নিখিলের চির সুন্দর হযরত মুহাম্মদ (স.)

মহাবিশ্বে এল মহাবিস্ময়। নিখিল এ ধরণীর অপরূপ সৌন্দর্য এবং কলা কৌশল দেখে মানুষের মনে সহজাত প্রশ্ন জাগে, এটা কি এমনিতেই হল? না এর পিছনে কোন স্রষ্টার অস্তিত্ব আছে? জগত্ কি মানুষের তৈরি মারণাস্ত্রের সাহায্যে ধ্বংস হবে না মানবতা প্রতিষ্ঠিত হবে। দুনিয়ার জীবনই কি এ মাত্র জীবন, না জীবন ও জগত্ ধ্বংস হয়ে যাবার পর অবশিষ্ট কিছু থাকবে? প্রভৃতি প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তরদানের চেষ্টায় দার্শনিকদের বাগ-বিতণ্ডায় শতাব্দির পর শতাব্দি কেটে গেছে কিন্তু মানুষ একমতে আসতে পারে নি। আসলে মহাপরিকল্পনাকারী মানুষ সৃষ্টির পর মানুষের এ সহজাত প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার জন্য এবং তাদের শান্তিতে বসবাস করার জন্য শান্তির শাস্ত্র পাঠিয়েছেন। আর এ মহাশাস্ত্রের ধারক-বাহক হলেন নবী-রাসূলগণ। তিনি মানুষের ভেতর উপযুক্ত ব্যক্তিকে বার্তাবাহক হিসাবে নির্বাচন করেন। নবুয়াতের ক্রমধারায় মানুষের পরিচয় এবং দুনিয়ার বুকে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যাকে সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ করে পাঠানো হয়েছে তিনি হলেন রহমাতুল্লিল, আলামিন সরদারে কায়েনাত, মরুর বুকে আরবি ভাষী হযরত মুহাম্মদ (স.)। চল্লিশ বছর বয়সে নবুয়াত প্রাপ্তির পর তিনি আল্লাহর অস্তিত্ব একত্ববাদ ও নিজের নবুয়তের কথা ঘোষণা করলেন। তার পর অবতীর্ণ আয়াতগুলো মুখস্ত করার ব্যাপারে চিন্তিত হয়ে তাড়াহুড়া শুরু করলেন। কিন্তু আল্লাহ বলেন, “হে নবী! আপনার এত তাড়াহুড়া করার কোন কারণ নেই, আমি আল্লাহ এগুলো আপনার দিলে গেঁথে দেওয়ার ব্যবস্থা নিলাম” বিশ্ব জুড়ে যার পাঠশালা আর স্বয়ং আল্লাহ যার শিক্ষক তার জানতে কি কিছু বাদ থাকে। পৃথিবীর অন্যান্য সাধারণ মানুষের মধ্যে যারা জ্ঞানী জ্ঞানের চূড়ান্ত পর্যায়ে যেয়ে তারা সৃষ্টির রহস্য এবং বস্তুর স্বরূপ বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই দেখতে পাই দর্শন আকাশের চিরভাষ্য দার্শনিক সক্রেটিস তার জ্ঞান সম্পর্কে বলেন, “I know a thing that I know nothing.” পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী নিউটন বলেন, “আমি জ্ঞান সমুদ্রের বালুকণার বেলায় দাঁড়িয়ে শামুক-ঝিনুক নিয়ে খেলা করছি এখনও অথৈ সমুদ্র অজানা রয়ে গেল”। আসলে মানুষকে অপূর্ণ Imperfect করে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ যতটুকু ইচ্ছা করে ততটুকু সে জানতে পরে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ পাক বলেন, “তিনি অদৃশ্যের জ্ঞানী তিনি অদৃশ্যের জ্ঞান কারও কাছে প্রকাশ করেন না তার মনোনীত রসূল ব্যতিত। তখন তিনি তার অগ্রে ও পশ্চাতে প্রহরী নিযুক্ত করেন” (সূরা জ্বীন, আয়াত ২৬, ২৭)। যেহেতু মুহাম্মদ (স.)-এর স্বয়ং শিক্ষক হলেন আল্লাহ এবং সারা জাহান যার পাঠশালা সেহেতু তার আর কিছু জানতে বাকি থাকার কথা নয়। তাই তিনিই বলতে পারেন, “আমি হলাম জ্ঞানের শহর, আর হযরত আলী হল তার দরজা স্বরূপ”। সক্রেটিস বলেছেন, “know thyself” অর্থাত্ নিজেকে জানো। হযরত আলী বলেছেন, “যে নিজেকে জানতে পেরেছে সে তার সত্তাকে জানতে পেরেছে”। স্বয়ং আল্লাহ যেহেতু মুহাম্মদ (স.) এর শিক্ষক সেহেতু নিরক্ষর হওয়া সত্ত্বেও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, ঐতিহাসিক, নীতি বিজ্ঞানী, আইনবিদ, সমাজ সংস্কারক। “Necessity is the father of invention” মানুষের প্রয়োজনে মানুষ আবিষ্কার করবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু মানবতা এবং নৈতিকতার দিক দিয়ে এই মানুষ আবার পশুত্বের কারণে নিকৃষ্ট চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও অধম হয়ে যেতে পারে। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীবের এ রকম করুণ দুর্দশা জাতে না হয় তার জন্য আল্লাহ পথ হারা মানুষের দিশারী হিসাবে প্রেরণ করেছেন পথ নির্দেশনা। তাইতো আমরা দেখতে পাই মুহাম্মদ (স.) অসভ্য বর্বর জাহেলতার যুগের মানুষকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত করেছিলেন। তিনি সকল জীবের, সকল ভাষার, সকল দেশের মানুষের ইহকাল ও পরকালের মুক্তির পয়গম নিয়ে এসেছেন। তাই আল্লাহ বলেন, “নবী হে! আপনাকে তামাম সৃষ্টির জন্য রহমতের মূর্ত প্রতীক (রহমাতুল্লিল আলামীন) হিসেবে পাঠিয়েছি”। তিনি যে সমাজ চিন্তা উপহার দিয়েছেন তা মানব সমাজ সভ্যতা ও সংস্কৃতির একটি ভারসাম্যমূলক অবস্থা হিসাবে স্বীকৃত। বিশ্বের মানুষ আজ শান্তি চায় কিন্তু কোন পথে শান্তি আসবে? পৃথিবীতে মানবতাবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন মতাদর্শ আছে যেমন-পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, ইসলাম প্রভৃতি। পুঁজিবাদ ব্যক্তি মালিকানাকে সীমাহীনভাবে গুরুত্ব দেয়। যার করণে পুঁজিবাদ সবশেষে গিয়ে শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়। কিন্তু সমাজতন্ত্র ব্যক্তি মালিকানাকে একেবারে বিদায় জনায়। রাষ্ট্র্রীয় মালিকানাকে প্রধান্য দেয়। ব্যক্তি নিজে কাজ করবে সীমাহীন কিন্তু পাবে প্রয়োজন মত।