আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা না থাকায় পিছিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা
রেজাউল হক কৌশিক, রাঙ্গামাটি থেকে ফিরে
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:০৭
নতুন পরিচয় পেতে যাচ্ছে রাঙ্গামাটি। এতদিন শুধুমাত্র পর্যটনের জন্য বা কারো কারো কাছে অশান্ত অঞ্চল হিসাবে পরিচিত থাকলেও পার্বত্য এ জেলায় এখন গড়ে উঠছে অনেক শিল্প। ওই এলাকা জনশক্তি নিজস্ব উদ্যোগের ফলে এটা সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তারা এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। তবে প্রস্ততকরা পণ্যের মানোন্নয়ন ও বাজারজাতকরণে ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত সমস্যায় পড়ছে উদ্যোক্তারা। নতুন এসব উদ্যোক্তাদের পুঁজির অভাব দূর করার জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে রাঙ্গামাটি পরিচিত পাবে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
জানা গেছে, একসময় জুম চাষের মাধ্যমে খাদ্যপণ্য উত্পাদন এবং কোমর তাঁতের মাধ্যমে পোষাক বানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এ অঞ্চলের মানুষ। এছাড়া বাঁশ, বেত ও কাঠের আসবাবপত্রও তৈরি হতো সীমিত পরিমাণে। তবে এখন আদা, হলুদ ও মরিচসহ বিভিন্ন ধরণের মশলা, মৌসুমী ফল, হস্তশিল্প, মাশরুম বীজ, নার্সারী, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও পর্যটন ব্যবসার ক্ষেত্রে অনেকদূর এগিয়েছে। এছাড়া দেশিয় নৌকা ও বোট তৈরি, বেকারী, কৃষি যন্ত্রপাতি, পোলট্রি, ডেইরী ও মত্স্যচাষ, কাজু বাদাম প্রক্রিয়াজাতকরণ, বনৌষধি ও হারবাল সেন্টার, স’মিল এবং ড্রাইফিস স্থানীয় প্রজাতিসহ প্রভৃতি সম্ভাবনাময় খাত হিসাবে পরিচিত। এ এলাকার ভৌগলিক বাস্তবতা ও জনশক্তির দক্ষতা ও বৈচিত্র অনুসারে এসব সম্ভবনাকে কাজে লাগানো খুব কঠিন হবেনা বলে এ অঞ্চলের মানুষ মনে করে।
রাঙ্গামাটির বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, স্থানীয় উদ্যোক্তারা তাদের নিজস্ব প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তুলছে। আর তাদের তৈরি পণ্য স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে। এমনকি কিছু পণ্য বিদেশেও রফতানি হচ্ছে।
জানা গেছে, পার্বত্য এলাকার অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য স্বাধীনতার বছর পাঁচেক পরেই গঠন করা হয় ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন পরিষদ’। তবে পরবর্তীতে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের প্রতি বেশি গুরুত্বারোপ করায় অর্থনৈতিকভাবে এ এলাকা তেমন সমৃদ্ধ হতে পারেনি। এ এলাকার উদ্যোক্তাদের একত্রিত করতে এবং তাদেররে সমস্যা সমাধানে গতবছর পার্বত্য উন্নয়ন পরিষদ নামে একটি সংগঠন গড়ে উঠেছে। আর এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র শিল্পকে পৃষ্টপোষকতা করার জন্য সবচেয়ে বেশি এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই বিভাগ। এ বিভাগের উদ্যোগে সম্প্রতি রাঙ্গামাটি জিমনেশিয়াম কম্পাউন্ডে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল প্রথম পার্বত্য উদ্যোক্তা মেলা। মেলায় স্থানীয় ১০৩টি প্রতিষ্ঠান তাদের উত্পাদিত পণ্যের পসরা সাজিয়েছিল। সমাপনী অনুষ্ঠানে আয়োজকরা জানান, আটদিনে মেলায় প্রায় ২ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছে। এতে ২২টি ব্যাংক ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল। সমাপনী অনুষ্ঠানে তাত্ক্ষনিকভাবে এসএমই উদ্যোক্তাদের মধ্যে ৫ কোটি টাকার ঋণ বিতরন করে বেশ কয়েকটি ব্যাংক।
আধুনিক বিপনণ ব্যবস্থা জোরদার না হওয়ায় পার্বত্য এলাকার উত্পাদিত অনেক পণ্যের প্রসার ঘটানো সম্ভব হচ্ছে না বলে উদ্যোক্তারা জানান।
এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র শিল্প বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার বলেন, সময় মতো উদ্যোগ নিলে সম্ভাবনাময় এ এলাকা অনেক এগিয়ে যেত। বিশেষ উদ্যোগ নিলে এ এলাকার চিত্র পাল্টে দেয়া সম্ভব। এ লক্ষ্যে ব্যাংকগুলোকে উদ্যোক্তাদের জন্য বিষেশ ঋণপণ্য নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
রাঙ্গামাটি অঞ্চলের বেকার যুবকদের উদ্যোক্ত হয়ে উঠার কথা বলতে যেয়ে রাঙ্গামাটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব চাকমা বলেন, যেসব উদ্যোগ নিতে টাকা লাগেনা এমন কিছু কাজ খুজে বের করলাম। এসব কাজের মধ্যে প্রথম দিকে ছিল নারিকেলের শলা সংগ্রহ। এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমানে নারিকেল গাছ আছে। কার কয়টি গাছ আছে তা হিসাব করার জন্য কয়েকজন ছেলেকে ঠিক করলাম। যারা মোটসাইকেল চালিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করল। এরপর এজন্য গাছের মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিনা পয়সায় পরিস্কার করে দেয়ার দায়িত্ব নিলাম এবং নারকেলের শলাগুলো আমাদের দিয়ে দেবার প্রস্তাব করলাম। তারা রাজি হলে বেশ কয়েকজন শ্রমিক নিয়ে আমরা এ কাজ শুরু করলাম। পরবর্তীতে এসব শলা দিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করলাম।
পাবর্ত্য অঞ্চলের উন্নয়নের স্বার্থে আলাদা ঋণ নীতিমালা ও একটি উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার দাবী জানান বিপ্লব চাকমা। এছাড়া উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ দেয়ারও দাবী জানান তিনি।