অর্পিত সম্পত্তি ফিরে পাওয়া নিয়ে সংশয়
প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:২৯
অর্পিত বলে ঘোষিত সম্পত্তি ফেরত পাওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। সরকারের স্বার্থ বিবেচনায় সকল মামলায় আপিল বাধ্যতামূলক করে আদেশ জারির ফলে এ সংশয় তৈরি হয়েছে। যদিও মূল আইনে অর্পিত বলে ঘোষিত সম্পত্তি বৈধ মূল মালিক, উত্তরাধিকারী বা সহঅংশীদারকে ট্রাইব্যুনাল এবং এ সংক্রান্ত জেলা কমিটি (অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি) ফেরত দিতে পারবে বলে উল্লেখ আছে। ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৯ সালের ১৬ ফেরুয়ারির আগ পর্যন্ত যদি কোনো ব্যক্তি দেশত্যাগ করেন এবং এ সময়ে যদি তার সম্পত্তি তিনি বৈধ কোনো মালিকের কাছে বিত্রুি বা বৈধ স্বত্ব না দিয়ে যান, তবে সে সম্পত্তিকে অর্পিত বলে গণ্য করা হয়েছে।
২০০১ সালের অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন সংশোধন করে গত বছরের ৫ জুলাই কার্যকর করা হয়। এই আইনের অধীনে দুইভাবে অর্পিত সম্পত্তির মামলা নিষ্পত্তির বিধান রাখা হয়। ক এবং খ তফসিলভুক্ত জমি ট্রাইব্যুনাল বা জেলা কমিটিতে। খ তফসিলভুক্ত জমি জেলা কমিটিকে নিষ্পত্তির ক্ষমতা দেয়া হয়। সর্বশেষ গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংশোধিত তালিকা অনুযায়ী ক তফসিলে দুই লাখ একর এবং খ তফসিলে ৭ লাখ একর জমি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেসব অর্পিত ঘোষিত সম্পত্তি সরকার অস্থায়ীভাবে ইজারা দিচ্ছে তা ক তফসিলভুক্ত। যেসব সম্পত্তি কারো না কারো দখলে রয়েছে কিন্তু ইজারাভুক্ত নয় তা খ তফসিলভুক্ত। জেলা কমিটি ও ট্রাইব্যুনাল দরখাস্ত প্রাপ্তির ৩০০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করবে। তবে উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে আরও ৬০ দিন সময় নিতে পারবে।
জেলা কমিটিতে নিষ্পত্তির পর সংক্ষুব্ধ পক্ষ কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে আবেদন করতে পারবে। কেন্দ্রীয় কমিটি আবেদন পাওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করবে। কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল ট্রাইব্যুনালে মামলার বিধান আছে। আপিল ট্রাইব্যুনাল ৩০০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করবে। আপিল ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করা যাবে। এ ক্ষেত্রে নিষ্পত্তির কোনো সময়সীমা নেই। অর্থাত্ মোট চারধাপে নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে এ ক্ষেত্রে।
অপরদিকে যেসব মামলা জেলার ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক নিষ্পত্তি হবে তার বিরুদ্ধে আপিল ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন করা যাবে। আপিল ট্রাইব্যুনালের পর সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করার বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো সময়সীমা নেই। ট্রাইব্যুনালে মামলার নিষ্পত্তির ধাপ রয়েছে তিনটি।
গত বছরের ১১ নভেম্বর থেকে কার্যকর করে সমপ্রতি ভূমি মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক আদেশে বলা হয়েছে, ‘জেলা কমিটি ও ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত যে সমস্ত রায় সরকারের বিপক্ষে যাবে সে সমস্ত রায় পর্যালোচনাপূর্বক সরকারি স্বার্থ আছে বলে যুক্তিসঙ্গতভাবে প্রতীয়মান হলে সে সমস্ত মামলায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অবশ্যই আপিল দায়ের করতে হবে’।
প্রসঙ্গত. অর্পিত বলে ঘোষিত বিশেষ করে যেসব জমি সরকার ইজারা দিচ্ছে তা থেকে সরকার প্রতিবছর মোটা অংকের রাজস্ব পাচ্ছে। এখানে সরকারের স্বার্থ অবশ্যই রয়েছে। এখন এসব ক্ষেত্রে সরকার আপিল করতে থাকলে কবে সে জমি উদ্ধার হবে তা নিয়ে সংশয় ব্যক্ত করেছেন অনেকেই। আবার অনেক অর্পিত সম্পত্তির ওপর সরকারের বিভিন্ন স্থাপনা, অফিস রয়েছে। সেগুলো ফেরত পেতে বৈধ মালিক বা সহঅংশীদার আবেদন করেও কোন ফল পাবেন না বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। কারণ সেগুলোর নিষ্পত্তির জন্য আপিল বিভাগের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। জমি-জমা সংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমার বিষয়টি যারা ভালোমত জানেন, তাদের মতে অর্পিত ঘোষিত জমি ফেরত দেয়ার নামে এখন নির্যাতনের নতুন খড়গ ঝুলানো হল।
সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটির একাধিক সূত্র বলছে, সরকারের নতুন এই আদেশের ফলে অর্পিত ঘোষিত সম্পত্তি নিয়ে মানুষের বিড়ম্বনা, আর্থিক ক্ষতি দুই বাড়বে। এমনিতেই এখন বারবার দিন পরিবর্তনের খপ্পরে পরে টাকা গুনতে গুনতে ফতুর হচ্ছে ভুক্তভোগিরা। অন্যদিকে আপিল বিভাগে সময়সীমা না থাকায় কবে তা নিষ্পত্তি করে প্রকৃত মালিক তার জমি ফিরে পাবে তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। এখন এমনিই আদালতগুলোতে মামলার চাপ। আগের মামলা নিষ্পত্তি শেষে নতুন করে অর্পিত জমি সংক্রান্ত মামলা ধরে তা নিষ্পত্তি হবে সে আশা সূদুরপরাহত।