লালন-লাকাঁয় কী মিল পেলে

‘পরে মারে পরের ছেলে’

মহাত্মা লালন লিখিত অমৃতাচরণ আর মহাত্মা জাক লাকাঁ লিখিত সঞ্জীবনী গ্রহণ করার তৌফিক এই বান্দার কিঞ্চিত্ ঘটেছে। লালনকে বোঝাপড়ার ঠিকুজি সঠিক করে বলা কঠিন। তবে জাক লাকাঁর নয়া আবিষ্কারের কথা প্রথম শুনি সলিমুল্লাহ খানের মুখ থেকে প্রায় এক যুগ আগে। লাকাঁ-বিষয়ক স্যারের একাধিক বীজবপনকারী বৈঠক এবং সেখানে লালনের সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা এ লেখার মূল অনুপ্রেরণা। লাকাঁর অন্যান্য নয়া আবিষ্কারের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো অচেতন ও ভাষার সম্পর্ক নির্ণয়। তিনি বলেন, জিগমুন্ট ফ্রয়েড বর্ণিত অচেতনের গঠন ভাষার মতোই। এই অচেতন ও ভাষার পাটাতনে দাঁড়িয়ে লাকাঁ আরও দেখাতে থাকেন, কীভাবে মানুষ ভাষার অধীন হয়, কীভাবে সেই অধীন অবস্থায় এক মানুষের সঙ্গে আরেক মানুষের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। মানুষের মনে ‘তৃতীয় অস্তিত্ব’ (হতে পারে ঈশ্বরভাবনা) কীভাবে খেলা করে। কীভাবে অপরের বাসনা নিজের বাসনা হয়ে তারপর সেটা অধরা রয়ে যায়। লাকাঁ বলেন, কীভাবে Subject (সহজ মানুষ) মন্ময় নয়, একাধিক ‘আমি-ময়’ হয়ে যায়। লাকাঁর বয়ানে সহজ মানুষ বিভক্ত, বহু খণ্ডে। এই সহজ মানুষের সঙ্গে অপরের সম্পর্ক, অপর ও সহজ মানুষের মাঝে ‘তৃতীয় অপরের’ ভাববিনিময়, তাদের মধ্যে ভাবের অভাব নয়, অভাবের ভাব কী করে নির্মিত হয়—ইতি-আদি লাকাঁর লীলাভূমি। মনোবিশ্লেষণই যে তাঁর পেশা। ফারাকের মধ্যে লাকাঁর লীলা ফরাসি গদ্যে, আর শত বছর আগে সাঁইজির সাধনা গানে গানে। কিন্তু দুই মহাত্মার মধ্যে যে সহজ মানুষের দেখা পাওয়া যায়, যে প্রতিবেশী আর অপরের সন্ধান মেলে—সেগুলোর মধ্যে তুলনা টানলে বেখাপ্পা লাগে না। বরং এক চমত্কার ঐক্য ধরা পড়ে। লালনের লেখা ‘আর আমারে মারিস নে মা’ গানখানা নিয়ে ভিন্ন এক রচনায়১ ভিন্ন এক প্রসঙ্গে কথা বলেছি। অনেকদিন পর ওই একই গান শোনার সময় হুট করে আবিষ্কার করি লালন ও লাকাঁর ‘অপর’-সংক্রান্ত চিন্তার মিল। এই প্রবন্ধ ফাদার ইন্ধনদাতা, ওই অনুমাননির্ভর আবিষ্কার। এ রচনায় লালনের বাণী আর লাকাঁর বয়ান—দুটি পাশাপাশি রেখে উল্টেপাল্টে দেখার চেষ্টা করেছি। এবং গুরুত্ব দিয়েছি ‘পর’ বা ‘অপর’ বিষয়টিকে। যাহোক, গানের কথা বিশ্লেষণের আগে সংক্ষেপে জাক লাকাঁর ‘অপর’-সম্পর্কিত ধারণা নিয়ে দুটি কথা বলা আবশ্যক। ১. অগ্রসর পাঠক জানেন, লাকাঁ দুই ‘অপর’-এর কথা বলেছেন। এক ‘অপর’ শুরু হয় ছোট অক্ষরের ‘ও’ দিয়ে ‘আদার’ (small other); অন্য ‘আদার’ শুরু হয় বড় ‘ও’ দিয়ে (big Other)। বাংলাদেশের দার্শনিক সলিমুল্লাহ খান ছোট ‘ও’ সম্বলিত আদারের নাম দেন ‘অপর’ (small