ময়মনসিংহ জেলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন শাখা
ব্যাংকিং খাত উল্লেখযোগ্য রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫৭
বর্তমান সরকারের উন্নয়ন প্রক্ষেপণে দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক উন্নয়নের যে অভূতপূর্ব স্বপ্নের অবতারণা করা হয়েছে তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি পরিমিত ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশল বাস্তবায়নে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে
কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ময়মনসিংহ বাংলাদেশের একটি পুরাতন বৃহত্তম ও বর্তমানে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম জেলা। বৃহত্তর ময়মনসিংহের ছয়টি জেলায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রসারের লক্ষ্যে এ অঞ্চলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন শাখা অফিস হোক-এটি ছিল এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা। এ আকাঙ্ক্ষা বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির সাথে সঙ্গতি রেখে সম্প্রসারিত হয়েছে দেশের আর্থিক খাত এবং বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। সরকারের অনুসৃত উন্নয়নমুখী ও উদ্যোক্তাবান্ধব আর্থিক নীতির সাথে সঙ্গতি রেখে মুদ্রানীতি অনুসরণের ফলে শিল্প, বাণিজ্য ও কৃষির সম্প্রসারণের সাথে সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং লেনদেন ও মুদ্রার চাহিদা। ক্রমবর্ধমান এ সকল চাহিদা ও কর্মকাণ্ড বিবেচনাপূর্বক এর যথাযথ সঞ্চালন নিশ্চিত করার জন্যে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিনিয়ত প্রবর্তন করে চলেছে নতুন নতুন কৌশল এবং নিয়োজিত করছে দক্ষ জনবল। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত প্রধান কার্যালয় ও মতিঝিল অফিস হতে ক্রমবর্ধমান চাহিদার অনেকাংশই যথাযথভাবে বিবেচনায় আনা এবং পূরণ করা সম্ভব হয়ে উঠছে না। অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামাজিক গুরুত্বের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও মতিঝিল অফিসের বিভিন্ন কাজ যথাযথভাবে এবং যথাসময়ে সম্পাদনের দিক বিবেচনায় রেখে দীর্ঘ ২২ বছর পর বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ শাখা রংপুরে স্থাপন করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন শাখা স্থাপনের ক্ষেত্রে স্থান হিসেবে প্রায় আড়াই কোটি অধিবাসী ও দেশের প্রায় ১৩ শতাংশ ভূমি অধ্যুষিত বৃহত্তর ময়মনসিংহের ছয়টি জেলা অর্থাত্ ময়মনসিংহ, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল ও শেরপুরের কেন্দ্রস্থল ময়মনসিংহকে বিবেচনা করা হয়েছে।
বর্তমান সরকারের উন্নয়ন প্রক্ষেপণে দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক উন্নয়নের যে অভূতপূর্ব স্বপ্নের অবতারণা করা হয়েছে তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি পরিমিত ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশল বাস্তবায়নে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ এ অঞ্চলে রয়েছে কৃষি, কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প বিশেষ করে চালকল, পাটজাতপণ্য, তাঁত ও হস্তশিল্প, মত্স্য প্রক্রিয়াকরণ, পোলট্রি, ডেইরি ফার্ম, গরু মোটাতাজাকরণ, কৃষি যন্ত্রপাতি, হালকা প্রকৌশল শিল্প ইত্যাদির অপার সম্ভাবনা। রেণু পোনা ও মত্স্যচাষে ময়মনসিংহ অঞ্চল ইতোমধ্যে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছে। দেশের প্রায় অর্ধেক মত্স্য এখানে চাষ হয়ে থাকে। ব্রহ্মপুত্র নদের বালি থেকে কাঁচ ও নেত্রকোনার বিজয়পুরের চীনামাটি থেকে সিরামিক শিল্প গড়ে উঠতে পারে। এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ নারী হলেও এখানে নারী উদ্যোক্তা তেমন গড়ে উঠেনি। অথচ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীদের সম্পৃক্ত করা খুবই প্রয়োজন। আর এসব সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে এ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সাধনের জন্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই শাখা অফিসটি স্থাপন করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশ ব্যাংককেই প্রতিনিধিত্ব করবে। এখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক স্থানীয় ব্যবসায়িক সংগঠন, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ও সুধীজনদের সাথে সময়ে সময়ে মতবিনিময় করবেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কৃষি, মত্স্য ও ছোট ছোট কৃষি যন্ত্রপাতি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এ গবেষণা কাজের সাথে কিভাবে এসএমই অর্থায়নকে সম্পৃক্ত করা যায়, এলাকার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর লিংকেজকে কাজে লাগিয়ে ব্যাংকিং সেবাবঞ্চিত মানুষের কাজে কিভাবে আর্থিক সেবা পৌঁছানো যায় সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করে যাবে। বৃহত্তর ময়মনসিংহের অধিভুক্ত ছয়টি জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রসারে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারলেই এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপস্থিতি স্বার্থক হবে বলে আমি মনে করি। একই সাথে আমি স্থানীয় ব্যাংক শাখাগুলোকে অনুরোধ করছি, তারা যেন এসব সম্ভাবনাময় খাতে সময়মতো ও হয়রানিমুক্তভাবে কৃষি ও এসএমই ঋণ প্রদান করে এ অঞ্চলের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত উল্লেখযোগ্য রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দারিদ্র্যমুক্ত করে বিশ্বের মধ্যম আয়ের দেশগুলোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে টেকসই, স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্যে আমাদের স্বপ্ন পূরণের সমর্থনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংক সামাজিক দায়বোধভিত্তিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ অভিযানের মাধ্যমে সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠিকে আর্থিক সেবার আওতায় আনাসহ স্বল্প বিত্তদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে অর্থায়ন; কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে দীর্ঘ মেয়াদি আর্থ-সামাজিক অগ্রাধিকার সম্পন্ন কর্মকাণ্ডে অর্থায়নে ব্যাংকগুলোকে সচেষ্ট রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক গৃহীত এই নতুন ধারণার আলোকে ময়মনসিংহে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন শাখা খোলার বিষয়টি খুবই সময়োপযোগী ও যৌক্তিক হয়েছে।
(ময়মনসিংহের দুর্গাবাড়ি রোডে হূদয় টাওয়ারে ব্যাংকের ১০তম ময়মনসিংহ অফিসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে গভর্নরের বক্তব্য)