মানবতাবিরোধী অপরাধ
কাদের মোল্লার মামলার রায় যে কোন দিন
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:২২
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার কাজ শেষ হয়েছে। যেকোন দিন এ মামলার রায় হতে পারে। গতকাল বৃহস্পতিবার আসামিপক্ষের পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন শেষে বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লার মামলার রায় অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখে। উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ২৫ মার্চ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর দ্বিতীয় মামলা হিসাবে কাদের মোল্লার মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রইল।
যদিও এর আগে দুটি মামলার রায় অপেক্ষমাণ রেখেছিল দুটি ট্রাইব্যুনালই। কিন্তু বিচারপতি নিজামুল হকের পদত্যাগের পর ট্রাইব্যুনাল-১ পুনর্গঠিত হওয়ায় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলায় উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। বর্তমানে কাদের মোল্লার সঙ্গে পলাতক আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের মামলার রায় অপেক্ষমাণ রয়েছে।
গতকাল ট্রাইব্যুনালে পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করেন কাদের মোল্লার আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ দাঁড় করাতে এবং প্রমাণ করতে পারেনি। তিনি আদেশের পর সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের দায়িত্ব হচ্ছে মামলাটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা। তারা এ দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, দুটি বিদেশি যুদ্ধাপরাধের মামলার বিষয়ে আমরা ট্রাইব্যুনালে বলেছি। এ দুটি মামলার কথা রাষ্ট্রপক্ষও উল্লেখ করেছে। এ দুটি মামলার সঙ্গে কাদের মোল্লার মামলার কোনো সম্পর্ক নেই। ট্রাইব্যুনাল মামলাটির রায় অপেক্ষমাণ রেখেছেন। কবে রায় দেয়া হবে সেটা আগেই বিচারকরা আমাদের জানাবেন।
অন্যদিকে গত বুধবার আবদুল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানায় রাষ্ট্রপক্ষ। ট্রাইব্যুনাল-২ এ আসামিপক্ষের যুক্তির জবাব দেয়ার সময় কৌঁসুলি মোহাম্মদ আলী এই দাবি জানান। তিনি বলেন, আসামি মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীত ও সফলভাবে আসামির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।
কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগ
মুক্তিযুদ্ধকালে গোলাম মোস্তফা নামে এক মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার অভিযোগে ২০০৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর কাদের মোল্লাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে কেরানীগঞ্জ থানায় একটি মামলা হয়। ওই মামলাটি করেছিলেন কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে এই মামলার প্রথম সাক্ষী মোজাফফর আহমেদ খান। ২০০৮ সালে পল্লবী থানায় আরো একটি মামলা হয় কাদের মোল্লাসহ আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে। ওই মামলার অভিযোগে ২০১০ সালের ১৩ জুলাই তাকে গ্রেফতার করা হয়। কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত শুরু হয় ২০১০ সালের ২১ জুলাই। ঐ বছরের ২ আগস্ট এ মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। ২০১১ সালের ৩১ অক্টোবর তদন্ত শেষ হওয়ার পর ১৮ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ আনে রাষ্ট্রপক্ষ। ২৮ ডিসেম্বর অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। এরপর গত বছরের ২৮ মে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে তার আনুষ্ঠানিক বিচার কাজ শুরু হয়।
মামলার বিচার প্রক্রিয়া
গত বছরের ১৬ এপ্রিল রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে আবদুল কাদের মোল্লাসহ আরো তিন আসামির মামলা যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করা হয়। ২ থেকে ১৬ মে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে শুনানি চলে। ট্রাইব্যুনাল-২ এ গত ২৮ মে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলার বিচার শুরু হয়। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ২০ জুন সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করে। রাষ্ট্রপক্ষের প্রথম সাক্ষী জবানবন্দি দেন ৩ জুলাই। ৪ নভেম্বর পর্যন্ত কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) আব্দুর রাজ্জাক খান ও মনোয়ারা বেগমসহ রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয় এবং আসামিপক্ষ তাদের জেরা করেন। এছাড়া এদের মধ্যে ক্যামেরা ট্রায়ালে এক নারীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণের পর শুরু হয় আসামিপক্ষের সাফাই সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ। ৪ নভেম্বর সাফাই সাক্ষীর জন্য আসামিপক্ষের দাখিল করা ৯৬৫ জনের তালিকা থেকে ৬ জন সাক্ষীকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য নির্দিষ্ট করেন ট্রাইব্যুনাল। ১৫ নভেম্বর থেকে শুরু হয় আসামিপক্ষের সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ। কাদের মোল্লা নিজেই সাফাই সাক্ষ্য দেন। ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত কাদের মোল্লাসহ ৬ জনের সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষ তাদের জেরা সম্পন্ন করেন।
পরে গত ১৭ ডিসেম্বর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করে রাষ্ট্রপক্ষ। ১৭ থেকে ২৭ ডিসেম্বর ও গত বুধবার যুক্তি উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে ৭ জানুয়ারি থেকে আসামিপক্ষ মোট ৮ কার্যদিবসে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করে।