ভূমি জরিপ অধিদফতরে দালালচক্র তত্পর

মৌজার নকশা, পর্চা তুলতে নিত্যদুর্ভোগ

দালালচক্রের কারণে সরকারের ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরে যথাসময়ে সঠিক সেবা পাচ্ছে না মানুষ। জমির পর্চা আর মৌজার নকশা তুলতে গিয়ে তারা দালালচক্রের দৌরাত্ম্য আর প্রতারণার ফাঁদে পড়ে এখানে ভয়ানক দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত ৬০ টাকা ফি দিয়েই যে কাজ সম্ভব, সেই কাজ করে দিতে ক্ষেত্রবিশেষে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে দালালচক্র হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা। প্রায় প্রতিদিনই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। জনগণের দুর্ভোগ লাঘব এবং নিজেদের ভাবমূর্তি অধিদপ্তরের নেয়া কোন উদ্যোগই কাজে আসছে না। সর্বোপরি জাল-পর্চা আর নকশার রমরমা বাণিজ্য চলছে অধিদপ্তরে। অভিযোগ রয়েছে, অধিদফতরের এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে দালালচক্র এই অপতত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছে। অধিদপ্তরে এক চক্কর:গত রবিবার দুপুরের দিকে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত ওই অধিদফতরের মূল ফটক দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ে লাল কালিতে বাংলায় লেখা একটি সাইনবোর্ড। এতে লেখা আছে, ‘দালাল, প্রতারক ও জালিয়াত চক্র থেকে সাবধান’। অদূরেই দেখা গেল কয়েকজন লোকের জটলা। একজন লোককে ঘিরে পাঁচ থেকে ছয়জনের একটি চক্র বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত। কাছে গিয়ে জানা গেল, যে লোকটিকে ঘিরে বিতণ্ডা চলছে তার নাম ওমর আলী। এসেছেন নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার এক গ্রাম থেকে। যারা তাকে ঘিরে রেখেছেন তারা দালাল। ওমর আলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশ কয়েকদিন আগে জমির একটি পর্চা তুলতে অধিদফতরে এলে সেলিম নামে এক লোকের সাথে তার পরিচয় হয়। এ সময় সেলিম নিজেকে অধিদফতরের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে পর্চা তুলে দেয়ার নাম করে তার কাছ থেকে ৮০০ টাকা নেন। এরপর শুরু হয় বিড়ম্বনা। বিভিন্ন অজুহাতে ওমর আলীকে ঘুরাতে থাকেন সেলিম। এভাবে পার হয় সপ্তাহ। পরে অধিদফতরের মুখে দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্যকে বিষয়টি জানান ওমর আলী। তাতেও প্রতিকার পাননি তিনি। উল্টো দালাল চক্রের তোপের মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। অবশেষে অনেক কাকুতি-মিনতির পর সেলিমকে দেয়া ৮০০ টাকার মধ্যে মাত্র ১০০ টাকা ফেরত পান ওমর আলী। ওমর আলী ইত্তেফাককে বলেন, ‘মূল ফটকের সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে প্রতারক ও দালালচক্র থেকে সাবধান। এসে সত্যিই বুঝতে পেরেছি এখানে দালাল ও প্রতারকদের আনাগোনা অনেক বেশি। এ জন্যই হয়তো জনগণকে সতর্ক করে দিতে এ সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে।’ এ বক্তব্যের সঙ্গে আরো একমত পোষণ করলেন ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত বিল্লাল হোসেন, রবিন তালুকদার, মোহাম্মদ আলী, সাদেক আলী মেম্বারসহ অনেকে। তারাও দালাল ও প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ার বিষয়টি জানালেন। সাত তলা বিশিষ্ট অধিদফতর কমপ্লেক্সের প্রতিটি তলায় দালালদের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দালালরা এখানে অবস্থান করে। দালাল ছাড়া এখানে যেন কোন কাজই হয় না। জানা যায়, ভূমি অধিদপ্তরকে ঘিরে জাল, পর্চা ও নকশার রমরমা বাণিজ্য চলছে। সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে সেবাগ্রহীতার হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে জাল কাগজপত্র। এসব অপরাধের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এদিকে ভূমি জরিপ সম্পর্কিত যে কোন তথ্য জানার জন্য ভবনের নিচ তলায় স্থাপন করা হয়েছে তথ্য কেন্দ্র। ওই তথ্য কেন্দ্রের প্রবেশ ফটকে লেখা রয়েছে, ‘এখানে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ’। ফটকের কাছে গেলেই একজন লোক এখানে আসার কারণ জানতে চান। সেবাগ্রহীতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে ‘বাড্ডা এলাকার একটি নকশা তোলার জন্য এসেছি’ বলার পর লোকটি জানতে চান কাগজপত্র সব ঠিক আছে কি-না? থাকলে তিনি কাজটি করে দিতে পারবেন। এ জন্য তিনি আড়াই হাজার টাকা দাবি করেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ ধরনের শতাধিক দালাল প্রতিনিয়তই অপতত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। দালালরা সব সময় সংঘবদ্ধ হয়ে চলাফেরা করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদফতরের এক কর্মকর্তা জানান, দালালদের উত্পাতে ঠিকমতো কাজ করা যায় না। যত্রতত্র দালালদের আনাগোনা। বলতে গেলে, দালালদের কাছে এক রকম জিম্মি হয়ে পড়েছেন তারা। তিনি বলেন, সম্পূর্ণ আইন বহির্ভূতভাবে এসব কাজ করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:দালালের দৌরাত্ম্যের কথা স্বীকার করে অধিদফতরের পরিচালক (ভূমি রেকর্ড) চন্দ্রনাথ বসাক বলেন, দালালদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে বেশ হাঁপিয়ে উঠেছেন তারা। প্রতারক ও জালিয়াতচক্র নির্মূলে একটি ভিজিলেন্স টিম গঠন করা হয়েছে। এর বয়স এক বছর হতে চললো। কিন্তু ভিজিলেন্স টিমের নজিরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে প্রতারক চক্র। তিনি জানান, ভোগান্তি কমাতে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ সংক্রান্ত কার্যক্রমকে ডিজিটালাইজড করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ঢাকা শহরের পর্চা ও নকশা ব্যবস্থাপনা ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া সাভারের সদর উপজেলার পাঁচটি মৌজায় ও নরসিংদীর পলাশ উপজেলার সবকটি মৌজায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে জরিপ চালানো হচ্ছে। অধিদফতরের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) তাপস কুমার বসু জানান, ভিজিল্যান্স টিম পুনর্গঠন করা হয়েছে। এর আওতায় প্রতি সপ্তাহে অঘোষিতভাবে দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া ভিজিল্যান্স টিমের সদস্যরা সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছেন।