শো কা ঞ্জ লি

কেটে গেল গোলাপঘোর

বরেণ্য লেখক আবদুশ শাকুরের গল্প ও গল্পভাবনা ছিল স্বতন্ত্র। গল্প নিয়ে কিছু অসাধারণ প্রবন্ধ তিনি লিখে গেছেন অতিসমপ্রতি। প্রবীণ লেখকদের মধ্যে তিনিই একমাত্র ব্যতিক্রম, যাঁর বিভিন্ন ব্লগে উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। তিনি ব্লগে লিখতে পছন্দ করতেন, মন্তব্য করতেন ও মন্তব্যের জবাব দিতেন। সবচেয়ে বড় কথা, এ নিয়ে তিনি ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করতেন। আবদুশ শাকুর যুগপত্ভাবে কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, রবীন্দ্র-গবেষক, সংগীতজ্ঞ ও গোলাপ-বিশেষজ্ঞ। গত ১৫ জানুয়ারি মঙ্গলবার বিকেল চারটায় তিনি চলে গেলেন আকস্মিকভাবে। আবদুশ শাকুর ১৯৪১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালী জেলার সুধারাম থানার রামেশ্বরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মকবুল আহমাদ ও মা ফায়জুন্নিসা। তিনি ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কামিল পাস করেন। পরে ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে সম্মান এবং ১৯৬৪ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯৮০ সালে নেদারল্যান্ডসের আইএসএস থেকে উন্নয়ন অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। কর্মজীবনের প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনা করেন; পরে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসে যোগদান এবং বাংলাদেশ সরকারের সচিব হিসেবে অবসর নেন। ছোটগল্পে বিশেষ অবদানের জন্যে ১৯৭৯ সালে আবদুশ শাকুর ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার’ এবং ‘গল্পসমগ্র’র জন্য পশ্চিমবঙ্গ থেকে ২০০৩ সালের ‘অমিয়ভূষণ পুরস্কার’ অর্জন করেন। ২০০৪ সালে ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই’ পুরস্কার পান মননশীল প্রবন্ধগ্রন্থ ‘গোলাপসংগ্রহ’-এর জন্য। সমগ্র সাহিত্যকর্মের জন্য ‘অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার’ পান ২০০৮ সালে। ‘শ্রুতি সাংস্কৃতিক অ্যাকাডেমি পুরস্কার’-এ ভূষিত হন ২০১১ সালে। আবদুশ শাকুরের গোলাপের প্রতি ভালোবাসা কিংবদন্তি হয়ে আছে আমাদের মাঝে। গোলাপের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেবল পাঠের নয়, চাষেরও। কয়েক-শ প্রজাতির গোলাপ তিনি স্বহস্তে লালন করে ‘বাংলাদেশ জাতীয় গোলাপ সমিতি’র স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন ১৯৮৯ সালে। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমি দ্বিচারীর প্রথম প্রেম খণ্ডিত ছিল কেবল সাধের সাহিত্যে আর সখের সঙ্গীতে। এই শক্তিমতী দ্বয়ীর আসরে কোন্ অবকাশে-যে গোলাপসুন্দরী এসে দুটিকেই দূরে সরিয়ে দিয়ে আমার কর্মব্যস্ত দিনরজনীর নর্মসঙ্গিনী হয়ে গিয়ে আমাকে ত্রিচারী বানিয়ে ফেলেছিল? সে-খবর মোহের ঘোরে আমি জানতেও পাইনি।’ গবেষণামূলক ও সংগীতবিষয়ক লেখক হিসেবে দেশের সংগীতবোদ্ধা ও সাহিত্যিক সমাজে তিনি সুপরিচিত। শুদ্ধসংগীতের স্বর, সুর, কথার গভীর আলোচনায় তাঁর খ্যাতি রয়েছে। তাঁর ‘মহামহিম রবীন্দ্রনাথ’, ‘পরম্পরাহীন রবীন্দ্রনাথ’ এবং ‘রবীন্দ্রনাথকে যতটুকু জানি’-নামক গ্রন্থগুলো রবীন্দ্র-গবেষেণার গুরুত্বপূর্ণ রচনা বলে বিবেচিত। শাকুর রচিত ‘ক্রাইসিস’, ‘সংলাপ’ ও ‘উত্তর-দক্ষিণ সংলাপ’ নামের উপন্যাসগুলো বিষয় ও ভাষার স্বাতন্ত্র্যে প্রোজ্জ্বল। তাঁর গদ্য ঋজু, গতিময়, সরস, বুদ্ধিদীপ্ত, কাব্যিক ও তীক্ষ। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ভাষায়, ‘আজ আমাদের চারপাশে অযত্ন আর অবহেলায় লেখা শিথিল গদ্যভাষার যে “অলীক কুনাট্যরঙ্গ” মাথা উঁচিয়ে উঠেছে—আবদুশ শাকুরের গদ্য চিরায়ত গদ্যের পক্ষ থেকে তাঁর শক্তিমান প্রতিবাদ... জ্ঞান, মেধা এবং মননের সমবায় তাঁর বৈদগ্ধ্যকে এমন এক পরিশীলিত শ্রী এবং উপভোগ্যতা দিয়েছে যার কাছাকাছি জিনিশ চিরায়ত বাংলাসাহিত্যের ভিতরেই কেবল খুঁজে পাওয়া যাবে’। (স্বনির্বাচিত প্রবন্ধ ও রচনা) অধ্যাপক ড. অমিয় দেব বলেছেন, ‘শাকুরের সমগ্র কথাসাহিত্যে বিশেষভাবে লক্ষণীয় বস্তুটি হল চিন্তাশক্তি আর কল্পনাশক্তির চমত্কার সমবায়।’ (দৈনিক গণকণ্ঠ, কলকাতা, ২০০৪ সালের বিশেষ একটি সাহিত্যিক ক্রোড়পত্র) পৃথিবীর মায়া ও গোলাপঘোর কাটিয়ে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তাঁর প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।