other) আর বড় ‘ও’ সম্বলিত আদারকে বলেন ‘পরম’ (big Other)। স্লোভেনিয়ার আরেক দার্শনিক ও লাকাঁবিশেষজ্ঞ স্লাভয় জিজেক লাকাঁ পাঠের তরিকা বাতলে দিতে গিয়ে বলছেন, লাকাঁর ভাষ্যমতে মানুষের বাস্তবতা গঠিত একে অপরকে ছেদ করে যাওয়া তিন বৃত্তের ওপর। এগুলোর নাম সিম্বলিক, ইমাজিনারি ও রিয়েল। সলিমুল্লাহ খান এই তিনের পরিভাষা খাড়া করেছেন সাঁইজিকে স্মরণ করে: আকার (Symbolic), সাকার (Imaginary) ও নিরাকার (Real)। এই নামকরণ কতটা সার্থক হয়েছে তা পরিষ্কার হবে জিজেকের বর্ণনায় ফিরে গেলে। জিজেক বলছেন দাবা খেলা দিয়ে এই তিনের উদাহরণ অনেকটা পরিষ্কার হয়।২ দাবা খেলতে হলে খেলোয়াড়কে খেলার নিয়মকানুন মেনে এগোতে হয়। যেমন রাজা এক ঘরের বেশি নড়তে চড়তে পারে না। কিংবা হাতি দৌড়োবে শুধু কোনাকুনি। ‘এই ভাবের প্রকাশ আকারে—অক্ষরে, শব্দে’৩ অর্থাত্, এটাই সিম্বলিক অর্ডার বা বলতে পারেন আকারের কারাগার। দাবা খেলায় বিভিন্ন ঘুঁটির যে নকশা ও নামকরণের মাধ্যমে যে চরিত্র নির্ধারণ হয়, তাতেই পরিষ্কার ধরা পড়ে ইমাজিনারি বা সাকার কী জিনিস। ‘লাকাঁর মতে, ইমাজিনারি শব্দটির মূলে আছে ইমেজ বা ছবি। মূর্তিও বলতে পারি বাংলায়।’৪ পৃথক সাকারে এই মন্ত্রী-সেনাদেরই আমরা ডাকতে পারি ‘প্রাণভ্রমরা’ কিংবা ‘প্রথম প্রতিরক্ষা’ নামে। বাকি রইল রিয়েল বা নিরাকার। জিজেক বলছেন, এই নিরাকার হলো নিয়ম কানুন ও চরিত্রসহ দাবার পুরো সেট, যা খেলাকে নিয়ন্ত্রণ করে। এবং এটা নির্ভর করে খেলোয়াড়ের বুদ্ধিমত্তা, চকিত কোনো সিদ্ধান্ত বা আচমকা কোনো চাল যা দিয়ে প্রতিপক্ষকে হতভম্ব করে দেওয়া যায়, খেলার সময়কে হুট করেই কমিয়ে আনা যায়, প্রলম্বিতও করা যায়। আকার ও সাকারের সহযোগিতায় এই স্তরে যেভাবে খেলা এগিয়ে যায়, তার কোনো আকার নেই বলেই সে নিরাকার। এখন এই ত্রয়ীর ভেতর সিম্বলিক অর্থাত্ আকারের ক্ষেত্রভূমিতে কাজ করে ওই বড় অপর মানে পরম। প্রশ্ন জাগে আকারের ক্ষেত্রভূমি চিজটা তবে কী? আমরা যখন কথা বলি (বা শুনি), একে-অপরের সঙ্গে ভাববিনিময় করি, তখন শুদ্ধ ভাষার নিয়মে কথা বলি না, আমাদের ভাষিক কর্মকাণ্ড নানা রকম গ্রহণ-বর্জন, হাজারটা বিধি-নিষেধের জটিল হিসাবনিকাশ ও ধারণা-অনুমান—ইত্যাদির ওপর পা রেখে চলে। প্রথমে ভাষার ব্যাকরণ আয়ত্তে আনতে হয়, অনেকটা অন্ধভাবেই, সচেতনভাবে ওইসব ব্যাকরণ অবশ্য মাথায় থাকে না, নইলে কথা বলাই মুশকিল হতো। এরপরই একে-অপরের সঙ্গে ভাববিনিময় বোঝাপড়ার পাটাতন বা ওই ক্ষেত্রভূমি। যেখানে কাজ করতে থাকে সামাজিক বিধি-নিষেধ, অচেতনের বিধি-নিষেধ ইত্যাদি। এই যে সীমা টেনে দেওয়া এবং এই সীমার মাঝেই অসীম সব কাজ-কারবার করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত, ভেবে, না