আদিবাসীদের উপর নির্যাতন বেড়েছে

২০১২ সালে আদিবাসীদের মানবাধি-কার লঙ্ঘন ও তাদের উপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছে। রাষ্ট্রীয় এবং রাষ্ট্রের বাইরের কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এটা হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণ, নারী ও শিশুদের উপর যৌন নিপীড়ন, হত্যা-নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, ভূমি দখল, অবৈধ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি, ধর্মীয় এবং লৈঙ্গিক বৈষম্য বেশি হয়েছে। অন্যদিকে আদিবাসীদের মানবাধিকার রক্ষায় সরকার সদিচ্ছা প্রকাশ করলেও কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বাংলাদেশের আদিবাসীদের মান-বাধিকার প্রতিবেদন ২০১২-এ এই তথ্য দেয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘কাপেং ফাউন্ডেশন’ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। অক্সফামের সহযোগিতায় প্রতিবেদনটি তৈরি করেন আশা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ডালিম চন্দ বর্মন। প্রতিবেদন প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন অক্সফামের বাংলাদেশ প্রতিনিধি গেরিথ প্রাইজ-জনস, আইন ও শালিশ কেন্দে র চেয়ারপার্সন হামিদা হোসেইন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য নিরুপা দেওয়ান ও বাংলাদেশ ইন্ডিজিনিয়াস পিউপলস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিব দ্রং। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ‘কাপেং ফাউন্ডেশনে’র চেয়ারম্যান রবীন্দ নাথ সরেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালের তুলনায় ২০১২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের মানবাধিকার লঙ্ঘন তুলনামূলক বেশি হয়েছে। এ বছর সাতজন নারীসহ ১৬ জনকে হত্যা ও ২৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৫০ জন। প্রায় ৩০০ ঘরবাড়ি ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে পাবর্ত্য অঞ্চলে চারটি ও সমতলে পাঁচটি। এছাড়া ১৬৫ জন পাহাড়ি ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। প্রতিবেদনে আদিবাসী নারীদের অবস্থা, ভূমি অধিকার ও ভূমি হারানো, শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, ২০১২ সালে ৭৫ জন আদিবাসী নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্ম নারীদের উপর অধিকাংশ নির্যাতন সেটেলার বাঙালি এবং আইন-শৃংখলা বাহিনীর দ্বারা হয়েছে। কিছু বিষয়ে মামলা হয়েছে। কয়েকজনকে গ্রফতারও করা হয়েছে। কিন্তু কাউকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হয়নি। অন্যদিকে নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিলেও সরকার এখনও ভূমি কমিশন গঠন করতে পারেনি। শান্তি চুক্তির পুরোটা বস্তবায়নের অঙ্গিকার করা হলেও তা করা হয়নি। প্রতিবেদনে ছয়টি সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলো হল: শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন ও ভূমি সমস্যার সমাধান করা, আদিবাসীদের ভূমি হারানো প্রক্রিয়া বন্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের ভূমি ফিরিয়ে দিতে আলাদা ভূমি কমিশন গঠন, নারীদের উপর নির্যাতন বন্ধ করতে বিভাগীয় তদন্ত শেষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নিয়মিত তদন্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ। ধর্মান্তরিত করার অভিযোগ এদিকে ড. মিজানুর রহমান তার বক্তৃতায় অভিযোগ করেন, বর্তমান সময়ে পার্বত্য এলাকায় বিশেষ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। মিশনের স্কুলের নামে ধোঁকা দিয়ে শিশুদের এনে মাদ্রাসায় ভর্তি করা হচ্ছে। তাদের ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। ঢাকার মোহাম্মদপুর, মিরপুর, যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন মাদ্রাসায় এমন ঘটনা ঘটছে। আশংকা করা হচ্ছে ভবিষ্যতে তাদের রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হবে। সম্প্রতি এমন দু’জন শিশুকে উদ্ধার করে তাদের বাবা-মায়ের কাছে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে যে অবস্থা তাতে করে এখনই যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে বিচার বিভাগ থেকে মানুষের আস্থা একেবারেই চলে যাবে।