‘বেঁটে’ ইরফানের লক্ষ্য পাকিস্তানকে আরো উপরে তোলা

পাকিস্তানের সাত ফুট এক ইঞ্চি লম্বা দীর্ঘদেহী ফাস্ট বোলার মোহাম্মদ ইরফান নিজের পায়ের মাপ মতো বোলিং সু নিয়ে এবং আরাম করে বিছানায় ঘুমোতে প্রায়ই সমস্যায় পড়ে যান। তবে ক্রিকেট মাঠে নতুন বল হাতে দারুণ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন ৩০ বছর বয়সী সাবেক শ্রমিক ইরফান। খেলাটিতে তিনি উচ্চতার সঙ্গে নিজের বুদ্ধিমত্তা, পেস ও বাউন্স দিয়ে বিশ্বের অনেক ব্যাটসম্যানকেই সমস্যায় ফেলতে পারেন। তিনটির বেশি উইকেট শিকার করতে না পারলেও ইরফান হলেন গত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে পাকিস্তানের ভারত সফরের ‘বিস্ময়কর আবিষ্কার’ ইরফান। পাকিস্তানের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক মোহাম্মদ হাফিজ বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘মজা করে আমরা তাকে বেঁটে মানুষ বলে ডাকি। আমরা জানতাম সে হবে আমাদের বিস্ময় জাগানিয়া উন্মোচন। দৃঢ়তা ও কঠোর পরিশ্রমের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সে অনেক দূর যেতে সক্ষম হবে।’ অতীতে তার উচ্চতা ৬.র্৮র্ -৬.১র্০র্ ধরা হতো। কিন্তু কর্মকর্তারা এখন তাকে সাত ফুট এক ইঞ্চি উচ্চতার স্বীকৃতি দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এ পর্যন্ত সবচেয়ে লম্বা ক্রিকেটার ইরফান এএফপিকে বলেন, ‘২০১০ সালে ভিসার জন্য আবেদন করা হলে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে আমার উচ্চতা মাপা হয়।’ ইরফানের পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬.র্৮র্ লম্বা দুই খেলোয়াড় হলেন—ওয়েস্ট ইন্ডিজের জোয়েল গার্নার এবং অস্ট্রেরিয়ার ব্রুস রেইড। তার জানামতে ইংলিশ কাউন্টি ক্রিকেটার অ্যান্টনি আলম, পল ডানকেলস এবং উইল জেফারসন সকলেই ৬.১০ ইঞ্চির। এই উচ্চতা অবশ্য ইরফানের জন্য কোন বাড়তি সুযোগ নয়। মধ্য পাঞ্জারের গাগু মান্দি গ্রামে এক কৃষকের ঘরে জন্ম ইরফানের। তার পাঁচ ভাইয়ের সকলেই ৬ ফুটের বেশি লম্বা হলেও তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চতা বাড়েনি তার। নিজ অতীত স্মরণ করে ইরফান বলেন, ‘আমি যখন অষ্টম শ্রেণীতে পাড়ি সেসময় থেকে আমার উচ্চতা বাড়া শুরু হয়। স্কুল বাসে আমি ঠিকমত বসতে পারতাম না। কয়েক দিন পরপরই আমার পোশাক ছোট হয়ে যেত এবং আমার উচ্চতা নিয়ে লোকজন মজা করা শুরু করল।’ তার পিতাও ছিলেন ৬ ফুট ৯ ইঞ্চি লম্বা। ইরফানকে শান্ত থাকার পরামর্শ দিতেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি অষ্টম শ্রেণি পড়ার সময়ই এত লম্বা হওয়ার কারণে আমার স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা আমাকে নিয়ে বিদ্রূপ করত। আমার বন্ধুর গাড়িতে বিশেষ আসনে বসে আমি স্কুলে আসতাম।’ একজন বন্ধুর কাছ থেকে বর্তমানে ব্রিটিশ ১৫ সাইজের জুতা পাচ্ছেন উল্লে¬খ করে তিনি বলেন, ‘ঠিকমত ঘুমাতে আমি দু’টি বিছানা যুক্ত করে নিতাম। এরপর যখন ক্রিকেট খেলতে চাইলাম তখন আমার পায়ের সঠিক মাপ মতো জুতো পেতাম না।’ একই গ্রামের মোহাম্মদ জাহিদকে রোল মডেল হিসেবে মনে করে বড় হয়েছেন তিনি। পিঠে ইনজুরির কারণে দীর্ঘদিন খেলতে না পারা জাহিদ ১৯৯৬ সালে অভিষেক টেস্টে ১১ উইকেট নিয়েছিলেন। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে হতাশ ইরফান ২০০০ সালে স্থানীয় একটি পাইপ কোম্পানিতে চাকরি নেন। সে সময়ের কথা স্মরণ করে ইরফান বলেন, ‘ওই দিনগুলো আমার জন্য খুবই কঠিন ছিল। আমি চেয়েছিলাম ক্রিকেট খেলতে কিন্তু সপ্তাহে মাত্র তিন ডলারের বিনিময়ে কাজ করতে বাধ্য হলাম এবং ভবিষ্যত্ও ভাল ছিল না।’ এরপর হঠাত্ করেই ভাগ্য খুলে গেল ইরফানের। সাবেক ক্রিকেটার নাদিম ইকবাল একটি ক্লাবে তাকে আবিষ্কার করার পর আকিব জাভেদ ও আমির সোহেলের নেতৃত্বে প্রশিক্ষণের জন্য পাকিস্তানের ন্যাশনাল ক্রিকেট একাডেমীতে পাঠান তাকে। এ সুযোগকে কাজে লাগান ইরফান। খান রিসার্চ ল্যাবরেটরি ২০০৯ সালে দলে ভেড়ায় তাকে। এই প্রতিষ্ঠানটি গড়েছেন পাকিস্তানের পরমাণু বোমার জনক বিজ্ঞানি কাদির খান। ক্লাবটির হয়ে দ্বিতীয় ম্যাচেই ৯ উইকেট শিকার করে তারকা বনে যান ইরফান। খান রিসার্চের ম্যানেজার রশিদ ইকবাল বলেন, ‘ইরফান খুবই আদর্শবান ছিল। এ পর্যন্ত আসতে অনেক কঠোর পরিশ্রম করেছে সে।’ খান রিসার্চে থাকাকালীন পাকিস্তান ওয়ানডে দলে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ পান তিনি। কিন্তু দুই ম্যাচে কোন উইকেট না পাওয়ায় তার খেলোয়াড়ী জীবন প্রশ্নের মুখে পড়ে। কিন্তু গত মাসে পাকিস্তানের ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তার খেলা দেখে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন জাতীয় দলের কোচ ডেভ হোয়াটমোর। এরপর ভারতের বিরুদ্ধে সিরিজের জন্য দলে সুযোগ পাওয়া ইরফান বলেন, ‘আমি উত্সাহ হারাইনি এবং কঠোর পরিশ্রম করে চললাম।’ ভারত সফর থেকে এসে এখন তিনি টেস্ট ক্রিকেটের শীর্ষ দল দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানদের ঝামেলায় ফেলতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। উচ্চতাই সব কিছু নয় এমনটা প্রমাণ করাই লক্ষ্য ইরফানের। বাসস/এএফপি