প্লাস্টিক পণ্যের রফতানি সক্ষমতা কমছে

দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার শতভাগ পূরণ করেও বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক পণ্য বিদেশে রফতানি হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ের নানান সমস্যায় রফতানি আয়ে ভূমিকা রাখা প্রধান পণ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম এ খাতের রফতানি সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে রফতানি আয়ও কমছে আশঙ্কাজনকহারে। অবকাঠামো সুবিধা ও গ্যাস-বিদ্যুত্ সমস্যার সমাধান এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নগদ সহায়তা পেলে এ খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের (২০১২-১৩) প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) প্লাস্টিক পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ চার কোটি ১৪ লাখ ডলার আয় করেছে। যা একই সময়ের জন্য নেয়া লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ২৬ শতাংশ কম। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে বেশি আয় হয়েছিল। ইপিবির তথ্যে দেখা গেছে, ২০০৩-০৪ অর্থবছর থেকে প্লাস্টিক পণ্য রফতানিতে প্রথম বড় সফলতা আসে। ওই সময়ে রফতানি থেকে আয় হয় দুই কোটি ২০ লাখ ডলার। এরপর থেকে রফতানি প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে খাতটি। গত অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয় আট কোটি ৮৬ লাখ ডলার। যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ খাতে রফতানি প্রবৃদ্ধি কমতে শুরু করেছে। প্লাস্টিক পণ্য উত্পাদনের সঙ্গে জড়িত উদ্যোক্তা ও রফতানিকারকরা জানিয়েছেন, রফতানি আয়ের পাশাপাশি জিডিপিতেও বড় ধরনের ভূমিকা রাখা এ খাতের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপ। কিন্তু অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ওই এলাকায় প্লাস্টিক পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় রফতানি কিছুটা কমেছে। তবে আভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যার কারণে উত্পাদন কম হয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, প্লাস্টিক শিল্প পুরোটাই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানাগুলোর সামর্থ্য অনুযায়ী উত্পাদন করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিপিজিএমইএ) সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, সম্ভাবনাময় এ খাতের উন্নয়নে সরকারের নজরদারি বাড়ানো দরকার। এজন্য প্রয়োজনীয় নীতি- সহায়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ননবন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলোর জন্য ১৫ শতাংশ নগদ সহায়তা প্রয়োজনীয়তার কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসা হচ্ছে। গ্যাস-বিদ্যুত্ সমস্যার সমাধান ও ঢাকার নিকটবর্তী সিরাজদিখান উপজেলায় প্লাস্টিক শিল্প পার্ক স্থাপিত হলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখতে সক্ষম বলে তিনি মনে করেন। প্লাস্টিক পণ্যের জন্য নতুন বাজার খোঁজা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ শিল্পের জন্য উপযুক্ত লোক তৈরিও এখন সময়ে দাবি। যুক্তরাষ্ট্র যদি জিএসপি সুবিধা উঠিয়ে নেয় তাহলে এ শিল্পের জন্য আরেকটি সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা তার। বিপিজিএমই থেকে জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ পনের হাজার কোটি টাকার প্লাস্টিক পণ্য (ওভেন খাতসহ) উত্পাদন ও বিপণন হচ্ছে। এ খাত থেকে প্রতি বছর সরকার পাচ্ছে আনুমানিক প্রায় এক হাজার ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব। প্লাস্টিকের তৈরি প্রচ্ছন্ন রফতানি (মূলত তৈরি পোশাক পণ্যের অনুষঙ্গ হিসেবে রফতানি হওয়া প্লাস্টিক পণ্য) পণ্যের পরিমাণ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। বিপিজিএমইএ সাবেক সভাপতি সামিম আহমেদ জানান, দেশের পোশাক খাতের প্যাকেজিংসহ সব ধরনের উপকরণের শতভাগই দেশীয় উত্পাদকেরা মেটাচ্ছেন। পরিবেশ বিপর্যয়কারী হিসেবে প্লাস্টিককে দোষারোপ করা হলেও বর্তমানে তা পরিবেশের পক্ষে সহায়ক বলে দাবি করছেন উত্পাদকরা। তারা বলছেন, প্লাস্টিক পণ্য উত্পাদনের ফলে যে পরিমাণ বর্জ্য সৃষ্টি হয় তার প্রায় ৬০ শতাংশই এখন পুনর্ব্যবহার (রিসাইকেল) করা সম্ভব হচ্ছে। এতে পরিবেশের ক্ষতি রোধে ভূমিকা রাখা যাচ্ছে। বিপিজিএমইএর তথ্য মতে, বর্তমানে দেশে পাঁচ হাজার ৫২টি প্লাস্টিক পণ্য উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে তিন হাজার ৫০০টি ছোট, মাঝারি এক হাজার ৫০০টি ও বড় মাপের ৫২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর মধ্যে শতভাগ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪০০টি প্রচ্ছন্ন রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের, ২০টি সরাসরি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ও উভয় রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০টি। প্লাস্টিক পণ্য উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শতকরা ৬৫ ভাগই ঢাকায় অবস্থিত। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ২০ শতাংশ, নারায়ণগঞ্জে ১০ শতাংশ ও বাকিগুলো খুলনা, কুমিল্লা, বগুড়া ও রাজশাহীতে অবস্থিত। এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ২০ লাখ মানুষ জড়িত। ইপিবি সূত্র ও প্লাস্টিক শিল্প রফতানিকারকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে বিশ্বের ২৩টি দেশে প্লাস্টিক পণ্য রফতানি হয়। এর মধ্যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, কানাডা ও মালয়েশিয়ায় সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক পণ্য রফতানি হয়। এসবের বাইরে সার্কভুক্ত দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালেও প্লাস্টিক পণ্য রফতানি হয়। প্লাস্টিকের তৈরি পণ্যের মধ্যে পোশাক খাতের জন্য পলিব্যাগ, শপিংব্যাগ, আবর্জনা ফেলার ব্যাগ, মাংসের ব্যাগ, শিল্পায়নে ব্যবহূত ফিল্মস, পিভিসি পাইপ, পলিথিন শিট, হ্যাঙ্গার, হ্যান্ড গ্লাভস, দড়ি, প্লাস্টিক ওয়াস্ট, খেলনা, ইলেকট্রনিক সুইচ, পলিস্টার থ্রেড, কম্পিউটার এক্সেসরিজ, অডিও/ভিডিও ক্যাসেট, বলপেন, কৃত্রিম ফুল প্রভৃতি দ্রব্য দেশ থেকে রফতানি হয়। এছাড়া গৃহসামগ্রী, টেবিলওয়্যার ও রান্নাঘরে ব্যবহূত দ্রব্য বেশি রফতানি হয়। কাল শেষ হচ্ছে মেলা: এদিকে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে চলছে অষ্টম আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক পণ্যের মেলা। এ মেলা শেষ হবে আগামীকাল। এবারের মেলায় মেশিনারীজ, মোল্ড, কাঁচামাল উত্পাদনকারী ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানসহ দেশে ব্যবহূত বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পণ্য উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। দেশীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ১৫টি দেশ থেকে আসা প্রতিষ্ঠানগুলো ৩৫০টির মত স্টলে তাদের নতুন নতুন পণ্যের পসরা সাজিয়েছে।