সবজিতে লাভবান কৃষক
মাটি ও মানুষের কৃষি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:০০
মাঠের পর মাঠ ফুলকপি। বড় বড় সাদা ফুল ছড়িয়ে আছে দিগন্ত জুড়ে। পাশেই বাঁধাকপির ক্ষেত। সেখানেও চোখ ধাধানো সবুজ। শিমের ডগাগুলো লকলকিয়ে যেন কথা বলছে কৃষকের সাথে। সকালের রোদ যেন হাসির রেশ ছড়িয়ে দিয়েছে বেগুন ক্ষেত জুড়ে। মাচায় দুলছে লাউ। এভাবেই শীতকালীন মাঠে আভা ছড়াচ্ছে মুলা, শশা, খিরা, ঝিঙা, বেগুন, বরবটি, করলা, উচ্ছে, টমেটোসহ বিভিন্ন জাতের সবজি। এই মনলোভা দৃশ্য এখন দেশের অধিকাংশ এলাকায়। অন্যান্যবারও মাঠ এভাবেই হাসে, কিন্তু বাজারমূল্যে কৃষকের মুখে ফোটে না হাসির রেখা। এবার তার ব্যতিক্রম। সত্যিকার অর্থেই এবার সবজি আবাদ করে দেশের অধিকাংশ এলাকার কৃষক লাভবান। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে একেবারে রাজধানীর বাজার পর্যন্ত সবজির চলমান বাজারদরে কৃষককে অন্তত এই সময়ে ঠকতে হচ্ছে না। বলা বাহুল্য, ব্যবসায়ীও অনেক বেশি লাভবান। কিন্তু ভাল খবর এটিই যে কৃষককে লোকসান গুনতে হচ্ছে না। উত্পাদন খরচের হিসেবে সে মোটামুটি লাভ করতে পারছে। যদিও কৃষক বলছেন, পর পর তিন বছর ধানসহ বিভিন্ন ফসলের লোকসান এই একবারের সামান্য লাভ দিয়ে পোষানো সম্ভব নয়। তারপরও ফসল যদি ভাল হয়, বাজার যদি স্থিতিশীল থাকে তাহলে কৃষকের পকেটে টাকা ঢুকবেই। ঈশ্বরদীর স্বনামধন্য কৃষক ও সংগঠক সিদ্দিকুর রহমান ময়েজ বলছেন, এবার যে কৃষকের দশ বিঘায় সবজি আছে, সে কৃষক লালে লাল। অর্থাত্ তার অবস্থা সত্যি সত্যিই ভাল।
গত প্রায় টানা তিন বছর কঠিন পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে কৃষককে। ধান, পাট, আলুর দাম পাচ্ছে না তারা। গত বছর ভরা মৌসুমে পায়নি পেঁয়াজ-রসুনের দাম। পর পর দু’ বছর ধানের আশাতীত ফলনের কারণে এখন দেশে ২৩ লাখ টন ধান উদ্বৃত্ত রয়েছে। কিন্তু যেখানে কৃষকের ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা উত্পাদন খরচ হয়েছে সেখানে সে বাজারে বিক্রি করেছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। কোনো কোনো অঞ্চলে তার চেয়েও কম। পাট উত্পাদন করেও দুর্দশার কোনো তারতম্য ঘটেনি।
গত বছরও শীতের সবিজ মুলা বাজারে বিক্রি করতে না পেরে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে গেছে কৃষক। এখন আশাব্যঞ্জক বাজারমূল্য। তারপরও রাজধানীতে যে দামে সবজি বিক্রি হয়, সে দাম কখনো কৃষক চোখে দেখে না- এমন হতাশা রয়েই গেছে। এখন একজন কৃষক তার স্থানীয় বাজার থেকে এক কেজি শিম বিক্রি করতে পারছে ২০ থেকে ২৫ টাকা, টমেটো বিক্রি করছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, মুলা ১০ থেকে ১৫ টাকা, ফুলকপি ২০ থেকে ২৫ টাকা, বাঁধাকপি ১০ থেকে ১৫ টাকা, লাউ ২৫ থেকে ৩০ টাকা, গাজর ৩০ থেকে ৩২ টাকা। যদিও এই সবজিগুলো মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে বাজারে এসে দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে দেখা যায়, প্রতিকেজি বেগুন এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা, শিম ৬০ টাকা, পটল ৫০ টাকা, করলা ৬০ টাকা, বরবটি ৫০ টাকা, নতুন আলু ৪০ টাকা, টমেটো ৬০ থেকে ৭০ টাকা। এছাড়া একটি ফুলকপি ৩০ থেকে ৪০ এবং বাঁধাকপি ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় (আকার ভেদে আরো বেশি) বিক্রি হচ্ছে।
শীতকালীন বেশির ভাগ সবজিই উত্পাদন হয় যশোর, ঝিনাইদহ, নড়াইল, নরসিংদী, কুষ্টিয়া, রংপুর, রাজশাহী, জামালপুর, বগুড়া ও মানিকগঞ্জে। হেক্টরপ্রতি উত্পাদনশীলতায় আবার এসব জেলার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে ব্রহ্মপুত্র নদ বিধৌত জেলাগুলোয়ও সমপ্রতি সবজির আবাদ বেড়েছে। হেক্টরপ্রতি উত্পাদনও বেশি হচ্ছে।
