ড্যাপ পর্যালোচনা-৩

নামসর্বস্ব গণশুনানি ও জনমত গ্রহণশেষে আপত্তি নিষ্পত্তি

নগরবিদরা ড্যাপ প্রণয়নের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, টিআই সংশোধন না করে, ডিএমডিপির সুপারিশ ও নগর বিশেষজ্ঞদের মতামত ছাড়া সেনা সমর্থিত সরকারের আমলে খসড়া ড্যাপের গেজেট প্রকাশ করা হয়। যে গেজেটে কিছু পরিবেশবিদের সুপারিশ ও সংশোধনী রয়েছে। ঢাকার জনসংখ্যার বৃহত্ অংশ এ সম্পর্কে অবগতই নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ড্যাপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকা ও এর আশপাশের ২ হাজার ৭২৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠান অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করছে রাজউক। এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরকারি প্রকল্প হিসেবে রয়েছে কেরানীগঞ্জের সোনাকপান্দার বিসিক শিল্পনগরী। বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে টঙ্গী, গাজীপুর, তারাব, রূপগঞ্জ ও কালীগঞ্জের ১৫২টি প্রকল্প। যার মধ্যে ৫১টি হালকা শিল্প। এছাড়া আছে ৭৯টি সাধারণ, ১৮টি ভারি ও ৪টি ডাইং, চামড়া, সার, রাসায়নিক, লবণ ও পেট্রোলিয়াম দ্রব্য উত্পাদনের শিল্প প্রতিষ্ঠািন। নারায়ণগঞ্জে সদর, বন্দর, কদমরসুল, সোনারগাঁ ও ডিএনডি এলাকার ২ হাজার ১৩৫টি, ঢাকা, সাভার, গাজীপুর আমিনবা্জারের ৩১১টি, কেরানীগঞ্জের ৬১টি, সাভার ও আশুলিয়ায় ৬৫টি। ১৯৯৫ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান্ট (ডিএমডিপি) প্রণয়নের সময় ড্যাপ প্রস্তুত ও কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিদেশি উপদেষ্টারা কাজটি না করে শুধু ডিএমডিপির কৌশলগত পরিকল্পনা ‘স্ট্রাকচারাল প্ল্যান’ ও অন্তর্বর্তী পরিকল্পনা ‘আরবান এরিয়া প্ল্যান’ প্রণয়ন করে। অথচ ড্যাপ প্রণয়নই ছিল প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য। প্ল্যান দুটিকে ১৯৯৭ সালে নগর উন্নয়ন আইনের আওতায় ‘মাস্টারপ্ল্যান’ হিসেবে গেজেট করা হয়। পরে রাজউকের নিজস্ব অর্থায়নে ড্যাপ প্রণয়নের কাজ শুরু হয়। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রকল্পটির সারপত্র অনুমোদন নিয়ে চলে যায় পাঁচ বছর। ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে ছয়টি এলাকাকে ভাগ করে ড্যাপ প্রণয়নের জন্য রাজউক উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে। কিন্তু তারা সবাই কাজের টার্মস অব রেফারেন্স অনুসারে ড্যাপ প্রণয়নে ব্যর্থ হয়। প্রকল্পের সারপত্র অনুমোদন লাভে নতুন করে টার্মস প্রস্তুত করে চারটি উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠানকে ৫৯০ বর্গমাইল এলাকা পাঁচটি গ্রুপে ভাগ করে ড্যাপ প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু এখানেও ঝামেলা বাধে। কারণ ডিএমডিপির নির্দেশনা অনুযায়ী ২৬টি বিশেষ এলাকার জন্য আলাদাভাবে ড্যাপ প্রণীত না হওয়ার কথা। তাছাড়া ২০০৫ সালের মধ্যেই ড্যাপ প্রস্তুত সম্পন্ন করে তা কার্যকর করার কথা। কিন্তু নিয়োজিত উপদেষ্টাদের ড্যাপ প্রণয়নে অনভিজ্ঞতা, কয়েক দফায় প্রকল্প পরিচালক বদল, জোট সরকারের স্বার্থান্বেষী মহল কর্তৃক রাজউক ও উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রভাবিত করা এবং এ নিয়ে পরিবেশবিদদের আপত্তির মুখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ড্যাপ প্রণয়ন সম্পন্ন হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে জোড়াতালি দেয়া একটি খসড়া ড্যাপ তৈরি করা হয়। পরে নামসর্বস্ব গণশুনানি ও জনমত গ্রহণ শেষে প্রাপ্ত আপত্তি নিষ্পত্তি হয়। ফলে বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন ওই ড্যাপে পড়েনি। ওই ড্যাপের ওপর ভিত্তি করেই গঠিত হয় একটি রিভিউ কমিটি। তাদের ইচ্ছামতো ড্যাপ পর্যালোচনা করে ২০০৯ সালের এপ্রিলে তারা সুপারিশ প্রদান করে। তারা নগরীকে পরিবেশ বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার নামে ড্যাপে কিছু সংশোধনী আনে। আইনের বিধান, ডিএমডিপির সুপারিশ ও নগর বিশেষজ্ঞ-পরিবেশবিদদের মতামতের আলোকে ড্যাপ প্রণীত হয়েছে কি না, এ নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। দেশে জরুরি অবস্থা থাকাকালে ‘মেট্রো ঢাকা’র সীমিত কয়েকটি স্থানে খসড়া ড্যাপের নকশা টাঙিয়ে শুনানি ও জনসাধারণের মতামত গ্রহণ করা হয়। খসড়া ড্যাপের ওপর মাত্র ১০ হাজারের মতো আপত্তি বা অভিযোগ পাওয়া যায়, যা দেড় কোটি ঢাকাবাসীর জন্য খুবই নগণ্য। অর্থাত্ সংখ্যাগরিষ্ঠ নগরবাসী ওই ড্যাপ সম্পর্কে অবহিত ছিল না। টিআই অ্যাক্ট-১৯৫৩-এর ৭৩ ধারায় কর্তৃপক্ষকে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের ক্ষমতা দেয়া হয়। সে হিসেবে ১৯৫৯ সালে প্রণীত পরিকল্পনাকে ‘ঢাকা মাস্টারপ্ল্যান’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আর ১৯৯৫ সালে প্রণীত পরিকল্পনার নাম ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান’ (ডিএমডিপি), যার আওতায় রয়েছে স্ট্রাকচারাল প্ল্যান, আরবান এরিয়া প্ল্যান ও ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান নামে তিন স্তরবিশিষ্ট সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটি পরিকল্পনা প্যাকেজ। স্ট্রাকচারাল প্ল্যানটি একটি দীর্ঘমেয়াদি স্ট্র্যাটেজি পলিসি প্ল্যান এবং আরবান এরিয়া প্ল্যানটি ইনটেরিম প্ল্যান। ডিএমডিপির মাধ্যমে মেট্রো ঢাকার পরিকল্পিত বিন্যাস, উন্নয়ন ও বিকাশ ঘটার কথা। কিন্তু টিআই অ্যাক্টের কোনো ধারায় এ ধরনের পরিকল্পনার নাম, সংজ্ঞা বা বর্ণনা নেই এবং কিভাবে তা বাস্তবায়িত হবে, এরও কিছু উল্লেখ নেই। ডিএমডিপি প্রতিবেদনেও মাস্টারপ্ল্যান বলে কিছু উল্লেখ নেই। তথাপি ওই নতুন ধরনের পরিকল্পনাটিকে মাস্টারপ্ল্যান হিসেবে অনুমোদন করিয়ে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এদিকে ‘মেট্রো ঢাকা’ এলাকায় রয়েছে ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৯০টি ওয়ার্ড, টঙ্গী, পৌরসভা, গাজীপুর পৌরসভা ও গাজীপুর উপজেলার অংশবিশেষ, কালীগঞ্জ ও রূপগঞ্জ উপজেলার অংশবিশেষ, তারাব পৌরসভা, নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা, বন্দর উপজেলার অংশবিশেষ, কদমরসুল পৌরসভা, ডিএনডি বাঁধের ভেতরের এলাকা, কেরানগীঞ্জ উপজেলার অংশবিশেষ, সাভার পৌরসভা ও ইপিজেড এলাকা এবং তুরাগ নদের অববাহিকা। এর মধ্যবর্তী বিভিন্ন স্থানে রয়েছে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট, সাভার ক্যান্টনমেন্ট, বিডিআর ও অনুরূপ স্বশাসিত আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জায়গাসহ ২৬টি ইউনিয়ন পরিষদের বিস্তীর্ণ গ্রামীণ জনপদ ও তাদের কৃষিজমি। রাজধানীর চৌহদ্দিতে বাসস্থান হয়েও এসব এলাকার লোকজন মাস্টারপ্ল্যান বা ড্যাপ কী, তা জানে না। অথচ তাদের জমির ওপর ড্যাপের উপদেষ্টারা অনেক ধরনের প্রস্তাব করে বসে আছেন।