সমাবর্তন বক্তৃতা

প্রকৃত শিক্ষা অর্জন

এ্যাডরিনি রিচ একাধারে কবি, সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক এবং নারীর অধিকার আদায়ের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। মূলত কবি হিসেবে পরিচিত এই মার্কিনী আশির দশকে ডগলাস কলেজের সমাবর্তন বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত হন। তিনি সেই বক্তৃতায় নারীর শিক্ষার গুরুত্বের উপর আলোকপাত করেন আমার আজকের এই বক্তৃতার মূল ভাষ্যকে আমি দুই ভাগে বিভক্ত করেছি; যার একটি ছাত্রীদের জন্য এবং অপরটি যারা মেয়েদের কলেজে পড়ান তাদের জন্য। কিন্তু এই দুটি অংশ একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার অর্থই হলো ক্লাসে অবস্থান, ক্রেডিট ঘণ্টা, পরীক্ষা এবং ক্লাসের বাইরেও বাস্তব জীবনের নৈতিক শিক্ষা অর্জন এবং তা শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মিলিত প্রয়াসের ফসল। আমি আশা করবো বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়েছো বা পড়তে এসেছো তাদের মূল লক্ষ্য শুধু একটি সনদ গ্রহণেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং বিশ্ব মানের জ্ঞান অর্জনই তোমাদের মূল লক্ষ্য ছিল। শিক্ষা অর্জনে নারীরা অনেক এগিয়ে এসেছে। কিন্তু একটি ঘাটতি এখনো আমার চোখে পড়ে; বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আজো নারীরা উপরের স্তরে দায়িত্ব পালনে পুরুষের তুলনায় বেশ পিছিয়ে আছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আজ তোমরা যা পড়ছো এবং বড়ো মাপে বিচার করলে যে জ্ঞান অর্জন করছো তার অধিকাংশই পুরুষের দ্বারা রচিত যা পুরোপুরিভাবে নারীদের অবস্থার বয়ান করতে পারে না। বস্তুত, তোমরা যখন ‘বড়ো ইস্যু’, ‘পশ্চিমা চিন্তাধারা’ নিয়ে পড়াশুনা করবে, তখন পুরুষের বিশেষ করে সাদা পুরুষদেরকে নিয়েই পড়বে। কিন্তু গত কয়েক দশকে নারীদের মাঝে শিক্ষার হার বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীরা নতুন নতুন বিভিন্ন ‘ইনটেলেকচুয়াল গ্রুপ’গুলোর সাথে যুক্ত হচ্ছে, বাস্তব জগতের সাথে মিশে জ্ঞানের সম্মিলন ঘটাচ্ছে। ডগলাসের একজন ছাত্রী যখন পরিপূর্ণ জ্ঞান করতে চাইবে তখন তাকে কোর্সগুলোর পাশাপাশি বাস্তব জগতের সাথে পুঁথিগত বিদ্যার সম্মিলন ঘটাতে হবে। যা তোমাদেরকে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে তা মোকাবিলা করতে উত্সাহিত এবং সাহায্য করবে। আমাদের সমাজে নারীদেরকে মূলত ঘর-সংসারের কাজে বেশি মনোযোগ দিতে শেখানো হয় যা স্বাবলম্বী হওয়ার প্রধান অন্তরায়। আজো ইনটেলেকচুয়াল কাজকর্মের থেকে গৃহিণী হিসেবে নারীদের সমাদর বেশি। স্বাবলম্বী হওয়ার অর্থ হলো নিজের মেধার বিকাশ এবং তা ব্যবহার করে সামনের দিকে এগিয়ে চলা, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারা, নিজের সিদ্ধান্তমতে বিয়ে করার অধিকার অর্জন করা, সন্তান নেয়ার ক্ষেত্রে নিজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। এক কথায় জীবনের যাবতীয় কাজ নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী করতে পারা। এর অর্থ নিজের জীবনকে নিজের ইচ্ছামতো ভিন্নভাবে যাপন করার অধিকার অর্জন করা যা অন্যদের চাহিদার সাথে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়ার পরিপন্থী। বরং নিজের চাহিদা মোতাবেক কাজ করা। আজ সারা বিশ্বে নারীরা এই অধিকার আদায় করেছে বা করছে। এটা ভালো এবং সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এবার আসি আমার বক্তব্যের দ্বিতীয় অংশে। নারীদের শিক্ষা সম্পর্কে গত কয়েক শতাব্দী ধরে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান সময়ে এসে এই বিতর্ক আর চলে না। কিন্তু আজো ডগলাসের মতো নারীদের কলেজে শিক্ষকতা করাকে অনেক পুরুষ অধ্যাপক এটাকে দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরি হিসেবে দেখেন! অনেক নারী এবং পুরুষ শিক্ষক পুরুষতান্ত্রিক এবং কেন্দ্রীক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নেয়াতে তাদের চিন্তাধারাও পুরুষতান্ত্রিক। খোলামেলাভাবে বলতে গেলে আমরা পরিষ্কার চিন্তাধারা, কার্যকর আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত, সুন্দর লেখালেখির জন্য মানসিক স্বাধীনতা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছি। কিন্তু এটাই আমাদের জন্য সব থেকে জরুরি বিষয়। আমি আগেই বলেছি অধ্যয়নরত অবস্থায় ছাত্রীদেরকে আরো গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। এতে তারা সমাজে আরো বেশি অবদান রাখতে সক্ষম হবে। শিক্ষকদেরকে ছাত্রীদের সাথে আরো নিবিড়ভাবে মিশতে হবে যাতে তারা ছাত্রাবস্থায় নিজেদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ধারণ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু এর জন্য সর্বপ্রথম জরুরি বিষয়টি হলো— শিক্ষককে এটা অনুধাবন এবং বিশ্বাস করতে হবে যে নারীদের চিন্তাধারা সমাজের পরিবর্তন আনতে সক্ষম, নারীরা সমাজে পরিবর্তন আনতে পারে। যদি আমাদের সমাজের শিক্ষক সমাজ এই দিকটি মেনে চলেন তাহলে সম্ভব হবে নারী-পুরুষের মিলিত প্রয়াসে বিশ্বকে নতুনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এটা আমাদের সম্মিলিত প্রতিজ্ঞা— অনাগত কোনো নারী প্রতিভাকে অবহেলা করা হবে না।