পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আনন্দের দিন রসূলের জন্ম দিন
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০১৩, ১৬:৫৬
আরবী বেলাদাতুন থেকে মিলাদ শব্দের উত্পত্তি। মিলাদ শব্দের বাংলা অর্থ জন্ম বৃত্তান্ত বা জীবন কাহিনী। ঈদ মানে খুশী। মিলিয়ে বললে অর্থ দাঁড়ায় নবীজীর জন্মের খুশী। আর এ মহিমান্বিত দিবসটি ছিলো ঈসায়ী সালের ৫৭০ খ্রীষ্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল রোজ সোমবার সুবহে সাদিকে আরবের সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের আব্দুল্লার শাহী প্রাসাদে তাঁর জন্ম। তিনি ছিলেন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী (স.)। আর সেই জন্মের ধারাবাহিকতায় ঈদে মিলাদুন্নবী (স.) পালন হয়ে থাকে। হযরত মুহাম্মদ (স.) এর গৌরবময় জীবন গাঁথা বিশ্বজগতের জন্য কল্যাণকর ও করুণা স্বরূপ। তিনি শুধু মুসলমানদের নবী নন, বরং তাঁর দর্শন চিন্তা ও জীবনাদর্শ সমগ্র মানব মন্ডলীর জন্য পথ নির্দেশক ও মুক্তির দিক নির্দেশনা। এছাড়াও তিনি বিশ্ব জাহানের সব সৃষ্টিলীলার জন্য রহমত ও করুণার আধার স্বরূপ। তাঁর শানের পাশে মহাগ্রন্থ কুরআনে বলা হয়েছে, “হে রাসূল (স.) আমি আপনাকে বিশ্ব জগতের জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি (সূরা আম্বিয়া, আয়াত-১০)। সুতরাং রাসূল (স.) শুধু মুসলমান জাতি কিংবা মানুষের জন্য নয়, বরং সমগ্র সৃষ্টি জগতের জন্য রহমত ও করুণা স্বরূপ। এজন্য তিনি ছিলেন সব সৃষ্টির জন্য করুণাকারী উদার ও সংবেদনশীল। মানব, দানব, জীব-জন্তু, পশু-পাখী, বৃক্ষলতা, এমনকি সব সৃষ্টিই তাঁর করুণার ছায়াতলে পেত আশ্রয়। সেদিক থেকে বিশ্বজগতের কল্যাণ ও মুক্তির জন্য রাসূল (স.) এর জন্ম ও শুভ আগমন বিশ্ব মানবের জন্য অত্যন্ত রহমতময় ও বরকতময়। এজন্য কোনো-কোনো সাধক প্রবরের অভিমত-এ ক্ষণজন্মা মহান পুরুষের জন্মকে সাদর সম্ভাষণ, সু-স্বাগতম ও সাহলান আহলান জানিয়েছেন স্বয়ং রব্বুল আলামিন ফেরেশতাদের নিয়ে। যে বিষয়ে মহাগ্রন্থ কুরআনে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ স্বয়ং ফেরেশতাদের নিয়ে রাসূল (স.) এর প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করছেন, হে বিশ্বাসীগণ তোমরাও অনূরূপভাবে রাসূল (স.) এর প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ কর স্বশ্রদ্ধচিত্তে” (সূরা আহযাব, আয়াত-৫৬)। এই নির্দেশ সূচক ঘোষণা পত্র থেকে রাসূল (স.) এর জন্মের খুশী এবং তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করা আমাদের প্রতি আবশ্যকীয় হয়ে পড়েছে। বিষয়টির ওপরে কুরআনের আর একটি ভাষ্য এইরূপ, হে রাসূল (স.) “বলুন এটি আল্লাহর কুরআন আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত মানব জাতির জন্য। অতএব এতে সকলে যেনো আনন্দিত হয়। আর এ আনন্দ সমস্ত ধন দৌলত পাওয়ার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ” (সূরা ইউসুফ, আয়াত-৫৮)। পবিত্র কুরআন ও হাদিস অনুসন্ধান করলে ঈদে মিলাদুন্নবী তথা রাসূল (স.) এর জন্মের খুশী সম্বন্ধে অনেক স্বাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যাবে। এ সম্বন্ধে মাওয়া হিবুল্লাদ্দুনিয়া কিতাব থেকে পাওয়া-যায় রাসূল পাক (স.) এর জন্মকালিন সময় মা আমিনা বলেন, “আমি পবিত্র সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার সাথে-সাথে তাঁকে সিজদায় অবনত হতে দেখেছি এবং তাঁর তজ্জনী আঙ্গুঁলী দোয়া ও ক্রন্দনরত