বেপরোয়া ছাত্রলীগ

দেশের ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের একশ্রেণির নেতা-কর্মীর উচ্ছৃঙ্খলতা যেন থামছেই না। কিছু নেতা-কর্মীর কর্মকাণ্ডে দেশের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অস্থির। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, অন্তর্দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখল-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ারও অভিযোগ উঠেছে অনেক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে। বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা চার শতাধিকবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। যার বেশিরভাগই ঘটেছে নিজেদের মধ্যে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, অনেক জায়গায় এ সংগঠনের কমিটি বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছে। ছাত্রলীগের সংঘর্ষের কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অচল হয়ে যাওয়ায় আওয়ামী লীগের অনেক সিনিয়র নেতাও বিরক্ত। গত শনিবার বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) ছাত্রলীগের সভাপতি শামছুদ্দিন আল আজাদ ও সাধারণ সম্পাদক রফিকুজ্জামান ইমন গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে শিশু রাব্বি (১২) নিহত হবার পর ছাত্রলীগ আবারো আলোচনায় এসেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাকৃবি ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। নামপ্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একজন সিনিয়র নেতা ইত্তেফাককে বলেন, ছাত্রলীগের এ পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চলতে থাকলেও তা নিয়ে কেন্দ মাথা ঘামায়নি। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়ার দিকে নজর না দিয়ে তারা সকাল-বিকাল গণভবনে গিয়ে বসে থাকছেন। এটি বিভিন্ন জায়গায় ভুল বার্তা পাঠাচ্ছে। এ অবস্থায় ছাত্রলীগে শৃংখলা আনা কষ্টসাধ্য হবে বলেও মনে করেন তিনি। দলের অপর একজন নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র রাজনীতি বর্তমান ছাত্র রাজনীতির কারণে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ছাত্রলীগের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বর্তমান ছাত্রনেতারা পড়েন না বলেই তারা এ ধরনের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন। এদিকে, রাজনীতি বিশ্লেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর ইমতিয়াজ হোসেন বলেন, শিক্ষাঙ্গনে যে অবস্থা চলছে, তার জন্য ছাত্রলীগকে দায়ী না করে তাদেরকে আইন শৃংখলা ভঙ্গকারী হিসাবে দেখতে হবে। সংঘর্ষের যে ঘটনাগুলো এতদিন ঘটে আসছে, সেগুলোর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতি এমন হতো না। তিনি বলেন, অনেক জায়গায় নানা উপদলের কারণে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। আর দলের মধ্যে কোন্দল থাকলে ছাত্র সংগঠনের মধ্যেও কোন্দল থাকবে। ডক্টর ইমতিয়াজের মতে, দলীয় রাজনীতিতে কোন্দল থাকলে ছাত্র রাজনীতিতেও তা ছড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিককালে যেসব ঘটনা ঘটছে, তা তারই বহিঃপ্রকাশ। এক সময় ছাত্রদের অধিকার আদায়ের জন্য ছাত্র সংগঠনগুলো লড়াই করলেও এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন কোন কোন জেলা কমিটিতে নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য মোটা অংকের চাঁদা দিতে হয়। টেন্ডারবাজি এবং চাঁদাবজি অনেক নেতা-কর্মীর প্রধান কাজ। এর কারণ হিসাবে আওয়ামী লীগের একজন সিনিয়র নেতা বলেন, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে চাকরির বাজার সীমিত। এখানে চাকরি পেতে হলে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়। যেসব ছাত্র মেধাবী তারাও চাকরি পায় না। সেক্ষেত্রে অনেকে রাজনীতিকে বেছে নেয় এবং আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালায়। এ ব্যাপারে ছাত্রলীগের সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, সমাজ ব্যবস্থায় যে নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে, ছাত্রলীগ তার বাইরে নয়। তবে এখানে যারা সংগঠনে শৃংখলা বিরোধী কর্মকাণ্ড ও গঠনতন্ত্র লংঘন করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। যারা আইন ভঙ্গ করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বলা হয়েছে। ছাত্রলীগ সভাপতি জানান,বর্তমানে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট সাংগঠনিক জেলার সংখ্যা ৯৭টি। কিছু কমিটি ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। অধিকাংশ কমিটিই মেয়াদ উত্তীর্ণ। অনেক থানা কমিটিতে ১০ বছর ধরে কাউন্সিল হয় না। মেয়াদপূর্তির পরও