প্রেসক্রিপশন ছাড়াই মিলছে ‘ভায়াগ্রা’

বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করেছেন খোদ ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা। অধিদফতর সূত্রে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের সভাপতিত্বে ড্রাগ কন্ট্রোল কমিটির বৈঠকে ভায়াগ্রা তৈরি ও বাজারজাত করার বিষয়টি অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু কারো কিডনি বা হার্টে সমস্যা থাকলে বা ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগে চিকিত্সকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই দেশে অবাধে বিক্রি হচ্ছে যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট ভায়াগ্রা (সিলডেনাফিল সাইট্রেট)। এটি বিক্রির ক্ষেত্রে ওষুধ প্রশাসনের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। সারা দেশে ফার্মেসি ছাড়াও পান ও সিগারেটের দোকানেও মিলছে এই ট্যাবলেট। এতে দেশে নৈতিক অবক্ষয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার আশংকা করছেন অনেকেই। অবিলম্বে এর অবাধ বিক্রি নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভায়াগ্রা বিক্রির ব্যাপারে এর অনুমোদন প্রদানকারী ‘ড্রাগ কন্ট্রোল কমিটি’র পক্ষ থেকে কোন বিধি নিষেধের কথা বলা হয়নি। এছাড়া ওষুধের দোকান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে তেমন কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে পান ও বিড়ি-সিগারেটের দোকানেও এটি পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় এক ডজন দেশীয় ওষুধ কোম্পানি বিভিন্ন নামে ভায়াগ্রা উত্পাদন ও বাজারজাত করছে। আক্রান্ত রোগীদের ভায়াগ্রা ব্যবহার নিষিদ্ধ করা কিংবা চিকিত্সকদের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া বিক্রি করা যাবে না-এমন কোন নির্দেশনা তখন দেয়া হয়নি। তাছাড়া কি পরিমাণ ডোজ কিভাবে ব্যবহার করা যাবে- তাও বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের পরামর্শ মত করার কথা। বিশ্বের অন্যান্য দেশে ভায়াগ্রার ক্ষেত্রে সেই নির্দেশনা বলবত্ থাকলেও আমাদের দেশে নেই। ফলে ভায়াগ্রার গায়ে শক্তিবর্ধক লেখা দেখে এটি কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের মানুষ। দেশের স্বার্থে ভায়াগ্রা বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি বলে মনে করেন অধিদফতরের কর্মকর্তারা। এদিকে ভায়াগ্রার যথেচ্ছ ব্যবহারে দেহে নানা জটিলতাসহ মৃত্যুর ঝুঁকি পর্যন্ত রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা। দেশে ধর্ষণ বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে ভায়াগ্রার অপব্যবহারকে দায়ী করে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকগণ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এটি নিয়ন্ত্রণ না করলে তরুণ সমাজের ধ্বংস অনিবার্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিনের ডীন ও বিশিষ্ট চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ভায়াগ্রা যত্রতত্র বেচাকেনা চলছে। এটা তরুণ সমাজের জন্য চরম হুমকি। এতে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা বাড়বে বলে তিনি মনে করেন। মনোরোগ চিকিত্সক ডা. মোহিত কামাল বলেন, ভায়াগ্রা সেবন করে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার বেশ কিছু শিক্ষিত তরুণী আমার কাছে চিকিত্সা নিতে এসেছিলেন। ভায়াগ্রা তরুণ প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়া দেশের জন্য বিপদ ডেকে আনার সমান। দেশের স্বার্থে এটা উত্পাদন না করাই উত্তম। চোরাই পথে আসা ভায়াগ্রার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া এবং দেশে উত্পাদিত ভায়াগ্রা ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ জরুরি বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এমএন হুদা ও অধ্যাপক ডা. কবীর চৌধুরী বলেন, যে কোন ওষুধ চিকিত্সকের ব্যবস্থাপত্র ব্যতীত বিক্রি বিপজ্জনক। ভায়াগ্রা বেচাকেনার ক্ষেত্রে আরো বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন বলে তারা অভিমত ব্যক্ত করেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির উপ-সচিব মনির হোসেন বলেন, রাজধানীসহ সারাদেশে তাদের সমিতির অধীনে লাইসেন্সধারী এক লাখ ওষুধের দোকান রয়েছে। আরো রয়েছে চার লক্ষাধিক অবৈধ ওষুধের দোকান। বৈধ দোকান মালিকরা ভায়াগ্রা বিক্রির ক্ষেত্রে সমিতির নির্দেশনা মানলেও অবৈধ দোকান মালিকরা মানছে না। তিনি বলেন, এদেশে ওষুধের নামে নিম্নমানের ও ভেজাল উপকরণ দিয়ে তৈরি কি যে বাজারজাত চলছে, তা দেখার কেউ নেই। এ ব্যাপারে আল্লাহই একমাত্র ভরসা বলে তিনি মন্তব্য করেন।