মৌসুম শেষে দাম বাড়ল ধানের

মৌসুম শেষে দাম বাড়ল ধানের। অথচ মাত্র এক-দেড় মাস আগে আমনের ভরা মৌসুমে যখন প্রান্তিক কৃষকের গোলায় ছিল ধান, তখন প্রতি মণ বিক্রি করতে হয়েছে ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫৮০ টাকায়। প্রতি মণ ধানে কৃষককে লোকসান গুণতে হয়েছে ১শ’ থেকে দেড়শ’ টাকা। অথচ মাত্র এক-দেড় মাসেই পাল্টে গেছে চিত্র। বর্তমানে দেশের হাটবাজারে প্রতি মণ মোটা ও মাঝারি মানের ধান ৬১০ থেকে ৭০০ টাকা ও সরু ধান ৭৬০ থেকে ৮৫০টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে ধানের দাম বাড়লেও মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে প্রান্তিক কৃষকরা ফসল ফলিয়েছে, তারা লাভবান হচ্ছে না। কারণ, তারা লোকসান দিয়ে আগেই ধান বিক্রি করে দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কয়েকটি কারণে ধান-চালের দাম বাড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে, সরকারের চাল রপ্তানির চিন্তা-ভাবনা, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, ঘন কুয়াশা ও শীতের কারণে মিলারদের চাহিদা মতো চাল উত্পাদন করতে না পারা। এছাড়া ঠাণ্ডায় অনেক জায়গায় বীজতলা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অনেকেই ভাবছেন আগামী বোরোর ফলন ভালো হবে না। ফলে বড় বড় ধান ব্যবসায়ী ও জোতদার কৃষকরা বাড়তি দামের আশায় ধান বিক্রি করছে না। ফলে মোকামে ধানের আমদানি অনেক কমে গেছে। আর ধানের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে চালের বাজারের উপর। গত ১৫ দিনের ব্যবধানে রাজধানীতে চালের দাম মানভেদে কেজিপ্রতি ৩ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গতকাল রবিবার রাজধানীতে চালের বড় পাইকারীবাজার বাবুবাজারের পাশাপাশি কাওরানবাজার, নিউমার্কেট ও মহাখালী বাজারে খোঁজ নিয়ে দাম বাড়ার এই চিত্র পাওয়া যায়। বর্তমানে রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে মানভেদে মোটা চাল ৩০ থেকে ৩৪ টাকা, বিআর-২৯ চাল ৩৪ থেকে ৩৫ টাকা, বিআর-২৮ চাল ৩৮ থেকে ৪০ টাকা, মিনিকেট ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা, নাজিরশাইল ৪৫ থেকে ৪৭ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চালের দাম বাড়া প্রসঙ্গে পাইকারীবাজার বাবুবাজারের চাল ব্যবসায়ী হাজী আব্দুল করিম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি আবহাওয়া প্রতিকূল থাকায় মোকাম থেকে চাহিদামতো চাল সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই দাম বেড়েছে। তবে আবহাওয়া ভালো হলে দাম কিছুটা কমবে বলে আশা করছি। কেননা, জ্বালানি তেলের দাম বাড়া ছাড়া এই মুহূর্তে চালের দাম বাড়ার অন্য কোন কারণ নেই। রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা দীপক কুমার কর জানান, ১৫ দিনের ব্যবধানে রায়গঞ্জে মণপ্রতি ধান-চালের দাম বেড়েছে দেড়শ’ থেকে দুইশ’ টাকা। গতকাল রায়গঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে মোটা ও মাঝারি ধান ৬১০ থেকে ৬৮০ টাকা ও সরু ধান ৭৬০ থেকে ৮১০ টাকা মণদরে বিক্রি হয়েছে। অথচ ১৫ দিন আগে মোটা ও মাঝারি ধান ৫১০ থেকে ৫৪০টাকা ও সরু ধান ৫৮০ থেকে ৬২০ টাকা মণ দরে বিক্রি হয়েছে। এছাড়া চাল মোটা ও মাঝারি চাল ১ হাজার ২শ’ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা মণের স্থলে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৪২০টাকা। সরু চাল ১ হাজার ৪৫০ থেকে ১ হাজার ৬২০টাকা মণের স্থলে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬৫০ থেকে ১ হাজার ৮৪০টাকা। প্রান্তিক কৃষক সিমলা গ্রামের আব্দুস ছাত্তার, চান্দাইকোনা গ্রামের নজরুল আকন্দ ও নিমগাছি গ্রামের রমেশ চন্দ মাহাতো জানান, মৌসুমের শুরুতেই পানির দামে তাদের ধান বিক্রি করা হয়ে গেছে। ধান আছে এখন ব্যবসায়ী ও বড় জোতদারদের গোলায়। দাম বৃদ্ধির কারণ হিসাবে চান্দাইকোনা বাজারের চাল ব্যবসায়ী এরশাদ আলী ও চাতাল ব্যবসায়ী সমর সরকার জানান, ধানের দাম বৃদ্ধির কারণেই চালের দাম বেড়েছে। বড় বড় মজুদদাররা এখন বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এছাড়াও বাজারে বীজ কোম্পানিগুলোর বেপরোয়া ধান ক্রয়ের কারণেও ধানের দামে একটা প্রভাব পড়েছে। শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া জানান, আবহাওয়া অনুকূলে না থাকা ও মোকামে ধানের আমদানি কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন অজুহাতে গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বগুড়ার শেরপুরে বস্তা প্রতি (সাড়ে ৯৩কেজি) সব ধরনের চালের দাম ৪৫০টাকা থেকে ৫৫০টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে না আসা পর্যন্ত চালের দাম বাড়া অব্যাহত থাকবে বলে সংশ্লি¬ষ্টরা জানিয়েছেন। আবার ওএমএস চালুর নির্দেশ চালের দাম বাড়ায় সারাদেশে আবারও পুরোদমে ওএমএস চালুর নির্দেশ দিয়েছে সরকার। এ প্রসঙ্গে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহমদ হোসেন খান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, আগে চালের দাম কম থাকায় শুধু বরিশাল ও রংপুর বিভাগে ওএমএস বন্ধ ছিল। এছাড়া অন্যান্য বিভাগে বন্ধ করা হয়নি, ওএমএস’র চাল বিক্রি না হওয়ায় কমিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন চালের দাম কিছুটা বাড়ায় আবার পুরোদমে ওএমএস চালুর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, ওএমএস’এ প্রতি কেজি চাল বিক্রি করা হয় ২৪ টাকা দরে।