সংবিধান পর্যালোচনা-৬

সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা না হারালে আগাম নির্বাচনের সুযোগ নেই

সরকার সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না হারানো পর্যন্ত দেশে আগাম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোন সুযোগ নেই। একই সঙ্গে অন্য কেউ সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন নন এই মর্মে সন্তুষ্ট হলেই কেবল রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙ্গে দিতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থা হারিয়েছেন মর্মে রাষ্ট্রপতির কাছে লিখিত পত্র দিতে হবে। এছাড়া রাষ্ট্রপতির সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার আর কোন এখতিয়ার সংবিধানে নেই। সরকার সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে আগাম নির্বাচন দিতে পারে এ ধরনের একটি শঙ্কা রাজনৈতিক মহলে রয়েছে। বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন জনসভায় সরকার আগাম নির্বাচন দেয়ার পাঁয়তারা করছে এ ধরনের শঙ্কাও ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু আমাদের সংবিধানে স্বাভাবিকভাবে আগাম নির্বাচন দেয়ার সুযোগ নেই। আগাম নির্বাচনের বিষয়টি একটি ‘শর্তের সঙ্গে যুক্ত’। সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার ক্ষমতাও স্বেচ্ছাধীন নয়। এটিও দুটি শর্তের সঙ্গে যুক্ত। এর একটি হলো প্রধানমন্ত্রী সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থা হারিয়েছেন এবং অন্যটি হলো আর কোন সদস্য সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন নন। এছাড়া মেয়াদ অবসানের আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার এখতিয়ার কারো নেই। এ প্রসঙ্গে সংবিধানের ৫৭(২) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, “সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারাইলে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করিবেন কিংবা সংসদ ভাঙ্গিয়া দিবার জন্য লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দান করিবেন এবং তিনি অনুরূপ পরামর্শ দান করিলে রাষ্ট্রপতি, অন্য কোন সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন নহেন এই মর্মে সন্তুষ্ট হইলে সংসদ ভাঙ্গিয়া দিবেন।” সংবিধানে ১ থেকে ১৫২টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। ৫৭ (২) অনুচ্ছেদ ছাড়া অন্য কোন অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার ক্ষমতা প্রসঙ্গে কিছু বলা নেই। এদিকে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচনের ৪২ দিন আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার অভিমত দেন। কিন্তু বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠতা না হারানো পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার লিখিত অনুরোধ জানাতে পারবেন না। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভরশীল নয়। কেননা রাষ্ট্র পরিচালনার বিধান কারো ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে না। প্রধানমন্ত্রী কোন কারণে যদি পদত্যাগ করেন তাহলেও রাষ্ট্রপতির সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার ক্ষমতা নেই। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে সংসদে অন্য কোন সদস্য বা দল সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে। এছাড়া সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদে (ক) উপ-দফায় উল্লেখ রয়েছে “মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।” তবে এ ক্ষেত্রে একটি শর্ত রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, “তবে শর্ত থাকে যে (ক) উপ-দফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত উপ-দফায় উল্লেখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত, সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না।” সংবিধানের এই বিধানের কারণে ৪২ দিন আগে সংসদ বাতিলের সুযোগ নেই। কেননা বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদ বহাল রেখেই জাতীয় নির্বাচন করতে হবে।