পুঁজিবাজারের চাহিদা বিবেচনায় রাখিয়া আইপিও অনুমোদন করা উচিত
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩২
যেকোন দেশের পুঁজিবাজার একটি স্পর্শকাতর বাজার। এই বাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বাজার। সেইজন্য এই বাজার কিংবা এই বাজারের কোন আইটেম সম্পর্কে তথ্য প্রদানকালে এইসব তথ্যকে ‘দাম সংবেদনশীল তথ্য’ হিসাবে অভিহিত করা হয়। তথ্যের কোন বিভ্রান্তি তৈরি হইলে তাহা অবশ্যই সংশোধন করা হয় বা সংশোধন করা যায় পরবর্তীতে। কিন্তু এই বাজারের ক্ষেত্রে তথ্য বিভ্রান্তি সংশোধনের আগেই সংশ্লিষ্ট কেহ কেহ লাভবান এবং কেহ কেহ ক্ষতিগ্রস্ত হইয়া যান তথ্য বিভ্রান্তির কারণে। সেই কারণেই এই বাজার সম্পর্কে মন্তব্য করিবার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সদা সতর্ক থাকিতে হয়। সেই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অন্যতম হইলেন একটি দেশের অর্থমন্ত্রী। কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়া মন্তব্যের ক্ষেত্রে আমাদের অর্থমন্ত্রীকে কখনোই খুব একটা সতর্ক মনে হয় না। সেইজন্য মাঝেমধ্যেই তিনি অতি সংবেদনশীল মন্তব্য করিয়া ফেলেন। একটি পর্যায়ে তিনি এই বাজার নিয়া মন্তব্য হইতে নিজেকে বিরত রাখিবেন বলিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতি তিনি রাখিতে পারিতেছেন বলিয়া মনে হইতেছে না।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী সাহেব পুঁজিবাজারকে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি ‘ইম্পর্টেন্ট প্লেয়ার’ হিসাবে অভিহিত করিয়াছেন। নিঃসন্দেহে এই মন্তব্য খুবই ইতিবাচক, যদিও পূর্বে একাধিকবার তিনি এই বাজার সম্পর্কে অনেক নেতিবাচক মন্তব্য করিয়াছিলেন এবং যাহার প্রেক্ষিতে বাজারের সূচকের দ্রুত পতন হইয়াছিল। ভয় এইখানেই যে, তিনি আবার কখন কোন নেতিবাচক মন্তব্য করিয়া ফেলেন। তিনি ব্যবসায়ীদের এই বাজার হইতে পুঁজি সংগ্রহের পরামর্শ দিয়াছেন। তাহার অন্তর্নিহিত বার্তা হইলো তিনি ব্যবসায়ীদের প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও)-এর মাধ্যমে এই বাজার হইতে পুঁজি সংগ্রহ করিতে বলিয়াছেন। কিন্তু বর্তমানে বাজার যে অবস্থায় আছে তাহাতে এই বাজার হইতে আইপিওর মাধ্যমে পুঁজি সংগ্রহের পরামর্শ যৌক্তিক নয়। একটি নূতন আইপিও বাজারে আসার অর্থ হইলো বাজারে শেয়ারের সরবরাহ বাড়িয়া যাওয়া। বর্তমানে চাহিদার বিপরীতে পুঁজিবাজারে রহিয়াছে শেয়ারের এক বিশাল সরবরাহ। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে যেখানে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা তাহা বর্তমানে নামিয়া আসিয়াছে প্রায় একশ কোটি টাকার ঘরে। অথচ সেই সময়ের তুলনায় বাজারে শেয়ারের পরিমাণ প্রায় দেড় হইতে দুই গুণ। নূতন নূতন আইপিও, রাইট শেয়ার, স্টক ডিভিডেন্ড ইত্যাদির কারণে বাজারে শেয়ারের সরবরাহে আসিয়াছে এক বিরাট উল্লম্ফন। ফলে বিশাল সরবরাহের বিপরীতে অতি ক্ষুদ্র চাহিদার এই বাজারে সূচকের পতনের মূল কারণ হিসাবে দেখা দিয়াছে। তাই সরবরাহ বাড়ানোর যেকোন নীতি বাজারের জন্য ক্ষতিকারক এই মুহূর্তে। কেহ কেহ বলিতে পারেন, বাজারে নূতন নূতন ভাল শেয়ারের আগমন ঘটিলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়া আসিবে এই মার্কেটের ব্যাপারে। কিন্তু বাজারের লিস্টেড কোম্পানির শেয়ার মূল্যের দিকে তাকাইলে দেখা যায়, খারাপ শেয়ারের দাম তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। ফলে ভাল শেয়ারের অভাবে বিনিয়োগকারীরা খারাপ শেয়ার কিনিতেছে তাহা বলা যায় না।
অতএব, এই মুহূর্তে সরবরাহ বৃদ্ধিকারক কোন পলিসি হইতে নীতি-নির্ধারকরা দূরে থাকিবেন তাহাই প্রত্যাশিত। অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটি কিন্তু বেশিমাত্রায় আইপিও অনুমোদনের ফলে পুঁজিবাজারে বিরূপ প্রভাব পড়িতেছে বলিয়া মনে করিতেছে। এই কমিটি বাজারের চাহিদা বিবেচনায় রাখিয়া আইপিও অনুমোদনের জন্য বিএসইসিকে পরামর্শ দিয়াছেন। অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটি এই মুহূতের্র বাস্তবতা বিবেচনার প্রেক্ষিতে সঠিক পরামর্শ দিয়াছেন। এখন বিএসইসি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়েরও এই বিবেচনা মাথায় রাখিয়া পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারণ করা উচিত।