একজন মা ও তার কাঁথাগুলো

শীতের আদর, সকালের কাঁচা রোদের স্নেহ, মায়ের হাতের পিঠা-এ কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মনটা কেমন যেন অস্থির হয়ে ওঠে জাহিদের। মা। ওফ! কত দিন ধরে তোমার স্নেহমাখা মুখখানি দেখিনি। মাঝে মাঝে মনটা খুবই উতলা হয়ে ওঠে। কিন্তু কিছুই তো করার নেই। সেদিন বিদায় নেই যখন, তখন অনেক রাত। চারদিকে নিঝুম। মা তুমি আমার মাথায় হাত রেখে বললে জাহিদ, তোমরা ট্রেনিং শেষ করে দেশে ফিরে আসবে যুদ্ধ করে দেশটা স্বাধীন করবে, এবং রাজ্য বিজয় করা একজন সৈনিকের মতো বীর বেশে আমার সামনে এসে দাঁড়াবে। তখন গর্বে আমার বুকটা ভরে যাবে। আরো অনেক কিছু বলতে চেয়েছিলো—পারেনি। আপনিতেই নীরব হয়ে গেলো। আমিও ঘর থেকে বেরিয়ে আঁধারে হারিয়ে গেলাম। তোমাকে একটি কথা বলেও সান্ত্বনা দিয়ে আসতে পারিনি। মনে হলে বুকটা ফেটে যেতে চায়। ইদানিং খুবই অস্থির লাগছে। কখন মায়ের বুকে ফিরে যাব। ফাতেমার এদিকে ছেলের চিন্তা অন্যদিকে দেশের চিন্তা। আগে একটা ধারণা ছিল পাক সেনারা কেবল বড় বড় শহর গুলোতেই অবস্থান করবে কিন্তু তা আর থাকল কই? ওরা প্রতিটি থানাতেই ক্যাম্প করে ফেলেছে। এখন ধাবিত হচ্ছে গ্রামের বড় বড় হাট-বাজারের দিকে। ওরা কাওরাইদ রেলওয়ে স্টেশনে স্থায়ীভাবে ক্যাম্প করেছে। তাদেরকে সহযোগিতা দিতে আশেপাশের গ্রামের কিছু সংখ্যক লোক নাকি রাজাকার ও আল বদর বাহিনীতে ভর্তি হয়েছে। কথাগুলো শুনে ফাতেমার বুকটা শুকিয়ে কাঠ হয় আসে। বড় ধরনের সর্বনাশ হয়ে যাবে। ওরা এলাকার অনেক মানুষই মেরে ফেলবে। যারা আন্দোলনে ছিল। ওরা সবাইকেইতো চেনে। ফাঁদ পেতে ধরবে। আর ক্যাম্পে নিয়ে যাবে। হঠাত্ শোনা গেল কাসেম আলি রাজাকার বাহিনীতে যোগদান করেছে। কাশেম আলি জাহিদের বন্ধু। পাশাপাশি বাড়ি। দুই পরিবারের মধ্যে ভাল সম্পর্ক। ফাতেমা নিজ ছেলেকে যে চোখে দেখেন। কাশেম আলিকেও সেই ভাবে দেখেন। কাশেম আলির ওপর এখনো তার অগাধ বিশ্বাস। সামনে যে কোনো ধরনের বিপদ আসলে তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে। বলতে গেলে ছায়া হয়ে তাকে পাশে থাকবে। ভাবনাটা তাঁর মনে এক প্রকার শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। কাশেম আলি রাজাকার বাহিনীতে যোগদান করেছে তা প্রায় বিশ দিন হতে চলল। এর মধ্যে একদিনও বাড়ি আসেনি। এমন কি কোনো রকম যোগাযোগও রক্ষা করেনি সে। ব্যাপারটা পাড়ার অনেকের মনেই সন্দেহ জাগিয়ে তোলে। কেউ বলছে ও লজ্জা পাবে তাই বাড়িতে আসেনি। কেউ বলছে ও নাকি ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। দিন শেষে সূর্য ডুবে। চারদিকে আঁধার ঘনিয়ে আসে। লোকজন নিজ নিজ ঘরে ফিরে আসে। অমনি কাওরাইদ ক্যাম্পে চলে ফাঁকা গুলি। পাঁচ থেকে দশ মিনিট একটানা গুলি। শব্দে আশেপাশের কয়েক গ্রামের মাটি থরথর করে কাঁপতে থাকে। লোকজন আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়ে। গ্রামগুলোকে ঠিক যমপুরির মতো মনে হয়। রাতে কেউ ঘর থেকে বের হয় না। সারা রাতের মাঝে কোনো একটি পাখির ডাকের শব্দ পর্যন্ত শোনা যায় না। চারদিকে কেমন একটা শূন্যতা। কেমন একটা হাহাকার কখন না জানি ভয়াবহ একটা কিছু ঘটে যায়। চলে যায় হাজারটা প্রাণ। যদিও চারদিকে মৃত্যু-আতঙ্ক। কখন কাকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায়। কখন তাকে গুলি করে হত্যা করে। কখন কার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে যায়। নিরাপদ বলতে কিছু নেই। পাখির দাম আছে কিন্তু মানুষটার কোনো দাম নেই। এমন জটিল সময়েও ফাতেমা দৃঢ় মনোবল নিয়ে বিদ্যি স্বাভাবিকভাবে সংসারের কাজ কাম করে যাচ্ছে। তার ভেতরে ভয়ডর নামক কোনো শব্দ নেই। ছেলেটার নাম পাখি। কেউ বলে পঙ্ক্ষি। ঠিক পাখির মতোই যেন উড়াল দিতে জানে। তার দৌড়। ঠিক পাখির উড়ালের মতোই দ্রুত। পাখির একটি হাত নেই। তার বয়স দশ থেকে এগারো। তার মাঝে সারাক্ষণই একটা ভাবনা। দেশটা কখন? কবে স্বাধীন হবে। পাকসেনা ও রাজাকাররা দেশ ছেড়ে পালাবে। ওরা তো দেশটাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে যাচ্ছে। এলাকার মানুষ বলতে গেলে একরকম বন্দি হয়ে আছে। কবে এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাবে তা জানারও কোনো সুযোগ নেই। ভাবতে গেলে মনটা আরো খারাপ হয়ে যায়। বিকেল। ফাতেমা খোলা জানালার পাশে চুপচাপ বসে আছেন। পাখি তাকে দূর থেকে দেখেই এক দৌড়ে চলে আসে। ছোটমা একটা ভালো খবর আছে। পাখি। বল, ভালো খরটা কি? জাহিদ ভাই এসে গেছে। আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি। পুরো মুখটা দাড়ি গোঁফে একাকার হয়ে আছে। যেন ওসবের চাষ করেছে। আমি তাকে চিনতেই পারিনি। আমাকে দেখেই দূর থেকে উচ্চ গলায় ডেকে ওঠে, পাখি এদিকে আয়। আমি দৌড়ে তার কাছে গিয়ে অবাক হয়ে যাই। তার কাঁধে স্টেনগান। একজন মুক্তিযোদ্ধা। মানে একজন বীর পুরুষ। জাহিদ ভাই, একা নয়। তার সঙ্গে পনেরো বিশজন। সবাই মুক্তিযোদ্ধা। আনন্দে আমার বুকটা ভরে যায়। ফাতেমা গভীর আগ্রহে বললেন, এসব কি সত্যি বলছিস পাখি? ছোটমা। আমি কোনোদিন কখনো আপনার সঙ্গে মিথ্যে কথা বলেছি। এই চোখ ছুঁয়ে দিব্যি করে বলছি। মুহূর্তেই ফাতেমার দু’চোখ পানিতে ভরে ওঠে। আঁচলে চোখ মুছে নিয়ে বললেন, তুই কোথায় তাদের দেখা পেলি? নদীর ওই পাড়ে একটা গ্রাম আছে না। তার পরের গ্রামে একটা বড় জঙ্গল আছে না। ওদিকে যাচ্ছিলাম। হঠাত্ জাহিদ ভাইয়ের গলা। আমি সেখানে যেতেই জঙ্গল থেকে এক এক করে সবাই বেরিয়ে এল। তখন আমার মনে সেকি আনন্দ। জাহিদ আরো কিছু বলেছে? একটি খুবই গোপন কথা বলেছে। তাড়াতাড়ি বল। চারদিকে কেমন কনকনে শীত। ওরা শীতে খুবই কষ্ট পাচ্ছে। পনেরো বিশটা কাঁথা যোগাড় করে রাখতে বলেছে। কোনো একরাতে গোপনে এসে নিয়ে যাবে। পাখি আবার একদৌড়ে চলে গেল। কাঁথার অভাবে ছেলেদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। যেহেতু নির্দিষ্ট কোনো স্থানে অবস্থান করা মোটেই নিরাপদ নয়। তাই আজ এখানে কাল ওখানে, আর বেশীর ভাগ সময় বনজঙ্গলে থাকে তাই শীতের কাপড়ের খুব বেশি প্রয়োজন। নিজের ঘরে মাত্র কটা কাঁথা আছে। ফাতেমা এবাড়ি ও বাড়ি থেকে আরো অনেকগুলো কাঁথা সংগ্রহ করে পাটি বিছিয়ে ঘরের মেঝেতে রেখে দেয়। তখন থেকে শুরু হয়, প্রতীক্ষার পালা। কখন জাহিদ আসবে? কখন কাঁথাগুলো নিয়ে যাবে। এই সুযোগে ছেলের সোনা মুখখানা ইচ্ছেমতো দেখে নেবে। মনে হয় কত বছর ধরে ওকে দেখেনি। সারা রাতের মাঝে একফোটা ঘুম হয়নি ফাতেমার। শেষ রাতে আজানের পর নামাজ শেষ কর জায়নামাজে বসে আছেন ফাতেমা অমন সময় হঠাত্ করে দরজায় একটি লাখি পড়ে। দরজাটা ভেঙে যায়। রাইফেল তাক করে ঘরে ঢোকে কাশেম আলি। তার পেছনে আরো কয়েকজন। আতঙ্কে দিশেহারার মতো উঠে দাঁড়ান ফাতেমা। বললেন বাবা কাশেম আলি। কাশেম আলি নয়। তোর যম। শুনেছি জাহিদ মুক্তিযোদ্ধা, বেশে দেশে ফিরেছে। ওকে অস্ত্রসহ আমার হাতে তুলে দিতে হবে। পারবে কিনা বল? আমার ছেলেকে তোর মতো শত্রুর হাতে তুলে দেব। এটা তুই ভাবতে পারলি। এই পাক পবিত্র দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের যেমন বাঁচার অধিকার নেই। ঠিক তাদের মাদেরও নেই। বলেই কাশেম কাছারী ঘরে আগুন দিয়ে দ্রুত চলে যায়। মায়ের সঙ্গে দেখা করতে হবে। কাঁথাগুলো আনতে হবে। কখন নিরাপদে যাওয়া যাবে এমন একটা সুযোগ খুঁজতে থাকে জাহিদ। এক গভীর রাতে বাড়ি গিয়ে ঘরে ঢোকে হতভম্ব হয়ে যায়, মা নেই। শীতের কাঁথাগুলো পড়ে আছে। অন্ধকারে চেরাগের আলোয় জাহিদ একটা একটা করে কাঁথা তুলতে থাকে। একটি কাঁথাতে মায়ের হাতের নকশি করে আঁকা বাংলাদেশের ছবি। একটা কাঁথার গায়ে আঁকা বাংলাদেশের মানচিত্র।