অবস্থায় আকাশের দিকে প্রসারিত হতে দেখেছি। তিনি আরো বলেন-পবিত্র সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর কারা যেনো তাঁকে সমগ্র সৃষ্টিজগত্ পরিভ্রমণ করে পুনরায় ফিরিয়ে দেন এবং তাঁদের কথোপকথন থেকে শোনা গেলো, “মুহম্মদকে সমস্ত নবীগণের গুণাবলীতে বিভূষিত কর, অতপর আম্বিয়াগণের চরিত্রের সাগরে ডুবিয়ে দাও।” এছাড়া তাঁর জন্মকালিন সময়ে অনেক অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয়। যেমন নওসেরা বাদশার সিংহাসন প্রচন্ড গর্জনে নড়ে উঠে নয়টি পাথর সিটকে পড়ে যায়। মাওয়া-দরিয়া শুকিয়ে যায়। সামওয়া হ্রদ পানিতে ভরে যায়। পারস্যের অগ্নি কুন্ডটি নিভে যায়। কাবা ঘরের রক্ষিত হুবল মূর্তীটি উপড়ে মাটিতে উপুড় হয়ে থাকে। সুতরাং রাসূল পাক (স.) এর জন্ম বিশ্বের জন্য করুণার মহাসমারোহ ও উদ্দীপনার দিন। তাঁর জন্মকে শুধু ইসলাম ধর্মে নয়, অন্য সব ধর্মেও সানন্দচিত্ত্বে গ্রহণ করেছে। তাঁর শুভাগমন সম্বন্ধে আসমানী কিতাব তাওরাতে বলা হয়েছে, “তোমাদের প্রভূ ঈশ্বর তোমাদের ভ্রাতৃদের মধ্য হতে আমার (মুসার) মতো একজন পয়গাম্বর উথিত করবেন তিনি হলেন “আহমদ”, তোমরা তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করবে এবং তাঁকে অনূসরণ করবে।” বাইবেলে বলা হয়েছে, “যদি তোমরা আমাকে ভালোবাস তবে আমার উপদেশ মতো কাজকর, আমি স্বর্গীয় পিতার কাছে প্রার্থনা করবো তিনি যেনো তোমাদের জন্য আর একজন শান্তিদাতা প্রেরণ করেন, যিনি চিরদিন তোমাদের সাথে থাকবেন।” আরো বলা হয়েছে, “আমার উচিত্ তোমাদের মঙ্গলের জন্য এখান থেকে চলে যাওয়া। কারণ আমি না গেলে সে শান্তিদাতা আসবেন না।” ভবিষ্যত্ পুরানে আছে, “ঠিক সেই সময়, “মুহাম্মদ” নামক এক ব্যক্তি যার বাস মরু অঞ্চলে তিনি সাথীসহ আবির্ভূত হবেন। হে আরবের প্রভূ হে জগত্ গুরু তোমার প্রতি আমার স্ততিবাদ। তুমি জগতের সমূদয় পাপ ও কলুষ নাশের উপায় জানো, তোমাকে শুভেচ্ছা। হে পবিত্র পুরুষ আমি তোমার দাস, আমাকে তোমার চরণ তলে ঠাঁই দাও। বুদ্ধ তার শিষ্য নন্দাকে ডেকে বললেন, “আমি শেষ বুদ্ধ নই, আমার পরেও বুদ্ধ আসবেন। তিনি সর্বগুণ সম্পূর্ণ “মৈত্রেয়” তোমরা তাঁকে মান্য করিও। আবার বলা হয়েছে মৈত্রের পরিচয়ে তিনি বোধি বৃক্ষের নীচে সভার আয়োজন করবেন। আমরা সেই বোধি বৃক্ষকে দারুল নদওয়ার বটবৃক্ষরূপে দেখতে পাই। সবদিক মিলিয়ে রাসূল (স.) এর জন্মেছিলেন বিশ্ববাসির জন্য রহমত ও করুণা স্বরূপ। তাই তাঁর জন্মের খুশীকে ঈদে মিলাদুন্নবী বা নবী (স.) এর জন্মের খুশীতে অধিক মাত্রায় আনন্দিত হওয়া অতীব পূণ্যময় ও সওয়াবের কাজ। আর এ খুশী তাঁর একান্ত ভক্তবৃন্দ ও সাহাবায়ে কেরামদের মাধ্যম দিয়ে তাঁর জীবদ্দশ্যাই শুরু হয়েছে। সাহাবী হযরত আবু দারদা বর্ণনা করেছেন, তিনি একদিন হযরত রাসূল (স.) এর সঙ্গে সাহাবী আবু আমের আনসারীর বাড়িতে উপস্থিত হয়ে দেখতে পেলেন, আবু আমের তার পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে রাসূল (স.) এর জন্ম বৃত্তান্তের আলোচনা করছেন এবং আনন্দ করছেন। এতে রাসূল (স.) অত্যন্ত খুশী হলেন এবং বললেন, “হে আমের নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তায়ালা তোমাদের জন্য রহমতের দরজা খুলে দিয়েছেন এবং ফেরেশতারা তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন।” সুধী পাঠক, সময়ের পরিক্রমায় ইসলামের এই অলংকারগুলো কালের গর্ভে বিলিন হয়েছে, হারিয়ে গেছে ইসলাম ধর্মের গৌরব ও মর্যাদা। কিন্তু ইসলামের পুনর্জাগরণ অবশ্যম্ভাবী।