ভেবে, থাকতে হচ্ছে গণ্ডীর ভেতরেই। এই সীমারেখা টেনে দেওয়ার কাজটিই করে পরম বা big Other। তাই একে আদর করে ‘ঈশ্বর’ ডাকা যায়। যিনি পেছন থেকে সবসময়ই আমার চলাফেরা, কথা বলার সীমা নির্ধারণ করে দিচ্ছে। অথবা একে ডাকা যায় ‘কারণ’, যে কারণে (স্বাধীনতা, সমাজতন্ত্র, জাতি, রাষ্ট্র) আমি নিজের জান কোরবান করে দিতে পারি। তাই, যখন অন্যের সঙ্গে ভাববিনিময় করি, তখন শুধু এক অপর (small other) অন্য অপরের (small other) সঙ্গে কথা বলে না, সেখানে সবসময়ই উপস্থিত থাকে পরম (big Other)। মানবশিশু যখন ভাষায় প্রবেশ করে না, তখন সে মাকে আলাদা করে চেনে না। যদিও মা ‘পর’। কিন্তু যখনই শিশু মাকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করে, তখনই ‘মা’ হয়ে ওঠে ‘পর’ থেকে ‘অপর’। সেই সঙ্গে নিজের ভেতরও তৈরি হয় ‘অভাব’ মানে ‘অভাবের ভাব’। এই অভাবের ভাব শুদ্ধ নিজের ভেতর নয়, শিশু তার মা অর্থাত্ অপরের মধ্যেও দেখতে পায়। তখন সে অভাবের ভাব দূর করতে সন্ধান করে অন্য আরেকের, তৃতীয়জনের, পরমের, ভাষার ভেতরেই সে হাতড়ে খোঁজে পূর্ণতা। ভাষা মানে নিয়ম, ভাষা মানে বিধি, ঈশ্বরও তো তা-ই, বিধির অপর নামই তো ঈশ্বর।৩ কিন্তু এই বিধি বা ভাষা কি অভাবের ভাব দূর করতে পারে? উত্তর হলো, না। তাই তো ঈশ্বরও আমার কাছে আসেন অভাবের ভাব দূর করতে। ভাষা ফিরে ফিরে আসে মানুষেরই কাছে। মানুষ নিজেকে খুঁজেফেরে ভাষার ভেতর। এযেন এক বর্তনী। লাকাঁ বলছেন, ভাষা হলো মানুষের জন্য এক ভয়ঙ্কর উপহার, যেমনটা ছিল ট্রয়বাসীদের জন্য গ্রিকদের পাঠানো কাঠের ঘোড়া। এই গ্রিক উপহারকে হোমারের জবানীতে লাকাঁ বলছেন ‘দানায়ৈ’ (Danaoi)।৫ এ উপহার ‘ভাষা’ গ্রহণের পরপরই আমরা এর কয়েদখানায় বন্দী হয়ে যাই। আমরা প্রবেশ করি সিম্বলিক অর্ডারে বা আকারের আইনে। ২. ফরাসি ভাবুক লাকাঁর ভাবনার সঙ্গে এবার মিলিয়ে দেখা যাক সাঁইজির ‘আর আমারে মারিস নে মা’ গানখানা। এই গানটি অনেকেই ব্যবহার করেছেন লালনকে হিন্দু সমপ্রদায়ভুক্ত করার কুমতলব থেকে। মূলত, এ গানে কৃষ্ণের কাহিনি এসেছে রূপক আকারে। লালন মেটাফোরের সাহায্য নিয়ে বলছেন জীবনের কথা, যাপিত জীবনে ভোগবিলাস, নীতি-নৈতিকতা, বিধি-নিষেধ এবং সেই নিষেধ না মানলে প্রকৃতি বা পরমের প্রতিশোধের কথা। এই গানের মাঝে দুই মা উপস্থিত। উপস্থিত দুই ‘পর’ বা ‘অপর’ও। গানটির প্রথম ছয় লাইন হলো: আর আমারে মারিস নে মা।