সংসদ নির্বাচন হবে এই সরকারের অধীনেই
সালেহউদ্দিন ও সাইদুর রহমান
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:২২
বর্তমান সরকারের অধীনেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি যদি ওই নির্বাচন বর্জন করে তাহলেও সরকার তার অবস্থান থেকে একচুলও নড়বে না। সরকারের নীতি নির্ধারক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সরকারের এই অনড় অবস্থানের শক্তির উত্স কি তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা বিশ্লেষণ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, সেই শক্তির উত্সাহে ও সমর্থনে নির্ধারিত এজেন্ডাগুলো বাস্তবায়নে কোনো দ্বিধা করছে না সরকার। তারা মনে করেন, ওই শক্তির সমর্থনেই সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে সরকার। এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ইত্তেফাককে বলেন, আওয়ামী লীগ-বিএনপির ক্ষমতার লড়াই বিদেশি শক্তিগুলোকে ডেকে আনছে। অনেক কষ্টের বিনিময় বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও আজ সেই স্বাধীনতা হারিয়ে গেছে। আরেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বন্দ্বের কারণেই বৈদেশিক শক্তি সুযোগ নিয়ে থাকে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আড়াই বছর ধরে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট রাজপথে হরতাল-অবরোধসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে। বিএনপি থেকে বারবারই সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে, বর্তমান সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনেই তারা অংশ নেবে না। সরকার এক তরফাভাবে সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করলে তা প্রতিহত করা হবে। স্বয়ং বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এ ধরনের ঘোষণা দিয়েই যাচ্ছেন। অন্যদিকে বর্তমান সংবিধানের আওতায় নির্বাচন আয়োজনে অনড় রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তাদের ভাষায়, আদালত কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে কোনোভাবেই আর ফিরিয়ে আনা হবে না। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন, এই সরকারের অধীনেই আগামী জানুয়ারির মধ্যে দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং এই নির্বাচনে আসতে বাধ্য হবে বিএনপি। দুই দলের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে ১৮ দলীয় জোট আন্দোলন তীব্র করার দিকে ব্যস্ত রয়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় প্রতি সপ্তাহে বিভিন্ন জেলায় জনসভার কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে পশ্চিমা দেশগুলো নানাভাবে তাদের মনোভাব প্রকাশ করছে। তাদের প্রত্যাশা সকলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। পশ্চিমা দেশগুলোর মনোভাবের বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে আঞ্চলিক শক্তির একটি দেশের। তারা মনে করে, বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ। সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুযায়ী নির্বাচন হলে তাদের আপত্তি থাকবে না বলেও জানা গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক মনে করেন, ‘প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনে না আসলে নির্বাচন করিয়ে নেয়ার যে চিন্তা- তার জন্য কোনো একটি শক্তির সহানুভূতি ও সমর্থন প্রয়োজন। বর্তমান সরকারের সাথে হয়তো এমন কোনো শক্তি আছে যার সাহসে তারা বলিয়ান। ওই অধ্যাপক বলেন, একটি কথা মনে রাখতে হবে, বিগত চারদলীয় জোট সরকার আওয়ামী লীগসহ দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করেছিল; কিন্তু ওই আঞ্চলিক শক্তিসহ পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন না পাওয়ার কারণে সে নির্বাচন ভণ্ডুল হয়ে যায়। তারপর বিএনপির কি পরিণতি হয়েছিল, তা কারোরই অজানা নয়। এর আগেও ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচন করেছিল বিএনপি; কিন্তু মাত্র ১৫ দিনের মাথায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান পাস করে ক্ষমতা থেকে তাদেরকে বিদায় নিতে হয়েছিল। ৯৬ সালে শুধু ক্ষমতা হারালেও ভোগান্তিতে পড়তে হয় নি বিএনপিকে; কিন্তু ২০০৭ সালে বিএনপির শীর্ষ নেত্রীসহ বড় সব নেতাকেই জেল-জুলুম ভোগ করতে হয়েছিল। দেশ ছাড়তেও বাধ্য হন কেউ কেউ। ওই অধ্যাপক বলেন, একতরফা নির্বাচন আয়োজন করলে কি পরিণতি ভোগ করতে হয়, বর্তমান সরকার তা ভালো করেই জানে। তারা এটিও ভালো করে জানে, বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপিকে নিয়ে আসা খুবই কঠিন হবে। যদিও অনেকের সমর্থনে পর্দার অন্তরালে চলছে নানা খেলা। অচিরেই এসব খেলার ফল দেশের মানুষ দেখতে পারবে। একতরফা নির্বাচনে গঠিত কোনো সংসদই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারে নি। একই ধরনের আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন জাতীয় পার্টির (এ) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। গত শনিবার এরশাদ সাংবাদিকদের বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে না এলে দেশে আবারো ওয়ান ইলভেনের মতো পরিস্থিতি হতে পারে। তিনি বলেন, বিএনপি নির্বাচনে না এলে হয়তো নির্বাচন হবে; কিন্তু সেই নির্বাচিত সরকার কত দিন ক্ষমতায় থাকতে পারবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাবে।
রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের এ ধরনের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও সরকার তার অধীনে আগামী নির্বাচন আয়োজনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এসব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সরকারের সাথে এমন কোনো শক্তি আছে, যে শক্তির কারণেই সরকার এমনটি ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকরা হয়তো মনে করেন, যে কোনো মূল্যে তারা একটি নির্বাচন আয়োজন করতে পারবেন। সে নির্বাচনে বিএনপির আসা না আসার বিষয়টি তারা এ মুহূর্তে পরোয়া করছেন না।
এসব বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনের মূল আলোচ্য বিষয় হলো— আগামী নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হতে যাচ্ছে। বিরোধী দলের ধারণা তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া নির্বাচন হলে তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে না। অন্যদিকে সরকারি দল মনে করছে, তাদের অধীনে নির্বাচন না হলে তারাও ক্ষমতায় আসতে পারবে না। ক্ষমতার লড়াইকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে দেশের রাজনীতি। ক্ষমতায় যাওয়াটাই আসলে দুই দল বা তাদের জোটের মূল উদ্দেশ্যে। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলো মরিয়া হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ-বিএনপি ক্ষমতার লড়াইয়ে টিকে থাকতে বিদেশি শক্তিগুলোকেও ডেকে আনছে। বৈঠক করছেন বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে। কেউ কেউ এদেশ-ওদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অধ্যাপক আবুল কাসেম বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতির ৯০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করতো আমেরিকা। আর ৬ থেকে ৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ ছিল ভারতের। ক্ষুদ্রাংশ আছে আমাদের রাজনীতিবিদদের কাছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ও তাদের জোট আমেরিকা ও ভারত ঘরনার। আর বিএনপি এবং তার সমমনা জোট আমেরিকা ঘরনার। তবে বিএনপি গত এক বছর ভারতের সমর্থন লাভের চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, আমেরিকা বাংলাদেশ থেকে কখনো তাদের নজর তুলে নেবে না। ভৌগোলিকভাবে আমেরিকার কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব অনেক বেশি। সামরিকভাবে আমেরিকা ভারতকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তবে আমেরিকা পুরোপুরি ভারতকে বিশ্বাস করে বলেও মনে হয় না। ভারতও তাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি সমর্থন করছে।
তিনি বলেন, পশ্চিমা এবং প্রতিবেশি শক্তি কোনোটিই আমাদের জন্য শুভ নয়। অনেক কষ্টে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও আজ সেই স্বাধীনতা হারিয়ে গেছে। অসুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থেকে মুক্তি পেতে জনগণের উচিত হবে সমাজের ভিতর থেকে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, সারাবিশ্বে আমেরিকা খোলামেলাভাবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে। কোনো দেশের গণতন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার উপক্রম হলে কৈফিয়ত চায় আমেরিক। তারা সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন চায়। অন্যদিকে বিরোধী দলীয় নেত্রীর ভারত সফরের পর তারা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। পত্র-পত্রিকায় দেখছে রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা আছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বন্দ্বের কারণে সুযোগ নিয়ে থাকে বিদেশিরা।
তিনি বলেন, সরকার মনে করছে তাদের হাতে পুলিশসহ সেনাবাহিনী, আমলারা রয়েছে। নির্বাচনে তাদের ব্যবহার করা যাবে। এই কারণেই তারা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিষয়ে বেশ সক্রিয়। অন্যদিকে বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। তবে তারা যদি রাজপথে বড় আন্দোলন-সংগ্রাম করতে পারে সেক্ষেত্রে হয়তো সরকার একটা সমঝোতায় আসতে পারে।