চিত্রপ্রদর্শনী

নিরন্তর মাটির টানে

প্রান্তিক মানুষের জীবনযাপনের খোঁজ আমরা কজনইবা নিই? নাগরিক দিনযাপনে গ্রামীণ জনপদের নানা পেশার মানুষের কথা আমরা একেবারে ভুলেই থাকি। শিল্পী ফরিদা জামানের শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়ালে এ প্রশ্ন মনে জাগে। সুন্দরের সাথে তিনি নির্মাণ করেন আবহমান বাংলার মানুষের মুখ। দলিত সম্প্রদায়ের কথা, নদী, নৌকা, জেলে তাঁর ক্যানভাসের বিষয়। এটি শিল্পীর সপ্তম একক প্রদর্শনী। কাগজে অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে তামাটে রংয়ের মুখ প্রান্তিক মানুষের নিত্য সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয়। গত চার দশকের শিল্পচর্চায় ফরিদা জামানের কাজে শৈশব, কৈশোরের স্মৃতি, নদীমাতৃক বাংলার রূপ শিল্পীর ক্যানভাসে অব্যাহতভাবে উপস্থিত। এবারের প্রদর্শনীতে শিল্পকর্মের সংখ্যা ৬৩টি। ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রংয়ের কাজ ছাড়াও কাগজে অ্যাক্রিলিকের কিছু কাজ রয়েছে। ফরিদা জামানের কাজের বিষয়ে সবসময় তৃণমূল মানুষের প্রতীক সুফিয়া চরিত্রের উপস্থাপন আমরা লক্ষ করি। জেলেদের জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকে সুতোয় বোনা জাল। সে জাল ও জলের ঢেউ ফরিদা জামানের ক্যানভাসে ভেসে ওঠে। উজ্জ্বল লাল রঙের সাথে বার্ন্ট সিয়েনা রঙের মিশেলে গড়ে ওঠা লালচে খয়েরি জালের ছন্দ তৈরি করেন চওড়া ব্রাশের আঁচড়ে। ফরিদা জামানের কাজ নিয়ে ভাবলেই আমাদের সামনে এ কয়েকটি রং আর বিষয় হাজির হয়। এবারের প্রদর্শনীর শিরোনামের সাথে বিষয় মিলে ছবির সাথে দর্শকদের কথোপকথন হয়। ‘মাই ল্যান্ড’ বা ‘আমার ভূমি’ কিংবা ‘এক্সপ্রেশন’ শিরোনামের সংগ্রামী নারীমুখ আমাদের গ্রামীণ জনপদের রূপ আর আভাস দেয়। ক্যানভাসে সুন্দর রূপের পরিবর্তে এক সংগ্রামী সুফিয়া উপস্থিত হয়ে যেন দর্শককে কিছু বলতে চায়। সুফিয়ার দুঃখ-দুর্দশার সাথে যুক্ত হয় সুখ। ফরিদা জামান বাংলার জল, জমি, লতা, গুল্ম, ফুল, পাখি, জলের সে াত ছবির বিষয় করেছেন। চিত্রভাষায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রিয় বিষয়সমূহ। এবারের প্রদর্শনীর ক্যানভাসে লাল রঙের আধিক্য খুঁজে পাওয়া যায়। লাল রং ছবির ক্যানভাসে লেপনের সাহস খুব বেশি শিল্পীর মাঝে দেখা যায় না। ফরিদা জামানের ক্যানভাসে গাঢ় লাল থেকে হালকা লালের ব্যবহার আমাদের মনের ভেতরে সাড়া জাগায়। ‘কাপল ইন রিকশা’ বা রিকশায় চড়া দম্পতির মুখোমুখি চেয়ে থাকায় কোনো আকুলতা নেই বরং তাতে একধরনের আর্তি খুঁজে পাই। সুফিয়ার আনন্দঘন মুহূর্তকে বিবৃত করেন শিল্পী সাদা রেখায় গড়া অবয়বে। কাক ও বিড়ালের অবস্থান স্পষ্ট করে প্রকাশ করে সামাজিক অসঙ্গতিকে দেখিয়েছেন শিল্পী। বেশকিছু ক্যানভাসে বিড়ালের গলা অনেক লম্বা করে দেখিয়েছেন। জালের সঙ্গে বিড়ালের উঁচু গলার প্রকাশ সামাজিক মোড়লিপনার প্রতীকী নির্মাণ। শিল্পীর এ ধরনের বিষয়ে সুন্দরের সাথে সামাজিক অসঙ্গতিকে স্পষ্টভাবে তুলে এনেছেন। বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে গত ১৩ জানুয়ারি শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি শেষ হবে ২৬ জানুয়ারি। ফরিদা জামান: ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদ থেকে স্নাতক ডিগ্রি, ১৯৭৮ সালে ভারতের বরোদা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ও ১৯৯৫ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ৭টি একক প্রদর্শনী এবং অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক এবং অঙ্কন ও চিত্রায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।