আগের কমিটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়নি। যারা কমিটিতে আছে তাদের অনেকেই এখন আর ছাত্র নেই। তিনি জানান, মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটিগুলোর তালিকা করা হচ্ছে। সেখানে প্রকৃত ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। যত নেতিবাচক কর্মকাণ্ড গত ১৭ জানুয়ারি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে উভয়পক্ষের ৪০ নেতা-কর্মী আহত হয়। গত বৃহস্পতিবার ছাত্রদল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মিছিল বের করলে এ সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা শিক্ষকদের ডরমিটরিতে আশ্রয় নিলে ছাত্রলীগ এতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর করে। পুলিশের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া অস্ত্র দিয়ে ছাত্রদল কর্মীদের ওপর গুলি চালায় ছাত্রলীগ কর্মীরা। এ ঘটনায় ছাত্রদল সভাপতি ওমর ফারুকসহ ৯ নেতা-কর্মীকে আটক করে পুলিশ। একটি গ্রুপ সমাবেশ শেষে মেইন গেট দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার সময় ইবি শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসাইনের নেতৃত্বে নেতা-কর্মীরা ছাত্রদলকে ধাওয়া করে। এ ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। একটিতে ছাত্রদলের ১০৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। গত ১৫ জানুয়ারি বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক (মুসলিম) ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে দু’দফা সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়। এ সময় ছাত্রাবাসের কয়েকটি কক্ষ ভাংচুর করা হয়। আহত পাঁচজন শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া দু’গ্রুপই ছাত্রলীগের সমর্থক। এর একটি গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করেন ছাত্রলীগ নেতা ও মেয়াদ উত্তীর্ণ ছাত্র কর্মপরিষদের ক্রীড়া সম্পাদক ফয়সাল আহম্মেদ মুন্না এবং অন্যটি নিয়ন্ত্রণ করে ছাত্র মিলনায়তন সম্পাদক জুবায়ের আলম। গত ১২ জানুয়ারি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর ফের হামলা চালান ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এ হামলায় ৩০ শিক্ষক আহত হন। তবে হামলার ঘটনা অস্বীকার করেছেন ছাত্রলীগ নেতারা। এর আগে গত ১৯ নভেম্বর শিক্ষকদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। গত ১২ জানুয়ারি সিরাজগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মধ্যে দফায়-দফায় সংঘর্ষে কমপক্ষে অর্ধশত ছাত্র ও ওসি আহত হন। আহতদের বেশির ভাগই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। গত ১০ জানুয়ারি রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর এসিড নিক্ষেপ ও মারধরের ঘটনায় ২০ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে এসিডে আহত দুই শিক্ষককে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভাংচুর করা হয় দুর্নীতিবিরোধী মঞ্চ। ছাত্রলীগের নামে শ্লোগান দিতে-দিতে মুখোশধারীরা ওই হামলা করে এবং পরে একই মঞ্চে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালন করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। গত ৬ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হরতাল সমর্থক সন্দেহে চার ফটোসাংবাদিককে মারধর করেছেন ছাত্রলীগ কর্মীরা। পরিচয়পত্র দেখিয়েও সাংবাদিকরা রেহাই পাননি। পুলিশ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো সাংবাদিকদেরই আটক করে থানায় নিয়ে আসে। পলাশী মোড়ে এ ঘটনা ঘটে। মারধরের শিকার সাংবাদিকরা হলেন রয়টার্সের এন্ড্রু বিরাজ, প্রথম আলোর হাসান রাজা, নিউ এজের সনি রামানি ও বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের হারুন-অর-রশিদ রুবেল। ক্লাস শিট সরবরাহ নিয়ে গত ৬ জানুয়ারি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের যুগ্মআহ্বায়ক নাজমুল হক ও দেবাশীষ দাশের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে ৬ জন আহত হন। গত ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মিছিল, সমাবেশে যোগদান নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে হামলা, ছুরিকাঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে সিলেটে তিন নেতা-কর্মী ছুরিকাহত, চট্টগ্রামের দক্ষিণ জেলা আহ্বায়ক আহত এবং পটুয়াখালীর বাউফলে সংঘর্ষে ৪ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া পঞ্চগড়েও সংঘর্ষ হয়েছে। সিলেটে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলে যোগ দিতে আসার পথে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে সংগঠনের তিন নেতা-কর্মী ছুরিকাহত হন।