নৈরাজ্য নয়, সংসদে এসে কথা বলুন

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান, বর্তমান সংসদ ও সরকারের মেয়াদের শেষ বছরে এসে বয়কট, জ্বালাও পোড়াও সংঘাত নৈরাজ্য বন্ধ করার জন্য বিরোধী দল বিএনপির প্রতি আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আপনাদের যাবতীয় অভিযোগ, প্রস্তাব, সুপারিশ ও মতামত সংসদের ভেতরে এসে বলুন। গণতন্ত্রকে বিকশিত হতে সহায়তা করুন। কোন বিশেষ অবস্থানে আটকে থেকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত জিইয়ে রাখা কিংবা সংসদ বয়কটের ব্যাপারে অনমনীয় থেকে জনগণ কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব পালন না করা গণতান্ত্রিক আচরণের পরিপন্থী। গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদে নতুন বছরের প্রথম অধিবেশনে দেয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, নিজেদের জনগণের প্রতিনিধি ও সেবক হিসেবে গ্রহণ করলে বিরোধী দলের কর্তব্য ছিলো জাতীয় সংসদে এসে তাদের দায়িত্ব পালন করা এবং সংসদের ভেতরে ও বাইরে সংবিধান সংশোধনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে গঠনমূলক আলোচনায় অংশগ্রহণ করে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য প্রধান বিরোধী দল গত চার বছর ধরে সংসদীয় কর্মকাণ্ডে নিয়মিতভাবে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থেকে তাদের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান আরো বলেন, আমি প্রধান বিরোধী দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংগে বৈঠকের পর একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দিয়েছি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ প্রথম আলোচনার প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে একটি স্বাধীন নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। যারা নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে পরিচালিত সংলাপে যোগ দিয়েছেন তাদেরকে ধন্যবাদও জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বর্তমান নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্বে ও আমাদের সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আগামীতে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য সংসদীয় নির্বাচন উপহার দিতে সক্ষম হবো। রাষ্ট্রপতি বলেন, অতীত থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এসেই শুরু করেছিলো প্রতিহিংসার রাজনীতি। কিন্তু বিশ্বের ইতিহাস বার বার প্রমাণ করেছে সন্ত্রাসের রাজনীতি কখনও সমাজ ও অর্থনীতির জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। জোট সরকারের ধ্বংসাত্মক রাজনীতি জন্ম দিয়েছিলো একটি ভবনকেন্দি ক গণবিরোধী তত্পরতার। এতে সক্রিয় হয়ে উঠেছিলো বিভিন্ন ধরনের সিন্ডিকেট। মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ। গড়ে উঠেছিলো মূল ধারার অর্থনীতির সাথে আরেকটি অর্থনীতি, সরকারের মধ্যে সরকার এবং রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্রের। কিন্তু বিকৃত হয়েছিলো পুরো সমাজ কাঠামোর। রাষ্ট্রপতি বলেন, এদেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, কৃষক শ্রমিক, নারী পুরুষ, তরুণ যুবকরা এ বিপদগামীতা ও বিকৃতি সহ্য করেনি। যে কারণে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা সৃষ্টি করেছিলো আরেক ইতিহাস। রাষ্ট্রপতি তার বক্তব্যের শুরুতে সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এছাড়া তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধে শহীদসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এছাড়া তার বক্তব্যে বর্তমান মহাজোট সরকারের গত চারবছরে বিভিন্ন খাতের সফলতা তুলে ধরেন। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের পর উপস্থিত সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে তাকে সমর্থন জানান। শীতকালীন অধিবেশন শুরু ২০১৩ সালে এটাই প্রথম অধিবেশন। এ অধিবেশনকে শীতকালীন অধিবেশনও বলা হয়ে থাকে। স্পীকার এডভোকেট আব্দুল হামিদের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া এ অধিবেশনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এসব ব্যক্তিরা হলেন-সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ডক্টর ইয়াজউদ্দিন আহমেদ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দর কুমার গুজরাল, সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম মিয়া, এডভোকেট এ কে এম শামসুল হুদা, কাজী সাহাবুদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ হায়দার আলী, সৈয়দ মোর্শেদ কামাল, আঞ্জুমান আরা জামিল, মুফতি ফজলুল হক আমিনী, আবু ছালেক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ নির্মল সেন, জাতীয় অধ্যাপক ডাক্তার নূরুল ইসলাম, শিক্ষাবিদ খান সরওয়ার মুরশিদ। এরপর সামরিক শাসনামলে জারি করা কিছু অধ্যাদেশ আইন করে কার্যকর করতে সেগুলোর কয়েকটি সংসদে উত্থাপন করা হয়। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিষ্টার শফিক আহমেদ অধ্যাদেশগুলো উত্থাপন করেন। এরপর রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর সংসদের বৈঠক আগামী বুধবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়। এর আগে স্পীকার এডভোকেট আব্দুল হামিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কার্যউপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে সংসদের অধিবেশন ছয় মাস পর্যন্ত চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এছাড়া রাষ্ট্রপতির এ ভাষণের ওপর সংসদে ৪০ ঘন্টা আলোচনার সিদ্ধান্তও হয়েছে এ বৈঠকে।