শাস্তি না হলে সতর্কতা জোরদার হবে না
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৫
পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি না দিলে ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। গত শনিবার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত পোশাক শিল্প শ্রমিকের কর্মকালীন নিরাপত্তা ঝুঁকি; কারণ ও করণীয় শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা বলেন, তাজরীন ফ্যাশনের অগ্নিকাণ্ডের মতো অনেক ঘটনা এ পর্যন্ত ঘটেছে কিন্তু কোন ক্ষেত্রেই দায়ী ব্যক্তিদের উপযুক্ত শাস্তি হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত রিপোর্টও প্রকাশ করা হয়নি। তাই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। বক্তারা বলেন, দোষীদের শাস্তি না দিলে মালিকরা সতর্ক হবেন না বিধায় দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। তাই তাজরীনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তারা।
সেমিনারে সিপিডির গবেষণা সহযোগী ফারজানা সেহরীন ও কিশোর কুমার বসাকের সহায়তায় প্রস্তুত নিবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ইসরাফিল আলম, বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, পোশাক উত্পাদনকারী ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি পারভেজ আলম চৌধুরী, বিজিএমইএ সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরীসহ শ্রমিকনেতা ও গার্মেন্টস মালিকরা।
ইসরাফিল আলম এমপি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গার্মেন্টস মালিক, সরকার ও বিজিএমইএ কেউই দায় এড়াতে পারেন না। অথচ বিজিএমইএ’র তদন্ত প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রীর কথামত নাশকতার কথা বলা হলো। বিজিএমইএ উদ্দেশ্যমূলকভাবে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে করে তাজরীনের মালিককে রক্ষা করা হয়েছে। যে সময়ে সরকার তদন্ত করছে সে সময়ে এ ধরনের তদন্ত সরকারি তদন্তকে প্রভাবিত করবে। তিনি বলেন, বিজিএমইএ সবসময় মালিকদের বাঁচানোর চেষ্টা করে। তারা চিন্তা করে কিভাবে কারখানার কর কমিয়ে মুনাফা বাড়ানো যাবে। তারা শ্রমিকদের রক্ষায় বা শ্রমিকদের উন্নয়নের কথা চিন্তা করে না। তাজরীনের ঘটনায় কোনভাবেই মালিকের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই উল্লেখ করে ইসরাফিল আলম বলেন, বিজিএমইএ’র তদন্তে কিভাবে মালিককে দায়মুক্ত করা হলো তার জবাবদিহি করতে হবে। তিনি বিজিএমইএ’র তদন্ত প্রতিবেদনকে একপেশে ও মালিককে বাঁচাতে করা হয়েছে বলে দাবি করেন।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, কিছুদিন পর পর পোশাক কারখানায় দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রায় একই ধরনের কারণে বার বার এসব দুর্ঘটনা ঘটলেও মালিকরা সতর্ক হচ্ছেন না। তাই প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। যেন মালিকপক্ষের বা সরকারের অবহেলায় এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাজরীনে অগ্নিকাণ্ডের পরই প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনাকে নাশকতা ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে উল্লেখ করেন। এতেই স্পষ্ট হচ্ছে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত রিপোর্ট কি আসতে পারে। কারণ প্রধানমন্ত্রীর কথার বাইরে প্রতিবেদন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তদন্তের আগেই সরকারের এ ধরনের মন্তব্য মূল কাজকে ব্যাহত করছে। তাজরীনের ঘটনায় নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নজরুল ইসলাম খান বলেন, আজকের যুগে একটি দুর্ঘটনায় কতজন নিহত হলেন সে সংখ্যা পাওয়া যাবে না, এটা হতে পারে না।
সভাপতির বক্তব্যে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, দেশের পোশাক শিল্প বিভিন্ন ধরনের সঙ্কট পেরিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে। বর্তমানে কারখানার কমপ্লায়েন্স ঠিক রেখে কাজ চালানো বড় চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় আর্থ-বাণিজ্যিক উন্নতির সাথে তাল মিলিয়ে শ্রমিকদেরও উন্নতি করতে হবে। বিভিন্ন সময়ে পোশাক কারখানায় দুর্ঘটনার পেছনে দুইটি কারণ চিহ্নিত করে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, প্রথমত, কারখানার অব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক দুর্বলতা তথা অগ্নিনির্বাপক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অদক্ষতার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দোষীদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসার পাশাপাশি প্রশাসনিক উন্নতি ঘটাতে হবে। এছাড়া শ্রমিক ইউনিয়নের সুযোগ দেয়া ও বীমা ব্যবস্থার প্রসার ঘটাতে হবে।
সেমিনারে তাজরীনের ঘটনায় থেকে বেঁচে যাওয়া মাহে আলম ও দীপা আক্তার সেদিনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এসময় শ্রমিক নেতারা তাজরীনের ঘটনায় মালিককে দায়ী করেন। শ্রমিক নেতারা বলেন, শ্রমিকরা কোন ধরনের আন্দোলন করতে গেলেই তাদেরকে হামলা মামলার শিকার হতে হয়। অথচ একশ জনেরও বেশি শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় তাজরীনের মালিককে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়নি, এটা দুঃখজনক।