ক বি তা
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০১৩, ১৭:১৪
শীতার্ত জুতো
শাহাবুদ্দীন নাগরী
দরোজার বাইরে আমি জুতোজোড়া খুলে রেখেছিলাম,
জোছনার সঙ্গে মিলেমিশে শুভ্র কুয়াশা এসে সারারাত
জমা হয়েছিল ওতে, যেন কেউ পরম যত্নে ডিপফ্রিজে
তুলে রেখেছিল আইসক্রিম, হিম বাতাসের ঢেউ এসে
জুতোজোড়ায় এঁটে দিয়েছিল ভেলভেটের ফিতে,
মোমের চকলেট রঙে ব্রাশ করা চামড়ার ওপর
সারারাত গজিয়েছিল প্রজাপতির ডানা, জুতোরা ওড়ে না,
অথচ দরোজা খুলতেই আমার হাজার ডলারে কেনা
ব্র্যান্ডেড জুতোজোড়া উড়ে উড়ে চলে গিয়েছিল
শীতল অরণ্যে, আমি নগ্ন পায়ে বেরিয়ে ছিলাম
ঘর থেকে, তারপর থেকে আমি অপেক্ষা করে আছি,
আমার ভেতরও প্রতিদিন জমা হচ্ছে কুয়াশার গুঁড়ো।
প্রকৃত মাছরাঙা
জাফর আহমদ রাশেদ
কতদিন রাঙা পাখিটি দেখি।
শান্ত স্থির বর্ণিল রাঙা পাখি।
সে থাকে পত্রপল্লবঘন গাছের আরো একটি ঘন পাতা হয়ে,
কিংবা থাকে কোনো মৃত ডালে একমাত্র বর্ণের স্থিরচিত্র হয়ে।
ওর নির্লিপ্ত সৌন্দর্য পেরিয়ে ওর চোখের দিকে তাকানো যায়
কিন্তু বোঝা যায় না ওর গূঢ় বাসনা
এবং যখন সে তার সুপ্তি থেকে জেগে উঠে
একটি সম্পূর্ণ অস্ত্রের মতো
আমাদের ক্ষমতার চেয়ে বিস্ময়কর নিপুণতায়
জলের ভেতরে ডুব দিয়ে তুলে আনে নির্বাচিত মাছ
তখনই সে একটি প্রকৃত মাছরাঙা হয়ে ওঠে।
পৌষের রোদেলা দুপুরে
চৌধুরী ফেরদৌস
কুলা থেকে ধান ঝরে পড়ে—সোনাধান—হলুদিয়া ধান—ঝরে আর ঝরে...পৌষের রোদেলা দুপুরে। ধানের জরিরা ওড়ে ঝিলমিল, ঝিলমিল, ঝিলমিল—বায়ু ভর করে। ঢেঁকির সুরেলা পাড়, ধানের মিঠেল ঘ্রাণ বাইরে ও ঘরে—মেয়েটা দাঁড়িয়ে ছিল ধানের ও-পারে।
মেয়াটা দাঁড়িয়ে ছিল, মেয়েটা দাঁড়িয়ে ছিল... হলুদ বরণ; শ্রাবণমেঘের চুল, হলদে ফিতার ফুল, আঁট করা বেণি—একটি বুকের পরে, অন্যটি পিঠের ও-ধারে। পরনে গ্রামীণ চেক—কোমরে পেঁচানো তার লালপাড়শাড়ি—কটি ঘেঁষে বেণি শেষে গাঁদাফুল নাচে...
বিড়াল পিড়ালি পরে, কুকুর কুণ্ডলী-দেয়া উঠানের রোদে। অদূরে গোয়ালভরা কালো কালো গাই, জাল নিয়ে ব্যস্ত কেউ পুকুরের পাড়ে, মাচানে সবুজ লাউ ঝোলে সারে সারে। মেয়েটার বাহু কাঁপে-কাঁপে... কাঁপে হাত, হাতভরা চুড়ি। ধানের ঝরার তালে নাকের সোনার নথ, কানের ঝুমকাবালা হাসে—রোদের ঝলক লেগে হাসে তার দুপায়ে রুপার মল গোড়ালির পাশে।
মাঠে মাঠে ধান, পথে-ঘাটে ধান—উঠানেও থরে থরে। প্রাণের সোনার ধান—ধানের সোনালি রোদ, ধান-ধান বৃষ্টিরা ঝরে। হাঁস-মুরগি-চড়ুই-কাক... সোনাধান নিয়ে খেলা করে—মেয়েটা দাঁড়িয়ে ছিল ধানের ও-পারে।
মানুষের মন যেন সেলাই মেশিন
সাখাওয়াত টিপু
কেন জগত না জাগিতে জাগিল রাধা
দোনালি লতার ভিতর হাত-পা বাঁধা\
তাধিন তাধিন তাতা
ধিন ধিন দোলে মন
দোলে দেহ কানে কানে
কোন বিরহী পবন
কত দূর হতে দশ হাত তোলা তীর
জড় দুনিয়ার পাশে দুলছে শরীর\
ধিন ধিন তা তা ধিন
বাজে করুণার বীণ
যারে খুশি তারে ছুঁবি
তাতা তাধিন তাধিন
আকাশে মাটির প্রশ্ন—গোরা কেন তুমি
নাকি সে সুশীলা দেহে সুশীল মরমি?
ধিন তা ধিন তা তাতা
যা যা ভগবতে নাই
তারে তুই দেখা দেনা
মাতঙ্গের রোশনাই
সুখ নাই দুখ নাই ভাবের আগেই
দেহ হীন নাচিতেছে জগাই মাধাই\
তেরে কেটে তাক, লাগ
তাধিন তাধিন তাক
কোমরে দুলিছে সখি
বাহারি পাতার বাঁক
এই ঘোর ঘোর নয় বস্তুর অধিক
আঁধার দুচোখ যেন ফর্সা ততোধিক\
তাক তেরে কেটে তাক
নির্বাক ভাষার ছল
কার, দেহ নাকি মন
বল, কে বেশি কোমল
রাতের দুকান ধরে উঠিতেছে দিন
মানুষের মন যেন সেলাই মেশিন\