সংসদীয় দলের সভায় শেখ হাসিনা
সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিন
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:২৪
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি আবারো নাকচ করে দিলেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য দলের সংসদ সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছেন। গতকাল রবিবার রাতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশ দেন। জাতীয় সংসদের সরকারি দলের সভাকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বব্যাংক দ্রুত সিদ্ধান্ত না জানালে নিজস্ব উদ্যোগেই পদ্মা সেতু নির্মাণের দৃঢ় ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসময় বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে পদ্মা সেতুর বিকল্প নকশা প্রণয়নের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক বিভাগকে বলা হয়েছে।
প্রায় সোয়া দু’ঘন্টার এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী আগামী নির্বাচন কেমন এবং কোন পদ্ধতিতে হবে তা দলের সংসদ সদস্যদের কাছে পরিষ্কার করেন। সূত্র জানায়, বৈঠকে আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ২৯ জানুয়ারি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই যেকোনো দিন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্বের অন্যান্য সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয়, বাংলাদেশেও একইভাবে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, আমরা কোনো প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করবো না। সম্পূর্ণ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন জাতিকে উপহার দেব।
বেঠক সূত্র জানায়, বৈঠকে দলের সংসদ সদস্যদের সতর্ক করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সকল সংসদ সদস্যের আমলনামা আমার কাছে রয়েছে। কে কী করছেন সব রিপোর্ট আমার কাছে রয়েছে। এসব আমলনামা, নিজস্ব জরিপ এবং তৃণমূল নেতাদের ভোটের ভিত্তিতেই আগামীতে মনোনয়ন দেয়া হবে। যাদের সঙ্গে এলাকার সংগঠনের নেতাকর্মীদের যোগাযোগ নেই, তারা আগামীতে মনোনয়ন পাবেন না।
নির্বাচন প্রসঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সদ্য সমাপ্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নির্বাচনের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন হয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশ যুক্তরাজ্যেও প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নির্বাচন হয়েছে। মার্কিন নির্বাচনে বারাক ওবামা জিতলেও যুক্তরাজ্যে টনি ব্লেয়ার হেরে গেছেন। আমাদের দেশেও জনগণ যাকে ভোট দেবে সে-ই ক্ষমতায় আসবে। জনগণের যেকোনো রায় আমরা মেনে নেব। কিন্তু জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেব না। নির্বাচনে কেউ কোনো অনিয়ম বা কারচুপির চেষ্টা করলে সে আমার দলের হলেও তা সহ্য করা হবে না। আমার দলের কেউ করলেও তাকে দল থেকে বহিষ্কার এবং ওই আসনের নির্বাচন স্থগিতের আবেদন করবো নির্বাচন কমিশনে। তবে কোনো ষড়যন্ত্রের কাছেই কষ্টার্জিত গণতন্ত্রকে নস্যাত হতে দেব না।
শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদীয় দলের বৈঠকে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ছাড়াও বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন আতিউর রহমান আতিক, মনোয়ার হোসেন চৌধুরী, আবু জাহির, এ্যাডভোকেট তারানা হালিম, অধ্যক্ষ মতিউর রহমান প্রমুখ।
সূত্র জানায়, বৈঠকে দলের সিনিয়র নেতারা দলের সাংগঠনিক শক্তিকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, গত চার বছরে বর্তমান সরকার সারাদেশেই ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। কিন্তু শুধু উন্নয়ন দিয়েই আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া যাবে না। এরজন্য প্রয়োজন শক্তিশালী সাংগঠনিক শক্তি। তাই নির্বাচনী বছরে নির্বাচনের প্রস্তুতির পাশাপাশি সারাদেশেই দলকে ঢেলে সাজাতে হবে। অন্য সংসদ সদস্যরা তাদের নিজ নিজ এলাকার বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন।
জানা গেছে, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে বলেন, দেশের জনগণকে আমি যা কথা দেই, তা পূরণ করি। পদ্মা সেতুও আমরা নির্মাণ করবো। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু নির্মাণে কোনো দুর্নীতির কথা বলতে পারেনি, বলেছে দুর্নীতির চেষ্টা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা বিশ্বব্যাংকের জন্য অপেক্ষা করছি। দ্রুতই এ ব্যাপারে তাদের সিদ্ধান্ত না আসলে আমরা নিজেরাই এ সেতু নির্মাণ করবো।
প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বলেন, নিজস্ব উদ্যোগে পদ্মা সেতু নির্মাণে আমরা পূর্বের নকশা অনুযায়ী অতো সুন্দর হয়তো করতে পারব না, তবে পদ্মা সেতু হবেই। ভারতের মঞ্জুরিকৃত ২শ’ কোটি ডলার আমরা এখাতে ব্যবহার করতে পারি। এছাড়া মালয়েশিয়া, চীনসহ কয়েকটি দেশেরও প্রস্তাব রয়েছে। আমরা সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে দ্রুতই পদ্মা সেতু নির্মাণের পদক্ষেপ নেব।
সূত্র জানায়, বৈঠকে পদ্মা সেতু নির্মাণ ইস্যুতে ‘হাসান-হোসেনের’ বিষয়টি এমপিরা তুললে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজনকে ছাড়তে আর আরেকজনকে ধরার প্রস্তাব দেয়া হয়। আবুল হাসান চৌধুরীর নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, একজন মন্ত্রীর কাছে কাজ পাওয়ার জন্য গেলেন। অথচ সে দোষী না হয়ে যার কাছে গেল অর্থাত্ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন দোষী হলো। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে অনিয়মের জন্য যদি ধরতেই হয় তবে একজন নয়, হাসান-হোসেন দু’জনই গ্রেফতার হবেন।
বৈঠকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুতে নিজ নিজ এলাকায় জনমত গঠন এবং দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে কেন্দ ীয় কর্মসূচি সফল করার জন্য দলের সংসদ সদস্যদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেন।
সিটি কর্পোরেশন হচ্ছে ময়মনসিংহ
সূত্র জানায়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ময়মনসিংহকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার ঘোষণা দেন। উল্লেখ্য, গত ৩ জানুয়ারি ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত এক জনসভায়ও শেখ হাসিনা ময়মনসিংহকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এছাড়া আগামীতে ক্ষমতায় আসলে ঢাকার দৃষ্টিনন্দন হাতিরঝিলে ‘অপেরা হাউস’ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন।