ছাত্রলীগের তাণ্ডব, শিশু নিহত
শেখ মহিউদ্দিন আহাম্মদ ও আব্দুস সালাম সাগর
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:০০
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) ছাত্রলীগের সভাপতি শামছুদ্দিন আল আজাদ ও সাধারণ সম্পাদক রফিকুজ্জামান ইমন গ্রুপের মধ্যে আবারো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও গুলিবিদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী বয়রা গ্রামের মাদ্রাসা ছাত্র রাব্বি (১২) গুলিতে নিহত হয়েছে। রাব্বি নিহত হওয়ার ঘটনায় পার্শ্ববর্তী বয়রা গ্রামবাসী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। দফায় দফায় ছাত্রলীগের এ সংষর্ষে মোট তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। আহত হয়েছে কমপক্ষে অর্ধশত। চারদিন ধরে এ সংঘর্ষ চললেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনোরকম পূর্ব প্রস্তুতি নেয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংঘর্ষের সময় পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাকৃবি ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্তি ঘোষণা করেছে কেন্দ ীয় ছাত্রলীগ। ক্যাম্পাসের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার মধ্যে ছাত্রদের এবং আজ রবিবার সকাল ৮টার মধ্যে ছাত্রীদেরকে হল ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি বিলুপ্ত করার পাশাপাশি ছাত্রলীগের বাকৃবি শাখার সভাপতি শামছুদ্দিন আল আজাদ ও সাধারণ সম্পাদক রফিকুজ্জামান ইমনকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ক্যাম্পাসে যেকোন অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে।
রাতে ক্যাম্পাস থেকে শহরে যাওয়ার সময় আশরাফুল হক হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার ছুরিকাহত হন। তাকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
আধিপত্য বিস্তার, পূর্ব শত্রুতা, টেন্ডারবাজি, নিয়োগ বাণিজ্যে প্রশাসন ও ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের ভাগাভাগি নিয়ে এ সংঘর্ষ শুরু হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। টানা চারদিন ধরে চলমান সংঘর্ষে গতকাল ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ব্যাপক গোলাগুলি ও বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে ক্যাম্পাস পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। এসময় ৩ জন গুলিবিদ্ধ এবং অর্ধশত সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী আহত হন। গুলিবিদ্ধ পার্শ্ববর্তী এলাকার মাদ্রাসা ছাত্র রাব্বি বিকাল ৪টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যায়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫টি আবাসিক হলের বিভিন্ন রুমে অগ্নিসংযোগ করে এবং ২টি হল ভস্মীভূত হয়। এসময় হলগুলোতে ব্যাপক ভাংচুর চালিয়ে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, নগদ অর্থসহ মূল্যবান সামগ্রী লুট করে নিয়ে যায় এলাকাবাসী।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন ধরে বাকৃবিতে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের জের ধরে গতকাল দুপুর একটার দিকে ক্যাম্পাসের জব্বার মোড়ে তারা আবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। নেতা-কর্মীদের পুলিশ ও প্রশাসনের সামনে ব্যাপক গোলাগুলি, দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ও বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় ক্যাম্পাস। এসময় ৮ থেকে ১০ রাউন্ড গুলি ছোঁড়ার শব্দ পাওয়া গেছে। জব্বারের মোড়ের পাশে লন্ডন ব্রিজ এলাকায় দুইপক্ষের মধ্যে প্রকাশ্যে গোলাগুলির সময় ছাত্রলীগ নেতার ছোঁড়া গুলি মাথায় লেগে গুরুতর আহত হয় পথচারী শিশু রাব্বি। এ সময় শহীদ শামসুল হক হলের শিক্ষার্থী জয় বণিক গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকেন। আহতদের মধ্যে রয়েছেন সদ্য বিলুপ্ত বাকৃবি শাখা কেন্দ ীয় ছাত্রলীগের যুগ্ম-সম্পাদক শাহীন মাহমুদ, জাকারিয়া আলম, সাজ্জাদ, সুজয়, ইমরান, রিপন প্রমুখ।
বিকেল ৪টার দিকে গুরুত্বর অবস্থায় ওই শিশু রাব্বিকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করে। ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী বড়য়া এলাকার টেম্পো চালক দুলালের ছেলে রাব্বি। রাব্বির নিহতের খবরে এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঈশা খাঁ হল, শহীদ জামাল হোসেন হল, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং শহীদ শামসুল হক হলের বিভিন্ন রুমে অগ্নিসংযোগ করে।
বাকৃবি ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে ছাত্রলীগের কেন্দ কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। সেই সাথে বাকৃবি কমিটির সভাপতি শামছুদ্দিন আল আজাদ ও সাধারণ সম্পাদক রফিকুজ্জামান ইমনকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে বাকৃবি প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) নাছরীন সুলতানা জুয়েনা বলেন, ক্যাম্পাসের বর্তমান পরিস্থিতি খুবই খারাপ। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। রেজিস্ট্রার নজিবুর রহমান বলেন, ক্যাম্পাসের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ছাত্রদের গতকালই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার মধ্যে এবং রবিবার সকাল ৮টার মধ্যে ছাত্রীদেরকে হল ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
উপাচার্য অধ্যাপক মো. রফিকুল হক বলেন, এসব ঘটনা খুবই দুঃখজনক। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের আচরণ ও তাদের মধ্যকার সংঘর্ষ এবং ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী এলাকাবাসীর হামলার কারণেই বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টিকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা প্রদান বিষয়ে তিনি বলেন, এখন আমাদের প্রশাসনেরই নিরাপত্তা নেই। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তাদের হল ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ময়মনসিংহ পুলিশ সুপার গোলাম কিবরিয়া জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনায় ৪ জনকে আটক করা হয়েছে।