সিঙ্গাইরে রাত জেগে পাহারা
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:৩৯
সন্ত্রাসীদের দাপটে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরবাসীদের দিন আর রাত কাটে এক অজানা আশংকায়। গত ছয় মাসে এ উপজেলায় খুন হয়েছে ২২ জন। আর অধিকাংশ ঘটনায় খুনিরা রয়ে গেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। ডাকাত আতংকে গ্রামবাসী রাত জেগে পাহারা দেয়। ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে মাদকের। মঙ্গলবার দিন-দুপুরে গুলিতে নিহত দুই যুবকের পরিচয় মিলেছে। তারা হলেন সাভার উপজেলার রাজাসান এলাকার মৃত জব্বার আলীর ছেলে শাওন (৩২) ও আক্রাইন এলাকার শাহজাহানের ছেলে মোহাম্মদ শামীম (২৮)। সাভার পুলিশ জানিয়েছে, নিহত শাওন ও শামীম এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগে বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। শাওন ও শামীম কয়েকবার জেল খেটেছেন। নিহতের পরিবারও স্বীকার করেছে, শাওন ও শামীম একসময় অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তারা ভাল হবার চেষ্টা করেছেন। শাওন মুদি দোকান চালাচ্ছিলেন। আর শামীম সাভার বাসস্ট্যান্ডে ইলেক্ট্রনিক্সের দোকানে কাজ করতেন।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সিঙ্গাইর থানার সাব-ইন্সপেক্টর শাহজাহান আলী বাদী হয়ে মামলা করেছেন। তবে সিঙ্গাইর থানা পুলিশ জানিয়েছে, নিহতের পরিবার থেকে কোন অভিযোগ দেয়া হয়নি। অভিযোগ পাওয়া গেলে পুলিশের দায়ের করা মামলার সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
মঙ্গলবার দুপুরে নিহত শামীম ও শাওনসহ ছয় যুবক দুটি মোটরসাইকেলে করে সিঙ্গাইর উপজেলার জামির্তা ইউনিয়নের ধলেশ্বরী নদীর নির্জন এলাকা বকচর পুরনো খেয়াঘাট এলাকায় যান। তারা কিছু সময় সেখানে অবস্থান করেন। একপর্যায়ে শামীম ও শাওনের সঙ্গীরা তাদেরকে গুলি করে হত্যা করে।
সিঙ্গাইর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ লিয়াকত আলী বলেন, হত্যার ধরন দেখে মনে হয় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঐ দুই যুবককে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, ঘটনার আগে ৬ জনই কোন একটা বিষয় নিয়ে নিজেরা বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে দুই যুবককে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর অপর চার যুবক দ্রুত মোটরসাইকেলে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
ওসি আরও বলেন, ঘটনার পর আশপাশ এলাকার কেউ নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি। লাশের সুরতহাল রিপোর্ট শেষে লাশ মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। গতকাল স্বনজরা লাশ সনাক্ত করেন।
নিহত শাওনের ছোট ভাই সজল জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সকালের দিকে শাওন বাসা থেকে বের হন। তিনি বিভিন্ন লোকজনের কাছ থেকে জানতে পারেন সকাল ১১টার দিকে শাওন, শামীম ও জিসান রাজাসান পলো মার্কেটের সামনের একটি গ্যারেজে বেশকিছু সময় আড্ডা দেন। ঐ সময় তাদের বন্ধু রাজ সেখানে মোটরসাইকেল নিয়ে হাজির হয়। পরে রাজের মোটরসাইকেলে করে শাওন ও শামীম বের হয়ে সাভারের মাজিদপুর এলাকায় যায়। ঐ সময় নজরুল নামে তাদের অপর বন্ধুর সঙ্গে তাদের কথা হয়। এরপর তারা আর বাসায় ফেরেনি। গতকাল পত্রিকায় দুই যুবক খুন হবার খবর পেয়ে তিনি সিঙ্গাইর থানায় যোগাযোগ করেন। পরে মর্গে গিয়ে লাশ সনাক্ত করেন।
সজল আরো জানান, তিন মাস আগে শাওন ও শামীমের বন্ধু নজরুলকে র্যাব গ্রেফতার করেছিল। আর নজরুল গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে তার মোটরসাইকেলটি ব্যবহার করতো শাওন। কয়েকদিন আগে নজরুল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান। তিনি বলেন, মুক্তি পাওয়ার পর নজরুল তার মোটরসাইকেল ফেরত চায়। এ নিয়ে শাওন ও নজরুলের মধ্যে বিরোধ বাধে। ধারণা করা হচ্ছে, এ বিরোধের জের ধরেই শাওন ও শামীমকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
অন্যান্য খুন ঃ গত ১৩ জানুয়ারি সিঙ্গাইরের বায়রাতে মাদকের টাকা না পেয়ে স্বামী মুকুলের হাতে খুন হন স্ত্রী নার্গিস ও তার দূরসম্পর্কের আত্মীয় সাফি আক্তার। এর কয়েকদিন আগে কানাই নগরে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে খুন হন নুর নামে এক ব্যক্তি। গত ২০ ডিসেম্বর চারিগ্রামে গণপিটুনিতে নিহত হন হারুন নামে এক আন্ত:জেলা ডাকাত। ১৬ ডিসেম্বর দরিরাজনগর গ্রামে ৮ বছরের শিশু রাসেলকে মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ করে হত্যা করা হয়।
গত নভেম্বরে বায়রাতে পিটিয়ে হত্যা করা হয় আকবার আলী নামে এক ব্যক্তিকে। একই মাসে দাসেরহাটি গ্রামে কানু মিয়ার শিশুকন্যা কণা আক্তারকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ৩০ নভেম্বর ধল্লা খাল থেকে বস্তাবন্দি অজ্ঞাতনামা এক মহিলার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ২৯ অক্টোবর চর পল্টনে সন্ত্রাসীরা হত্যা করে ঢালীকান্দি গ্রামের বিপ্লব ও আবুল কাশেম হাবু নামে দুই বন্ধুকে। এর একদিন আগে খুন হন ইরতা কাশিমপুর গ্রামের কলেজ ছাত্র সজল।
১৬ অক্টোবর একইভাবে খুন হন স্বরূপপুর গ্রামের বিমল চন্দ্র মণ্ডল নামে এক কাঠমিস্ত্রী। ৬ অক্টোবর পূর্বশত্রুতার জের ধরে চরমগরা গ্রামের আলমগীর নামে এক যুবক খুন হন। ৮ সেপ্টেম্বর খাসেরচরে ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হন গোলরা গ্রামের প্রাইভেট কার চালক আওলাদ হোসেন। জুলাই মাসে ধলেশ্বরী নদী থেকে কামরুন্নাহার নামে এক স্কুল ছাত্রীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ১০ জুন বাহাদিয়ার আব্দুর রশিদ নামে এক ব্যবসায়ী ও চান্দহর গ্রামের গৃহবধূ শাহনাজ খুন হন। ১৭ জুন সানাইল ব্রিজের পাশে অজ্ঞাতপরিচয় গুলিবিদ্ধ এক যুবক ও মাধবপুর থেকে এনজিও কর্মী মহিলার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।