যুদ্ধাপরাধের রায় নিয়ে বিএনপি আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেবে না
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:৩৬
মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের প্রথম রায় সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোন প্রতিক্রিয়া দেবে না বিএনপি। রাজনৈতিক কৌশলের কারণেই আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো থেকে বিরত থাকবে দলটি। অন্যদিকে আগামী রবিবার শুরু হতে যাওয়া জাতীয় সংসদের শীতকালীন অধিবেশনেও বিরোধী দলের যোগদানের সম্ভাবনা ক্ষীণ। এছাড়া আগামী সংসদ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার দাবিতে চলমান আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করতে যাচ্ছে বিএনপি। এসব বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের লক্ষ্যে দুই-তিনদিনের মধ্যে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডাকা হচ্ছে।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ গতকাল বুধবার ‘ইত্তেফাক’কে জানান, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের প্রথম রায় সম্পর্কে বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানোর কিছু নেই। বিএনপি এ ব্যাপারে দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেবে না। আমরা সবসময়ই বলছি-আমরাও যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে, তবে সে বিচার হতে হবে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমুক্ত। তাছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সোমবার যার রায় হয়েছে তিনি বর্তমানে জামায়াতেরও কেউ নন। সে কারণে তার সঙ্গে ১৮ দলীয় জোটেরও কোন সম্পর্ক নেই। অতএব, এ নিয়ে বিএনপির বক্তব্য রাখার কী আছে।
মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের প্রথম রায় গত সোমবার ঘোষণার পর বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা পৃথকভাবে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন দলীয় ফোরামে আলোচনার মাধ্যমে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হতে পারে। দলীয় সিদ্ধান্ত না জেনে ঐদিন তারা তাত্ক্ষণিক কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। বিএনপি স্থায়ী কমিটির আর এক সদস্য জানান, পলাতক আবুল কালাম আযাদের মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিষয়ে ‘সন্তুষ্টি’ কিংবা ‘অসন্তুষ্টি’ জানিয়ে কোনো ধরনের বক্তব্য না দেয়ার জন্য দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রতি মৌখিক পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কারও কোনো বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ১৮ দলীয় জোটের অভ্যন্তরে যেন কোনো ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি হতে না পারে, সেজন্যই এই পরামর্শ দেয়া হয়েছে বলে জানান বিএনপির এই নেতা।
রবিবার সংসদ ভবনে উপস্থিত থাকবেন ১৮ দলের এমপিরা
সংসদে যোগদান করা না করার বিষয়ে বিরোধী দল এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিলেও অধিবেশন শুরুর দিন অর্থাত্ আগামী রবিবার বিকালে সংসদ ভবনে উপস্থিত থাকবেন বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা। ঐদিন বিকাল ৩টার মধ্যে সংসদ ভবনে বিরোধীদলীয় নেতার কার্যালয়ে উপস্থিত থাকার জন্য ইতিমধ্যে বিএনপি ও জোটের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের আহবান জানানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক ‘ইত্তেফাক’কে জানান, আমরা বিরোধীদলীয় নেতার কার্যালয়ে সমবেত হয়ে রবিবার অধিবেশনের প্রথমদিনে রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও সরকারি দলের বক্তব্য শুনবো। যদি সরকারের পক্ষ থেকে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের লক্ষ্যে এবারের অধিবেশনে বিল উত্থাপনের এবং বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টসহ সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়া হয় তাহলে আমরা সংসদে যোগ দেব। তিনি বলেন, সে কারণে বিরোধী দল সংসদে যোগ দেবে কি-না সে সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে সরকারের ওপর।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন সম্ভবত দুই-তিনদিনের মধ্যে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক আহ্বান করবেন। সেখানে সংসদে যোগ দেয়া কিংবা না দেয়ার বিষয়ে আলোচনা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা সংসদে যেতে চাই। কিন্তু যখনই যাওয়ার উদ্যোগ নিই তখনই সরকার এমন পরিবেশ সৃষ্টি করে যেন আমরা না যেতে পারি। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়, সরকারই চায় না বিরোধী দল সংসদে যাক।
বিএনপিসহ ১৮ দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য ‘ইত্তেফাক’কে জানান, তাদের অধিকাংশই সংসদে যোগদানে আগ্রহী। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্ত এখনও জানা না যাওয়ায় তারাও দ্বিধাদ্বন্দ্বে। তাদের মতে, বিগত চার বছরে সরকারের সীমাহীন ব্যর্থতা, বিশ্বজিত্ দাস হত্যাসহ আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও সর্বশেষ মন্ত্রিসভায় আলোচনা ছাড়াই রাশিয়া থেকে উচ্চহারের সুদে আট হাজার কোটি টাকার সমরাস্ত্র কেনার চুক্তিসহ মোটা দাগের ইস্যুগুলোতে বিরোধী দল সংসদে বক্তব্য রাখলে তা দেশের মানুষের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হবে। আলাপকালে একজন এমপি এই বলে প্রকাশ করেন, ‘প্রতিদিন ছোটখাটো সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন ও গোলটেবিল বৈঠকে দলের একডজন নেতার বক্তব্য রাখার চেয়ে সংসদে তুলে ধরলে তা অনেক বেশি প্রভাব ফেলবে।’ বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান ইত্তেফাককে বলেন, আমরা এবার সংসদে যাব বলে একরকম সিদ্ধান্ত ছিল। তবে যখনই সে লক্ষ্যে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম তখনই আদালতে বিরোধীদলীয় নেতার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলায় অভিযোগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে, অন্যদিকে আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে কারাবন্দী করে একের পর এক মিথ্যা মামলায় জড়ানো হচ্ছে। যার কারণে আমাদের সংসদে যাওয়ার আগ্রহ থাকলেও সরকারই সে পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
আসছে নতুন কর্মসূচি
আগামী সংসদ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে চলমান আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করতে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। জানুয়ারি মাসজুড়ে যেসব কর্মসূচি দেয়া হয়েছিল তা শেষ হচ্ছে আগামী শনিবার। বাকশাল প্রতিষ্ঠার দিন ২৫ জানুয়ারি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ পালনের লক্ষ্যে প্রথমে সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও ঐদিন পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী হওয়ায় কর্মসূচি পিছিয়ে পরদিন নেয়া হয়েছে।
বিশ্ব ইজতেমা এবং ও-লেভেলসহ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা থাকায় ইংরেজি নতুন বছর ২০১৩ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে কোনো উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি দেয়নি ১৮ দল। তবে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ফেব্রুয়ারিতে হরতালসহ বড় কর্মসূচি দেয়ার বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনার পর ১৮ দলীয় জোটের বৈঠকে পরবর্তী কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হবে।