শিল্প কারখানায় অগ্নি নিরাপত্তা :কতিপয় পরামর্শ
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৪
দুর্ঘটনায় বিশেষত অগ্নি দুঘটনায় ফি বছর এদেশে কত মানুষ অঙ্গার হয়, আর কত হাজার কোটি টাকার সম্পদ ছাই হয় এই হিসাব বোধকরি সংশ্লিষ্ট দপ্তরেরও জানা নেই। এই তো সেদিন তাজরীন ফ্যাশনে যে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে গেলো সরকার বা কর্তৃপক্ষ কেউই জানেন না যে ওখানে কতলোক চাকরি করতো—এর মধ্যে কতজন নিখোঁজ আর জীবিত আছেন কতজন?
শিল্প-কারখানা, অফিস বা বাণিজ্যিক ভবনে স্বল্প খরচে ও সহজে অগ্নি প্রতিরোধের কতিপয় পরামর্শ আজকের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। বর্তমানে ভবন নির্মাণে প্রতি বর্গফুটে সাদামাটাভাবেও খরচ পড়ে ১৭/১৮ শ টাকা। আমরা মনে করি এর সঙ্গে বর্গফুটপ্রতি মাত্র ৩০/৪০ টাকা বাড়তি খরচেই দীর্ঘস্থায়ী, সহজ ও প্রায় শতভাগ নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব।
ধরা যাক, প্রতি তলা ১০০–৫০=৫০০০ বর্গফুট আয়তনের ৬ তলা একটি ভবনে মোট ক্ষেত্রফল দাঁড়ালো ৫০০০–৬=৩০,০০০ বর্গফুট। এখন প্রতি বর্গফুটের জন্য ২ লিটার হিসেবে ৬০ হাজার লিটার পানির একটি আধার ছাদ থেকে অন্তত ২০ ফুট উচ্চতায় স্থাপন করা হলো। ঐ আধার থেকে ১০ ইঞ্চি ব্যাসের একটি পাইপ ভূমি সমতল অবধি টানা হলো এবং এটির সঙ্গে প্রতি তলার জন্য ৪ ইঞ্চি ব্যাসের একটি করে ৬টি পাইপ সংযোজনপূর্বক প্রতিটি তলায় নিয়ে যাওয়া হলো। ৪ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপগুলো প্রতি তলার ছাদের সঙ্গে লম্বালম্বি সংযুক্ত করা হলো। অতঃপর এর সঙ্গে প্রথমত ৫ ফুট ও পরবর্তী সময়ে ১০ ফুট অন্তর সোয়া এক ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ ছাদের প্রান্ত পর্যন্ত আড়াআড়িভাবে স্থাপন করা হলো। এইবার আড়াআড়িভাবে স্থাপিত সোয়া এক ইঞ্চি ব্যাসের পাইপগুলোতে প্রথমটি ৫ ফুট ও পরবর্তী সময়ে ১০ ফুট দূরত্বে একটি একটি করে ফোয়ারা সংযুক্ত করা গেলো। এতে করে মোটামুটি প্রতি ১০০ বর্গফুটের জন্য একটি করে ফোয়ারা পাওয়া যাবে। ভূমি সমতলে ৪ ইঞ্চি ব্যাসের প্রতিটি পাইপের সংযোগ স্থলে হাতল বিশিষ্ট চাবি সংযুক্ত করা হলো। (নিরাপদ হেফাজতের জন্য প্রয়োজনে কাচের ছাদ যুক্ত ধাতব ফ্রেমেও রাখা যেতে পারে।) অগ্নি দুর্ঘটনার সূত্রপাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তলার চাবিটি খুলে দেয়া মাত্র ফোয়ারাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি ছিটাতে থাকবে একযোগে, এতে করে সূচনাতেই আগুন নিয়ন্ত্রণে এসে যাবে। এখানে দৃষ্টান্তমূলকভাবে চার স্তরের পাইপ ধরা হয়েছে যা প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কম বেশি হতে পারে। তবে এখানে আমরা পানির চাপ ও প্রবাহের সঙ্গে মোটামুটি সাইজগুলোর মিল রাখতে চেষ্টা করেছি, যেহেতু দশ ইঞ্চি, চার ইঞ্চি, সোয়া এক ইঞ্চি ও আধা ইঞ্চি ব্যাস যথাক্রমে ৭৮.৫৪, ১২.৫৬, ১.২২ ও ০.২ বর্গ ইঞ্চির সমান যা পানির প্রবাহ ও চাপের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে ব্যবহারিক দিকটা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সমন্বয় সাপেক্ষ কার্যকারিতা শতভাগ নিশ্চিত বলা চলে। এখানে আর একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, আপত্কালীন ব্যবহারের পণ্য প্রতিটি ভবনেই ভূগর্ভে পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও তেল বা গ্যাস চালিত পাম্প থাকাও জরুরি।
