চিত্রপ্রদর্শনী

দেশজ শিল্পের খোঁজে

বাংলার ঐতিহ্যের ধারক দেশজ শিল্পকলা। এ ভূ-খণ্ডের গ্রামে-গঞ্জে লুপ্তপ্রায় লোকজ শিল্পকলা। পটচিত্র, সরাচিত্র, মাটির পুতুল, কাঠের তৈরি সামগ্রী, পোড়ামাটির ফলকচিত্র ছাড়াও আবহমান বাংলায় বংশপরম্পরায় চর্চা হতো লোকশিল্পের। হারিয়ে যাওয়া এ শিল্পীদের সাথে আধুনিক শিল্পকলার ব্যাকরণে ঋদ্ধ শিল্পীদের কাজের সন্ধান করছে গ্যালারি জলরঙ। আবাসিক শিল্পী প্রকল্প বা ‘আর্টিস্ট ইন রেসিডেন্স’—এই ধারণায় বাংলাদেশে শিল্পসৃষ্টির ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়। বিদেশ-বিভূঁইয়ে শিল্পী এসএম সুলতান বোহেমিয়ান জীবনযাপনের এক পর্বে নিজদেশে ফিরে আসেন ১৯৭৬ সালে। এর কিছুসময় পর বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় শিল্পী এসএম সুলতানকে বাংলাদেশের প্রথম আর্টিস্ট ইন রেসিডেন্স ঘোষণা করে। কিন্তু সুলতান এসব শর্তারোপিত শিল্পসৃষ্টির গণ্ডী থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নড়াইলের নিজগ্রামে ফিরে যান। নিজগ্রামের আলো-বাতাসে মুক্ত বিচরণ তাঁর অভ্যাসে পরিণত হলো। সুলতান বাংলার মাটির কথা বলতে শুরু করেন তাঁর ক্যানভাসে। গ্যালারি জলরঙের এ উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সাথে মেলানো যায় না। এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য খানিকটা ভিন্ন। বাংলাদেশের চারুশিল্পীদের মধ্যে দেশজ শিল্পকলার ভাবনায় আশ্রিত সৃষ্ট কাজের শিল্পীদের আবাসিক সুবিধাসহ শিল্পসৃষ্টির উপকরণ সরবরাহসহ একাগ্রচিত্তে সৃষ্টির কাজে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে গ্যালারি জলরঙের এ আয়োজন। ১১ জানুয়ারি আয়োজনটি শুরু হয় শিল্পী নাজির হোসেনের কাজ দিয়ে। চারুকলা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই নাজির হোসেন শৈশব থেকে নিজেকে ছবি আঁকার সাথে যুক্ত করেন। তাঁর কাজের বিষয় বাংলার নিসর্গ, মানুষ ও লোককাহিনিনির্ভর। আবহমান বাংলার রং-রূপের সাথে নাজির ছবিতে যুক্ত করেন তাঁর স্বপ্নকল্প; কল্পনায় নাজিরের ছবির চরিত্র উপস্থিত হয় নানাভাবে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার তাঁর কাজে বিভিন্নভাবে হাজির হয়। কখনও বাঘের মাথায় বাংলার লাল সূর্যখচিত সবুজ পতাকার উপস্থিতি। বাঘের পিঠে চড়ে ভ্রমণের পথে একদল মানুষ। কিষান-কিষানির ঘরে নবান্নের উত্সবের সময় আনন্দে নেচে বেড়ায় ডোরাকাটা বাঘ। নাজিরের কাজে মিথোস্ক্রিয়া যুক্ত হয়। এই লোকজ শিল্পের তেজ তিনি কোথা থেকে পান? এর উত্তরে শিল্পী তাঁর স্মৃতিতে থাকা নিসর্গের বৈচিত্র্যের কথা জানান। লোকশিল্পের সৃষ্টিকৌশল তাঁর কাজে স্পষ্টভাবেই দেখা যায়; ছবির জমিনে তুলির ব্যবহারের ছাপ দেখা যায়। নকশিকাঁথার সেলাইয়ের ফোঁড়, সূঁই-সুতার চলাচল দেখা যায় স্পষ্টভাবে। ঢাকায় কোনো গ্যালারি এই প্রথম শিল্পীদের জন্য এ ব্যবস্থা শুরু করেছে। ইতিপূর্বে যশোরের ‘চারুপীঠ’ শিল্পীদের মধ্যে এক বছরের ফেলোশিপের ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল। ওই আয়োজনের প্রথম শিল্পী ছিলেন রাজিউদ্দিন চৌধুরী ডাব্লিউ। দ্বিতীয় ফেলো ছাপচিত্রশিল্পী রশীদ আমিন। এ উদ্যোগের পথযাত্রা এরপর আর দীর্ঘ হয়নি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিল্পীদের স্টুডিও-সুবিধা প্রবর্তন করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এ আয়োজন যথেষ্ট শ্রমসাধ্য হলেও গ্যালারি জলরঙ এ যাত্রা অব্যাহত রাখবে—এটি আমরা আস্থায় নিতে পারি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা নবীন-প্রবীণ শিল্পী, যাঁদের কাজ আমাদের ঐতিহ্য, দেশজ ভাবনার খোঁজ দেয়, তাঁদের প্রথমে আবাসিক শিল্পীসুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে গ্যালারি জলরঙ। শিল্পী, শিল্পকলার সমঝদার মানুষের কাছে দেশজ ঐতিহহ্যের এ বার্তা পৌঁছে যাক; মাটি-মানুষের জন্য খুলে যাক নতুন দুয়ার। প্রথম শিল্পীর কাজ অব্যাহত থাকবে ২৫ জানুয়ারি ২০১৩ পর্যন্ত।