/ বলি মা তোর চরণ ধরে ননী চুরি আর করব না \/ ননীর জন্যে আজ আমারে/ মারলি গো মা বেঁধে ধরে/ দয়া নাই মা তোর অন্তরে/ স্বল্পেতে গেল জানা \ যে শব্দ ও বাক্য দিয়ে গানটি রচিত, এতে রূপকের উপস্থিতি আর মর্মার্থের কোনো নির্দিষ্ট মানে যেহেতু হয় না, তাই আমার বয়ান লালন-গবেষকেরা প্রস্তাব আকারে দেখতে পারেন। লাকাঁ যে বিগ আদার বা পরমের কথা বলছেন, যে পরমকে ডাকা যায় ঈশ্বর বলে, আদর্শ বলে, সামাজিক নীতিনৈতিকতা, এমনকি অচেতন মনের যে উদগ্র বাসনা—তার ওপর চেতনের খবরদারিও বলা যায়। এই গানের প্রথম ছয় লাইনে দুটি রূপক উপস্থিত। এক হলো মা, অন্যটি ননী। এখন পৌরাণিক কাহিনিতেও যে এই মা আর ননী রূপকাকারে নেই, সেটা কীভাবে বলি? যাহোক, ফিরে আসি লালনে। মা এখানে আমার মতে লাকাঁর বিগ আদার বা পরম। পরমের বিধি-নিষেধ না মেনে জীবনের ননী বা মাখন খেলে তার ফল ভোগ করতেই হয়। যেহেতু বিধি লঙ্ঘনকারীর জন্য শাস্তির ব্যবস্থা থাকে বিধির মধ্যেই, যেহেতু আকারের নিয়মের ভেতর দিয়ে, সিম্বলিক অর্ডার মেনে পরমের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলতে হয়, তাই যখনই ব্যত্যয় ঘটে ওই আকারের নিয়মে, কোনো কারণে লাইনচ্যুত হয় রেলগাড়ি, তখনই ঘটে বিপত্তি। খেসারত দিতে হয়। মানুষের জীবন মানে আকারের আইনে বসবাস। যখনই মানুষ নিজের সব বাসনা চরিতার্থ করতে চায়, নিষেধ অমান্য করে তখন কোনো না কোনো বিপত্তি ঘটে এবং মার খেতে হয় জীবনে। তাই তো লালন বলছেন, ‘ননীর জন্যে আজ আমারে/ মারলি গো মা বেঁধে ধরে’। দাবার চালে নিয়ম না মানলে, চুরি করলে, ধরা পড়লে খেলাটাই বাতিল। ধরবে যে, সে পরম, তার বাস যেহেতু আমারই মাথায়, কাজেই চুরি করলে পার পাওয়ার উপায় কোথায়? শাস্তিটা পেতে হয় হাতেনাতে: ‘দয়া নাই মা তোর অন্তরে/ স্বল্পেতে গেল জানা’। পরের চারটি চরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। লালন বলেছেন:পরে মারে পরের ছেলে/ কেঁদে যেয়ে মাকে বলে/ সেই জননী নিঠুর হলে/ কে বোঝে শিশুর বেদনা \ এখানে পরে মারে পরের ছেলে—এর মানে কী? কোন ‘পর’ কোন ‘পরে’র ছেলেকে মারছে? এখানে সহজেই চোখে পড়ছে দুই ‘পর’ বা ‘অপর’কে। যেন লাকাঁর হয়ে লালনই শত বছর আগে বলে গেছেন, মা তো শিশুর কাছে পরই, আর পরম যেহেতু শাস্তিটা দিচ্ছে, তাই কথাটা ঘুরিয়ে বলা যায়, পরমে (big Other) মারে অপরের (small other) ছেলে। এখন প্রত্যেকেই যেহেতু একে-অন্যের কাছে পর এবং যেহেতু তৃতীয় শক্তি হিসেবে পরম উপস্থিত থাকছে সর্বদা, কাজেই আকারের নিয়ম নামের ক্ষেত্রভূমিতে দাঁড়িয়ে দুই ‘পর’, একে-অন্যের সঙ্গে ভাববিনিময় করে। এই আকারের নিয়ম বা সিম্বলিক অর্ডার দুই ‘পরের’ জন্যই সিদ্ধ। অতএব পরমের হাতে মার খাওয়ার যে নালিশ সহজ মানুষ (subject) করছে মায়ের (small other) কাছে, সেটা যে মার খাওয়ার মতোই ঘটনা, সেটা মা {small (m)other} অস্বীকার করে কী করে। কারণ সেও তো ওই আকারের কারাগারে (symbolic order) বন্দী। মা যখন পরমের পক্ষেই অবস্থান নেয়, তখন শিশুর কাছে মা হয়ে ওঠে ‘নিঠুর জননী’ আর শিশুর বেদনা হয়ে ওঠে অবর্ণনীয়। সুতরাং