ড্যাপ পর্যালোচনা-১

বাড়িঘর নির্মাণ করা যাচ্ছে না ক্ষোভ বাড়ছে এলাকায়

রাজধানীর বিতর্কিত ডিটেইল্ড এরিয়া প্লানের (ড্যাপ) কারণে এর আওতাধীন এলাকার সাধারণ মানুষ অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়েছেন। তারা ওই এলাকায় বাড়িঘর তুলতে পারছেন না, পারছেন না জমিজমা বিক্রি করতে। থেমে আছে সব ধরনের ভূমি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। স্থানীয় অধিবাসী ও জনপ্রতিনিধিরা বলেছেন, ড্যাপ থেকে গণবিরোধী শর্তগুলো বাদ দিয়ে গণমুখী করা না হলে আগামী জাতীয় নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে। এলাকাবাসীর সমস্ত ক্ষোভ গিয়ে পড়ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উপর। ঢাকা ও আশপাশে ২৯ সংসদীয় এলাকায় এর প্রভাব পড়বে বলে জনপ্রতিনিধিরা ধারণা করছেন। ড্যাপ আওতাধীন এলাকার সরকারদলীয় এমপি, সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীরা বলছেন, ত্রুটিপূর্ণ ড্যাপের কারণে এসব এলাকায় রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে। ঢাকা-১৯ (সাভার) আসনের সংসদ সদস্য তালুকদার মো. তৌহিদ জং মুরাদ বলেন, ‘আমরা জনগণের প্রতিনিধি। জনগণকে নিয়েই আমাদের চলতে হয়। তাদের চাওয়া-পাওয়া এবং প্রয়োজনের নিরিখে ঢাকার জন্য বাস্তবসম্মত ড্যাপ প্রণয়ন করা না হলে এবং বর্তমান বিতর্কিত ড্যাপ বাতিল ঘোষণা না করা হলে সামনের নির্বাচনে আমাদেরকে তার খেসারত দিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের আমলে গেজেটের মাধ্যমে যে ড্যাপ প্রকাশ করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ অবাস্তব ও কয়েকজন তথাকথিত পরিবেশবাদীর হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যই প্রণীত হয়েছে। এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও এমনই অবাস্তব ও ভয়াবহ যে, এই প্রক্রিয়া শুরু হলে রাজধানী ঢাকায় মানুষের মধ্যে যে মারাত্মক ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটবে তা সামাল দেয়ার ক্ষমতা কোনো শক্তির নেই। নিকট অতীতে বর্তমান ড্যাপের বিরুদ্ধে জয়দেবপুরে জনবিস্ফোরণে আমরা তা দেখেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের কারণেই সেই জনবিস্ফোরণ বন্ধ করা সম্ভব হয়েছিল।’ নগর পরিকল্পনাবিদদের পাশাপাশি স্টেকহোল্ডার এবং রাজধানী ঢাকার জনগণের যারা নির্বাচিত প্রতিনিধি তাদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে একটি বাস্তবসম্মত ও যুগোপযোগী ড্যাপ প্রণয়নের দাবি জানান তিনি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে ও কোনো প্রকার হাইড্রলজিক্যাল সার্ভে না করে ড্যাপ প্রণয়ন করা হয়েছে। ফলে ড্যাপ প্রণয়নকারীরা সিএস, আরএস এবং এমএস ম্যাপে জরিপকৃত ভিটি জমি বা বাড়িঘরকে জলাশয় হিসেবে দেখিয়েছেন। এমনকি পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প, শিল্প-কারখানা, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, যেসব স্থানে ছয়-সাততলা ভবন তৈরি হয়েছে, সেসবের ওপর দিয়ে রাস্তা দেখানো হয়েছে। হাইড্রলজিক্যাল সার্ভে না করায় উপযুক্ত নিচু জায়গাও শনাক্ত করা হয়নি। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, কবরস্থান, কারখানা ইত্যাদি এলাকাকে জলাশয় (রিটেনশন পন্ড) হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে নতুন করে কেউ অবকাঠামো তুলতে গেলেই ড্যাপ বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রাজধানীর ডেমরা এলাকার সরকারদলীয় সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লা বলেন, ‘ড্যাপের কারণে সৃষ্ট সমস্যা নিয়ে এলাকার অনেকেই আসেন। আমি নিজেও রাজউককে বলেছি, এভাবে করলে অনেক লোক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা বাড়িঘর হারাবে। এই ড্যাপ থাকলে আমরাও সমস্যায় পড়ব। কাজেই ত্রুটিপূর্ণ ড্যাপের বাস্তবায়ন কেউ চায় না। আমিও ব্যক্তিগতভাবে এই ড্যাপের বিপক্ষে।’ ড্যাপ প্রণয়নকারীদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আপনারা সৌখিন পরিকল্পনা করবেন, যার যার এলাকায় গিয়ে করেন। ঢাকায় করবেন না। তারপরও যদি রাজউক এটা সংশোধন না করে তাহলে জনগণ রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াবে। গাজীপুর, সাভার, কেরানীগঞ্জ, টঙ্গী, ঢাকা ও আশপাশের এমপিদেরও আমার মতোই অভিমত। তারাও জনগণের সাথে থাকতে চান। আমাকেও জনগণের সাথেই থাকতে হবে।’ গত বছরের প্রথম দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ড্যাপের ত্রুটিগুলো সংশোধনের জন্য একটি রিভিউ কমিটি গঠন করে ড্যাপ সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই কমিটি একটি বৈঠক করার পর আর কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করেনি। সংশোধনীগুলো হওয়ার আগেই রাজউক ড্যাপ বাস্তবায়ন শুরু করে। ফলে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ তাদের নিজস্ব জমি প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারছেন না। এমনকি জরুরি প্রয়োজনেও জমি বিক্রি করতে পারছেন না। ফলে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এলাকার জনপ্রতিনিধি বা সংসদ সদস্যরা তাদের কোনো সদুত্তর বা সমাধান দিতে পারছেন না। ফলে তাদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বেঁধে উঠছে। যে কোনো মুহূর্তে এ ক্ষোভ থেকে বিস্ফোরণের সৃষ্টি হতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নগর বিশেষজ্ঞ একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে কেরানীগঞ্জকে ঢাকা সিটি করপোরেশনের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়। সে সময় কেরানীগঞ্জবাসীর মনে জেগে ওঠে উন্নয়নের স্বপ্ন। কিন্তু বর্তমান সরকার এসে কেরানীগঞ্জকে ড্যাপ এলাকায় অন্তর্ভুক্ত করার পর কেরানীগঞ্জবাসীর মধ্যে নেমে এসেছে চরম হতাশা। বিএনপি আমলে জেগে ওঠা সব আশা আওয়ামী লীগ আমলে গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হয়। কারণ তারা দেখতে পায়, ড্যাপের মাধ্যমে ওই এলাকার ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিকে জলাশয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আবার সরকারি জমিকে ব্যবহার উপযোগী (ওভার লে) হিসেবে সার্টিফিকেট দিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষি জমি, ভিটি জমিকে দেদারসে জলাশয় ও বন্যাপ্রবাহ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে দেয়া হয়েছে। স্ট্রাকচারাল প্লানকে অবজ্ঞা করে ড্যাপ প্রণয়ন করায় এমনটি হয়। আবার রিভিউ কমিটি ৫ লাখ স্থাপনা ভেঙে ফেলার পরামর্শ দেয়ায় জনগণ ক্ষুব্ধ। আর এই ক্ষোভ যাচ্ছে সরকার ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। সেই সুযোগে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হলে স্বার্থান্বেষী মহল এ থেকে ফায়দা লুটবে। কেরানীগঞ্জের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য নসরুল হামিদ বিপু সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের অনুরোধ সত্ত্বেও রাজউক ড্যাপের কার্যক্রম সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো কথা বলছে না। ড্যাপের কার্যক্রম বন্ধ, না চলমান কোনো কিছু বলছে না। আবার বাড়িঘর তৈরির জন্য নকশার অনুমোদন চাইলে অনুমোদন দেয়া হয় না। দিন দিন লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। এতে সরকারেরও বদনাম হচ্ছে। উন্নয়ন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থা চলতে পারে না। গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট আব্দুল মান্নান খান বলেন, পরিকল্পিত নগরী গড়তে ড্যাপের ত্রুটিগুলো সংশোধনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এজন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি শিগগিরই বৈঠকে বসে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ড্যাপ সংশোধন করা হবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঢাকা মহানগরীকে বাসোপযোগী করে গড়ে তুলতেই সরকার ড্যাপ প্রণয়ন করেছিল। এতে কিছু অসঙ্গতি আছে। বাস্তবতার নিরিখেই সেগুলো সংশোধন করা হবে। অনেক স্থানে জলাশয় বা নিচু জমিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। নির্মাণ হয়েছে শিল্প- কারখানা। এসবকে কেন্দ্র করে অনেক স্থাপনাও গড়ে উঠেছে। এসব ভেঙে দেয়া বাস্তবতার নিরিখে কতটা যৌক্তিক তা খতিয়ে দেখতেই এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রীকে রিভিউ কমিটির সভা ডাকার অনুরোধ করেছি। আগামী এক মাসের মধ্যেই এ বিষয়ে বৈঠক করে তারা প্রয়োজনীয় সুপারিশ জানাবেন। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।