুলো খিত্তায় ভাগ করা হয়। যার একেক খিত্তায় একেক অঞ্চল থেকে আগত মুসল্লিরা অবস্থান করেন। ১৬০ একর জায়গা জুড়ে টানানো হয় বিশাল চটের সামিয়ানা। যা ইজতেমার প্রথমদিনেই পরিপূর্ণ হয়ে যায়। মুসল্লিরা বিশাল সামিয়ানার নিচে আল্লাহর প্রেমে পাগল হয়ে, নবীর প্রেমের প্রেমিক হয়ে ঘর-বাড়ি, আরাম-আয়েস ত্যাগ করে মিলিত হন। কিন্তু কোনোরকম বিশৃঙ্খলা হয় না। সবাই হাঁটেন জিকির-ফিকিরে। ‘যার যার ডানে চলি ভাই’ বলেন। ঝগড়া-বিবাদ তো দূরে থাক, কেউ একটু রেগে কথা বলেন এমন দৃশ্য কখনো চোখে পড়ে না। উপস্থিত মুসল্লিদের মানবতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও ঐক্য দেখে অভিভূত না হয়ে পারা যায় না। তারা একে অন্যের কষ্টকে ভাগাভাগি করে নেন। কোনো ধাক্কা-ধাক্কি ছাড়াই একজন অপরজনকে চলাচলের সুযোগ করে দেন। কোনো শোরগোল নেই। কারো বিছানার ওপর দিয়ে গেলেও কেউ কটু কথা বলেন না। একটি ঘোষণা শুনেই সবাই নামাজের কাতার সোজা করে নেন। এখানে ধনী-দরিদ্রের কোনোরকম ভেদাভেদ নেই। বহু বিত্তশালী লোক আরামের বিছানা ছেড়ে সাধারণ কৃষক ও রিকশাচালকদের সাথে এসে চাটাইয়ের বিছানায় রাত্রি যাপন করেন। সবাই একসাথে খাবার খান। কতো সুন্দর মুসলমানদের আমল, কতো উত্তম তাদের শিক্ষা। আরো বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে বিশ্ব ইজতেমায় এই যে প্রায় ৩০/৩৫ লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয়, তার জন্য কোনো প্রচার ব্যয় নেই। লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, মাইকিং কিছুই নেই। নেই কোনো কেন্দ্রীয় তহবিল, নেই কোনো আনুষ্ঠানিক অফিস, টেলিফোন, যানবাহন ইত্যাদি। এ বিশাল আয়োজনে কোনো শ্রমিক নিয়োগ করা হয় না। সম্পূর্ণ আয়োজনটাই স্বেচ্ছাশ্রম। আবার এ আয়োজনে ব্যবহূত কোনো দ্রব্য-সামগ্রী কিনতে হয় না। সরকারি-বেসরকারি গণমাধ্যমে যা কিছু প্রচারিত হয় বা যেসব সহযোগিতা পাওয়া যায় তাও সম্পূর্ণ স্বেচ্ছা-প্রণোদিত সামগ্রীনির্ভর। এটাও বিশ্ব ইজতেমার এক অনন্য-সাধারণ বৈশিষ্ট্য যা সত্যিই অতুলনীয়।