ডাকাতদের গুলিতে মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়াউদ্দিন আহত
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১৬
মুক্তিযুদ্ধে ৯নং সেক্টরের সুন্দরবন সাব সেক্টর কমান্ডার ও দুবলার ফিশারমেন গ্রুপের চেয়ারম্যান মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ গতকাল শুক্রবার দুপুরে সুন্দরবনে ডাকাতের বন্দুকের গুলিতে আহত হয়েছেন। তার ছোট ভাই ও দুবলা ফিশারমেন গ্রুপের যুগ্ম সম্পাদক কামাল উদ্দিন দুবলার চর থেকে মোবাইল ফোনে ইত্তেফাককে জানান, মেজর জিয়া খুলনা থেকে স্পিডবোটযোগে সুন্দরবন যাওয়ার পথে দুবলার চরের কাছাকাছি ত্রিকোনা আইল্যান্ডের কাছে ডাকাত মুর্তুজা বাহিনীর হামলার শিকার হন। এসময় তার সঙ্গে ডাকাতদের গুলি বিনিময় হলে তার মাথায় গুলি লাগে। এ সময় চার ডাকাত গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে বলে কামাল জানান।
তিনি আরও জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে স্পিডবোটে করে মেজর জিয়াকে দুবলার চরের মেহেরআলী খালে অবস্থিত জেলেপল্লীতে নিয়ে আসা হয়। এখানে তার মাথায় প্রাথমিক চিকিত্সা দেয়ায় রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়েছে। তবে তিনি পুরোপুরি আশঙ্কামুক্ত নন। মেজর জিয়া ইত্তেফাককে মোবাইল ফোনে জানান, সকালে তিনি খুলনা থেকে মংলাবন্দর হয়ে দুবলার চরের মেহেরআলীতে যাচ্ছিলেন। ১২টার দিকে হিরণপয়েন্টের পূর্ব দিকে ত্রিকোন দ্বীপ চ্যানেল হয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। এখানে মরাপশুর নদীর চ্যানেলটি সরু থাকায় আগে থেকে ওঁেপতে থাকা মুর্তুজা বাহিনীর ডাকাত সদস্যরা তাকে উদ্দেশ্য করে গুলি ছুঁড়তে থাকে। এ সময় তিনি জীবন রক্ষার্থে মেগনাম বন্দুক দিয়ে পাল্টা গুলি ছুঁড়েন এবং নিক্ষিপ্ত গুলিতে কমপক্ষে চার জন ডাকাত ঘটনাস্থলে নিহত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এছাড়া আরও কয়েকজন ডাকাত আহত হয়েছে বলেও তার ধারণা।
খবর পেয়ে ঢাকার স্বজনরা প্রাইভেট হেলিকপ্টার চার্টার করার জন্য যোগাযোগ করেন। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে প্রাইভেট হেলিকপ্টার সুন্দরবনে অবতরণ করতে পারবে না বলে পরে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে যোগাযোগ করা হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিকালে বাংলাদেশ বিমান বিহিনীর একটি হেলিকপ্টার দুবলার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে আকাশে ঘন কুয়াশা থাকায় অবতরণ করতে ব্যর্থ হয়ে ঢাকায় ফিরে যায়। সর্বশেষ প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী মেজর জিয়াকে আহত অবস্থায় স্পিডবোটে করে রাতেই কোস্টগার্ডের ব্যবস্থাপনা ও প্রহরায় মংলা হয়ে খুলনায় নিয়ে যাওয়ার কথা। মেজর জিয়ার সুন্দরবনে ডাকাতদের গুলিতে আহত হওয়ার খবরে সুন্দরবন ও সন্নিহিত এলাকায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
মেজর জিয়া গত ৩০ বছর সুন্দরবনের দুবলার চরে মত্স্য ব্যবসায় রয়েছেন। এখানকার মত্স্য ব্যবসায়ীদের পেশাগত, আইন শৃঙ্খলাগত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে তিনি নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনাগত সহযোগিতা করে আসছেন। বিশেষত সুন্দরবনে বনদস্যুদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা ও পরামর্শ দানের জন্য ডাকাতরা তার উপর ক্ষুব্ধ ছিল। কয়েক বছর ধরে তিনি সুন্দরবনে পর্যটন ব্যবসাও করছেন। ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সুন্দরবনে সাব সেক্টর কমান্ড হেডকোয়ার্টার স্থাপন করে তিনি এ অঞ্চলে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। ’৭৫ সালের নভেম্বর মাসে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করে ঘাঁটি স্থাপন করেন এবং পরে গ্রেফতার হয়ে দণ্ডভোগ করেন। সুন্দরবন বাঁচাও কর্মসূচি নামে একটি সংগঠনেরও তিনি আহ্বায়ক। তাছাড়া দুবলার চর রাস মেলা আয়োজক কমিটিরও তিনি সভাপতি। এ দিকে মেজর জিয়ার আহত হওয়ার খবরে পিরোজপুর শহরে মাইকিং করে তার পরিবারের পক্ষ থেকে আশু সুস্থতা কামনায় জনগণের দোয়া চাওয়া হয়।
এদিকে শরণখোলা সংবাদদাতা জানান, ঘটনার সময় মেজর জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে ৭-৮ জন দেহরক্ষী ছিলেন। ডাকাতরা গুলি চালালে তার দেহরক্ষীরাও পাল্টা গুলি চালায়। এ সময় উল্লেখিত ডাকাতরা নিহত হয়।
মংলা সংবাদদাতা জানান, এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বনদস্যুদের নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেনি। বাগেরহাটের পুলিশ সুপার খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, এ ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে।
খুলনা অফিস জানায়, রাত ১০-৫০ মিনিটে মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিনকে খুলনা সার্জিক্যাল ক্লিনিকে নিয়ে আসা হয়। তার গাড়ির বহর ক্লিনিকের গেটে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষমাণ মানুষ এই হামলার প্রতিবাদে শ্লোগান দিতে থাকে। তিনি ডা. কাজী মিজানুর রহমানের তত্ত্বাবধানে চিকিত্সাধীন রয়েছেন। তার অবস্থা স্থিতিশীল।