বন্ধ হোক নারীর উপর পাশবিক আচরণ
রাবেয়া বেবী এবং মেহেদী হাসান
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫০
পৃথিবীর চারপাশে যেমন বায়ুমন্ডল থাকা নিশ্চিত একটি বিষয় তেমনি আমাদের সমাজে নারীর নির্যাতিত হওয়ার ঘটনাও নিশ্চিত একটি বিষয়। প্রতিনিয়ত নারী নির্যাতিত হচ্ছে, ঘরে-বাইরে-কর্মক্ষেত্রে। গত সপ্তাহে ইডেন কলেজের এক ছাত্রীকে এমনভাবে নির্যাতিত করা হলো যা পুরো দেশের মানুষকে আঘাত করেছে। এই ঘটনা নিয়ে এই প্রতিবেদনটি লিখেছেন— রাবেয়া বেবী এবং মেহেদী হাসান
সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া একটি ট্রাজেডির নাম শারমিন আক্তার আঁখি। আঁখি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে। ঘটনার সূত্রপাত চলতি মাসের ১৫ তারিখে। দিনটি ছিল মঙ্গলবার। কিন্তু আঁখি কিংবা আমাদের সমাজ কোনোটির জন্যই এটি মঙ্গলজনক ঘটনা তো নয়ই বরং লজ্জাস্কর একটি অধ্যায়। ওই মঙ্গলবারের সকালে আঁখিকে মনির উদ্দিন এবং তার এক সহযোগী মাসুম মিলে নির্মমভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। এরপর এসিড ছুঁড়ে ঝলসে দেয় আঁখির সারা শরীর। এতোকিছুর পরও শান্ত হয়নি মনির এবং মাসুম নামের পশু দুটি। এরপর আঁখিকে ফেলে রেখে যায় চানখাঁরপুল কাজী অফিসের সামনে। সেখান থেকে আঁখিকে উদ্ধার করে পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এখনো সেখানেই চিকিত্সার জন্য রাখা হয়েছে আঁখিকে। পুলিশ এবং আঁখির পরিবারের সূত্রে জানা গেছে, মনির আঁখিকে বিয়ে করতে চাইছিল এবং বার বার বিভিন্নভাবে প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। কিন্তু প্রতিবারই আঁখির জবাব ‘না’ হওয়াতে মনির তার সহযোগীকে নিয়ে এই নির্মম এবং পাশবিক ঘটনাটি ঘটায়। এদিকে আঁখির ভাইও সংবাদ মাধ্যমকে জানান, আঁখিকে মনির প্রতিনিয়ত উত্ত্যক্ত করত।
আঁখি ইডেন কলেজের বাংলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত ছিল। আর কয়েকটি মাস পার করলেই পড়াশুনার পাট চুকিয়ে কর্মজীবনে ঢুকতে পারত। আর এ সময়ই এমন নৃশংস ঘটনাটি ঘটালো ওই নরপশু দুটি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রকমের আলোচনা চলছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে কিছুদিন আগে ঘটে গেলো একটি নির্মম ঘটনা। ট্রেনে ধর্ষিত হওয়া ওই ছাত্রীর জীবনের নিরাপত্তা যেমন সমাজ এবং নিরাপত্তা বাহিনী নিশ্চিত করতে পারেনি তেমনি পারেনি আঁখির ক্ষেত্রে। আর এমন ঘটনা শুধু একজন আঁখির ক্ষেত্রেই যে ঘটছে তা নয়। প্রতিনিয়তই আমাদের গোচরে এবং অগোচরে ঘটে চলেছে নারীর উপর এহেন পশুসম আচরণ। ভারতে যখন ট্রেনে ধর্ষিত ওই মেডিক্যাল ছাত্রীর ধর্ষণকারীর বিচারের দাবিতে সে দেশের প্রতিটি মানুষ সোচ্চার ছিল সেই সময় আমরা দেখি আমাদের দেশের জেলা শহরে ধর্ষণ করে একই রকমভাবে একজন নারীকে ফেলে রেখে গেছে পশুরা। কিন্তু এই নিয়ে আমাদের দেশে তেমন করে উচ্চবাচ্য হয়নি। আর আঁখির ঘটনায়ও ইডেন কলেজের এবং বিশ্ববিদ্যালয়-স্কুল-কলেজ পর্যায়ের কিছু ছাত্র-ছাত্রী ব্যতীত কারো মাঝে কোনো ধরনের উদ্বেগ নেই! এই ধরনের ঘটনা আমাদের মানবিকতা