আর একটা বিষয় হলো, দুর্ঘটনার কথা শোনামাত্র সকলে এক যোগে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে অপ্রশস্ত সিঁড়ির কারণে পদদলিত হয়েও মারা পড়ছে শ্রমিকরা বারবার। গেট বা সিঁড়ি তালাবদ্ধ রাখার অভিযোগ প্রায়শই শোনা যায়। এই ক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ হলো, ফ্যাক্টরি ছোট বা বড় হোক কমপক্ষে দু’টি সিঁড়ি অবশ্যই থাকতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই সিঁড়ি বা গেট ছুটির আগে তালাবদ্ধ রাখা যাবে না। চলাচলের পথ ও সিঁড়ি সবসময় মুক্ত রাখতে হবে। এমনও দেখা গেছে আগুন সিঁড়িতে যাওয়ার পথ রোধ করে ছিল বলে সিঁড়ি ব্যবহার করাই সম্ভব হয়নি শ্রমিকদের পক্ষে। ফ্যাক্টরির পরিসর, তলার সংখ্যা ও শ্রমিকের সংখ্যার প্রতি লক্ষ রেখেই সিঁড়ির প্রশস্ততা নিরুপণ করা উচিত। যেমন ৫ তলার কোনো একটি ভবনে প্রতি তলায় যদি ২০০ কর্মী থাকেন তাহলে পঞ্চম তলা থেকে চতুর্থ তলায় নামার সিঁড়িটা কমপক্ষে ৭ ফুট প্রশস্ত হওয়া উচিত। অতঃপর চতুর্থ তলা থেকে তৃতীয় তলায় নামার সিঁড়ি আরো দু’ফুট বাড়িয়ে ৯ফুট রাখা যেতে পারে। এভাবে নিচে দিকে প্রতি তলার সিঁড়ি অন্তত দু’ফুট বাড়িয়ে নিতে হবে শেষ অবধি। সর্বশেষ মূল গেটটি নিয়ে তলার সিঁড়ি অপেক্ষা ৫/৭ ফুট বড় রাখা বাঞ্ছনীয়।
এ তো গেলো ফ্যাক্টরির ভেতরের কথা, কিন্তু বাইরে তারা নিরাপদ কতটুকু? গভীর রাতে ফ্যাক্টরি ছুটির পর তারা কেমন করে ডেরায় বা খুপড়িতে ফেরে তা মালিক বা জান-মালের জিম্মাদারের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে কি? রাত দশটা বা এগারোটা, শীত বা বর্ষা, খুপরিতে ফেরার অপেক্ষায় হাজার হাজার কিশোরী বা তরুণী রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে বাসের অপেক্ষায়। দূর থেকে হেলপারের হুঙ্কার ‘কোনো মহিলা উঠবেন না’। নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করেও কেউ যদি ওঠার চেষ্টা করে নিজের গরজে—ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেয়া হয় নির্দয়ভাবে। তার পর ‘দিনু ডাক হরকরা’র মতোই জান ও ইজ্জতের ঝুঁকি নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলা, না হয় ড্রাইভারের দয়ার অপেক্ষা করতে থাকা। এভাবেই তাদের চলে দিন, মাস, বছর। এ যে তাদের কপাল লিখন! এই নিরাপত্তাহীনতায় কতজন পাশবিকতার শিকার হচ্ছে, সেই খবর কে রাখে? কথায় কথায় পোশাকশিল্পকে হূদপিণ্ড বা ধমনির সঙ্গে তুলনা করে কোনো লাভ নেই। দয়া করে এই ‘শিল্প দাস’দের দিকে নজর দিন, যারা প্রতিদিন ১৪/১৬ ঘণ্টা শ্রম দিয়ে অতীতের কৃতদাসদেরও হার মানিয়েছে। পরাধীন আমলে নীলকরদের এমনি জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে এক ভয়ঙ্কর বিদ্রোহ হয়েছিল এই দেশে, আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের ‘শিল্প দাস’দেরও কি সেই অপেক্ষায় থাকতে হবে?
গাজীপুর