উত্পাদন খরচের তুলনায় এবার কিছুটা হলেও লাভের পাল্লা ভারী। ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার গাড়াগঞ্জের কৃষক মমিনউদ্দিন সবজি উত্পাদন খরচ প্রসঙ্গে বলেন, জমি তৈরি, কীটনাশক, সারসহ আমি এ বছর ২৮ শতক জমিতে লাউয়ের আবাদ করেছি। প্রথমদিকে প্রতিটি লাউ ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা দরে বিক্রি করলেও এখন তা বাজারে বিক্রি করছি ২৫ থেকে ৩০ টাকা। লাভ কম হলেও এটাই আমার কাছে অনেক।
হামিরহাটি গ্রামের সবজি চাষি রফিক মিয়া জানান, ৫০ কেজি শিম বাজারে বিক্রি করেছি ২৪ টাকা করে। এই দামে আমি খুশি। তবে সবজি সংরক্ষণের জন্য যদি কোনো ব্যবস্থা থাকত তাহলে কৃষক আরো বেশি লাভবান হতে পারত। নরসিংদীর কৃষক আশিকুর হোসেন বলেন, জমি তৈরি, সার, কীটনাশক ও জন (শ্রমিক) এর দাম বাদ দিয়ে এ বছর সবজিতে ভালই লাভ আসছে। কিন্তু সমস্যা হল এ বছর সবজিতে ভাল দাম পেয়ে আগামী বছর কৃষক বেশি করে সবজি আবাদ করলে দেখা যাবে এ দাম নেই। কৃষকের সমস্যাটা ওখানেই। মুন্সিগঞ্জের কৃষক আব্দুল বাতেন বলেন, সবজি চাষে এ বছর লাভ আসছে ভাল। তবে কৃষকের চেয়ে লাভবান হচ্ছে ফড়িয়ারা বেশি।
আধুনিক প্রযুক্তির সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠার কারণে শীত ও গ্রীষ্মকালীন সবজির উত্পাদন এক কোটি টন ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে শুধু শীতকালে সবজির উত্পাদন ৯০ লাখ টন ছাড়াবে। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতর (ডিএই) সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর ৪ লাখ ৭৫ হাজার হেক্টর জমিতে ৮৮ লাখ ৮৩ হাজার টন সবজি উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও গত অর্থবছরে শীত ও গ্রীষ্ম মৌসুম মিলে উত্পাদন হয় ১ কোটি ২৫ লাখ ৮০ হাজার টন। এর মধ্যে শীতকালেই ৪ লাখ ৭৩ হাজার হেক্টর জমিতে উত্পাদন হয়েছে ৮৮ লাখ ৩০ হাজার টন। এছাড়া গ্রীষ্মকালে ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে উত্পাদন ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টন। তবে চলতি অর্থবছরে গ্রীষ্মকালীন সবজি উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে ৩৭ লাখ ৮০ হাজার টন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বারোমাসি সবজি হিসেবে পরিচিত পেঁপে, কুমড়া, কলাজাতীয় সবজি হিসেবে নিলে এবারের উত্পাদন এক কোটি টন ছাড়াবে।
বেড়েছে সবজির রফতানি ও রফতানি আয়। বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ৪৫০টির বেশি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশে সবজি রফতানি করে বছরে আয় করছে ৬৫০ কোটি টাকা। সবজির একটা বড় অংশ প্রতি বছর নষ্ট হয় যা থেকে আসতে পারে আরো অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও হরটেক্স ফাউন্ডেশনের দু’টি গবেষণায় বলা হয়েছে, উত্পাদিত সবজির ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে সংগ্রহকারী, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে হাতবদলের সময়। যার আনুমানিক বাজারদর দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে সবচেয়ে কম নষ্ট হচ্ছে উত্পাদক পর্যায়ে। পাইকারী ব্যবসায়ীদের কাছে সবজি নষ্টের পরিমাণ প্রায় ৬০ শতাংশ। খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে নষ্ট হচ্ছে ২৫ শতাংশ।
ধান-আলু-পাট-দুধ নিয়ে কৃষক স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে। স্বপ্ন তাদের আবর্তিত হচ্ছে সবজিকে ঘিরে। ঝিনাইদহের সবজির হাট হিসেবে পরিচিত বারো বাজার, কালিগঞ্জ, হলিধানী, ডাকবাংলা, নগরবাথান, ভাটই, গাড়াগঞ্জ, চড়িয়ার বিল ও শেখপাড়ার কৃষকরা জানান, সবজির ভাল দাম পেয়ে তারা খুশি। কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীরা তাদের চেয়ে বেশি মুনাফা লুটে নিচ্ছে। যার কারণে শহরের ক্রেতাদের ২০ টাকার জিনিস কিনতে হচ্ছে ৫০ টাকা দিয়ে। কৃষকদের যদি এমন একটি বাজার থাকত যে বাজারের মূল্য নির্ধারণ করবে কৃষক, তাহলে ভোক্তা যেমন লাভবান হত, প্রকৃত মূল্যও পেত কৃষক।