এবং মনুষত্বের পঙ্গুত্বকে নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আমাদের ভাবা উচিত, আজকে আমাদের সমাজের একজনের উপর যে বিপদ এসেছে তা আগামীর কোনোদিনে আমাদের যে কারো উপরই এই বিপদ আসতে পারে। তাই সময় থাকতে সমাজের প্রতিটি স্তরের, প্রতিটি পেশার মানুষের মিলিতভাবে এগিয়ে আসা উচিত যাতে এই ধরনের ঘটনা রোধ করা যায়। আর সবার আগে প্রয়োজন তরুণ সমাজকে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা এবং জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করা। তা না হলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভয়ে এই ধরনের অপরাধ পুরোপুরি দূর করা যায় না। এর প্রমাণ মেলে উন্নত বিশ্বের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অনেক সুসজ্জিত এবং সোচ্চার হলেও এই ধরনের অপরাধ কমছে না। সুতরাং সবার আগে পরিবার থেকেই নারীদের প্রতি সম্মান দেখাতে শেখাতে হবে।
আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরেই নারীরা ঘরে-বাইরে বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কিন্তু এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। আমরা চাই আমাদের সমাজের কোনো নারীই আর নির্যাতনের শিকার হবে না। আমাদের সবার মা-বোন পুরুষের সমান মর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে জীবন-যাপন করবেন। এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে আমাদের সমাজে নীতি-নৈতিকতা ধীরে ধীরে শূন্যের কোটায় নেমে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে পড়াশুনা করতে আসা একজন ছাত্রীর মতামত কিংবা পছন্দের গুরুত্ব যে সমাজে নেই সেই সমাজে মানবিকতা বিলুপ্তপ্রায় বলতেই হয়! চিকিত্সকের চিকিত্সা হয়তো আঁখির শরীরকে সুস্থ করে তুলবে। কিন্তু তার মনের যে ক্ষত তা কী কোনোদিন সেরে উঠবে? সমাজে এবং মানুষের মনুষত্বে যে ক্ষতের সৃষ্টি হলো সেটি কী ভুলবার মতো কোনো সহজ-স্বাভাবিক ঘটনা?
এ্যাডভোকেট সালমা আলী
প্রধান নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি
এসিড কন্ট্রোল এ্যাক্ট এবং এসিড প্রিভেনশন এ্যাক্ট এই দুইটি আইনের আওতায় আমি নিজে বাদী হয়ে মামলা করি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি নির্দেশমালাও পাঠানো হয়। এই নির্দেশমালায় কে এসিড কিনবে, কেনো কিনবে সেই সব বিষয়ে একটি লাইসেন্স থাকার কথা আছে। আমাদের একটি টাস্কফোর্সও আছে। কিন্তু আমাদের কোনো মিটিং হয় না। আইন থাকলেই হবে না আইনের প্রয়োগ প্রয়োজন। যে কেসগুলো হয়, তাদের সবগুলোর বিচার কাজ শেষ হয় না। আইন, স্বরাষ্ট্র, নারী ও শিশু মন্ত্রণালয় মিলিতভাবে কাজ করে তাত্ক্ষণিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলে কিছু সুফল পাওয়া যেতে পারে। এই ঘটনার পরেই এসিড নিক্ষেপের মামলাগুলো কী অবস্থায় আছে তা জানতে চেয়ে একটি আবেদন করেছি। আমি মনে করি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাহায্য পাবো। তবে আমার বলার বিষয় হলো, প্রশাসনকে অবশ্যই আরো দায়িত্বশীলতার সাথে এই বিষয়গুলোকে বিবেচনায় আনতে হবে।