সাধু সাবধান! পরমকে চটাতে যাবেন না। এরপর আসি পরের চার লাইনে। সাঁইজি বলেছেন:ছেড়ে দে মা হাতের বাঁধন/ যায় যেদিকে যায় দুই নয়ন/ পরের মাকে ডাকব এখন/ তোর গৃহে আর থাকব না \ অভিমান ঝরে পড়ছে প্রতি শব্দে। হাতের বাঁধন আদতে সাবজেক্টের সঙ্গে অবজেক্টের সম্পর্ক, অপরের সাথে অপরের যোগ। যেহেতু মা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, ‘নিঠুর’ আচরণ করেছে, তাই এ অভিমান, সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি। শিশু বলছে, তোমাকে আর মা ডেকে আমার দরকার নেই। যে আমাকে শাস্তি দিল, তাকেই তবে মা ডাকি। ‘পরে’র মাকেই মা ডাকব। অর্থাত্ পরমই এখন অপর। লালনের গানে দেখছি স্মল আদারের জায়গায় বসতে চাইছে বিগ আদার। কিন্তু সেটা হুমকিই থেকে যাচ্ছে। কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই শেষের চার লাইনেও অভিযোগ-অনুযোগ চলছে: যে না বোঝে ছেলের বেদন/ সেই ছেলের মার বৃথা জীবন/ বিনয় করে বলছে লালন/ কাঁদছে সে করে করুণা \ পরমের নিষেধ অমান্য করার, আকারের শৃঙ্খল ভাঙার যে শাস্তি ভোগ করছে ওই শিশু, সেটা যদি মা না বোঝে, তাহলে ওই মায়ের জীবন বৃথা। এটা অভিযোগ মাত্র, তাই তো লালন বিনয় করে বলছেন, কান্নাই সার। মায়ের প্রতি করুণা করে সে কাঁদছে। মা কেন তাকে বুঝল না, কেন মা তার বেদনার সমব্যথী হলো না, এই ভাবটাই কি অভাবের ভাব নয়? মানুষ যে কারণে সর্বদাই অভিযোগ করে, কেউ তাকে বোঝে না। এই ‘কেউ’ কে? মা, শিশু ভাষায় প্রবেশের পর যিনি ‘অপর’ হয়ে যান, অথবা বলতে পারেন এই ‘কেউ’ হলো অন্য ‘পর’ বা পরি কিংবা প্রেমিকা। কান্নাই জীবনের চিরস্থায়ী সঙ্গী। ওই যে গ্রিক উপহার গ্রহণ করার পর যেমন দুর্দশা ঘটেছিল ট্রয়বাসীদের। তেমনি আকারের সাগরে সাঁতার কাটা শুরু মানে অভাবের ভাব জেঁকে বসা আর নিরন্তর সেই অভাবের ভাব দূর করতে অবিরাম ছোটাছুটি, কখনো কখনো পরমের নিষেধ অমান্য, অতঃপর পরমের মায়ের, অবশেষে ‘আর আমারে মারিস নে মা।/ বলি মা তোর চরণ ধরে ননী চুরি আর করব না \’ পাঠসূত্র: ১. বিধান রিবেরু, লালনের ননী চুরি: গৌতম ঘোষের ছলচাতুরি, প্রথম প্রকাশ:২৮ জানুয়ারি ২০১১, দৈনিক ইত্তেফাক ২. Slavoj Žižek, How to Read Lacan, Granta Book, London (2006), page: 8-9 / ৩. সলিমুল্লাহ খান, আমি তুমি সে (জাক লাকাঁ বিদ্যালয়- দ্বিতীয় খণ্ড), সংবেদ ও এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা, ঢাকা (২০০৮), পৃষ্ঠা: ১১৭ / ৪. ঐ / ৫. Slavoj Žižek, ঐ, পৃষ্ঠা: ৭ / ৬. আবুল আহসান চৌধুরী (সংগ্রহ-গবেষণা-ভূমিকা-সম্পাদনা), লালনসমগ্র, পাঠক সমাবেশ, ঢাকা (২০০৯), পৃষ্ঠা: ১৪০ সহায়ক গ্রন্থ: Jacques Lacan, Écrits, Translated by Bruce Fink, W. W. Norton & Company 2006.