পাহাড় ধসিয়া মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি কাম্য নহে

বলিতে গেলে দুর্যোগের মৌসুম আসিয়াই পড়িয়াছে। মহাদুর্যোগের রূপ ধারণ করা ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’ ঘাড়ের উপর গনগনে নিশ্বাস ফেলিতেছে। এদিকে বর্ষামৌসুম আসিতেও খুব একটা দেরি নাই। সব মিলাইয়া, ব্যতিক্রমহীনভাবে আবারও ফিরিয়া আসিয়াছে পাহাড় ধসিয়া প্রাণহানির পুরনো আতঙ্ক। সেই আতঙ্ক কেবল বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও সিলেটের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নহে। সারাদেশের মানুষই ইহা লইয়া গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। কারণ দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য যে, পাহাড় ধসিয়া মৃত্যু যেন একটি অপরিবর্তনীয় চক্রাকার নিয়মে পরিণত হইয়াছে। এমনকী ২০০৭ সালে পাহাড় ধসিয়া চট্টগ্রামে শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশুর জীবন্ত সমাধি হইবার পর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া সারাদেশ তোলপাড় হইলেও পরিস্থিতির খুব একটা হেরফের হইয়াছে এমনটি জোর গলায় বলা যাইবে না। অবশ্য তখনই উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠিত হইয়াছিল। সেই কমিটি ঘটনার কারণসমূহ চিহ্নিত করিয়া সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশও পেশ করিয়াছিল সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট। সুপারিশের আলোকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জোরালো অঙ্গীকারও পাওয়া গিয়াছিল সরকারের তরফ হইতে; কিন্তু তাহার পর একযুগ অতিক্রান্ত হইতে চলিয়াছে। পাহাড়ে মৃত্যুর মিছিল থামে নাই। ফলে প্রতি বত্সর এই সময়ে প্রশাসনের দৌড়ঝাঁপ যেমন বাড়িয়া যায়, তেমনি চড়িতে থাকে দেশবাসীর উত্কণ্ঠার পারদও।

সেই উত্কণ্ঠারই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়াছে সম্প্রতি চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায়। পাহাড়ে বসবাসকারীদের তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করিয়া সভায় জানানো হয় যে, নগরের সরকারি-বেসরকারি ২৮টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ১৭টি পাহাড়ে এখনো বসবাস করিতেছে ৮৩৫টি পরিবার। আরও উদ্বেগের বিষয় হইল, এইসকল পাহাড়ে অবৈধভাবে গ্যাস, বিদ্যুত্ এবং পানির সংযোগও দেওয়া হইয়াছে। আদায় করা হইতেছে মোটা অঙ্কের ঘরভাড়া। এমনকী  কয়েকটি পাহাড়ে সরকারি টাকায় প্রকল্প গ্রহণ করিয়া সড়ক ও ড্রেন নির্মাণ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। এই সবকিছুর নেপথ্যে রহিয়াছে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহল।  তাহাদের দাপটে বারবার বাধাগ্রস্ত হইতেছে উচ্ছেদ কার্যক্রম। অবস্থাদৃষ্টে খোদ চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কণ্ঠেও ক্ষোভ ও হতাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়াছে। তাহারা সরকারি সংস্থা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড ও চট্টগ্রাম ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশে খোলাখুলিই বলিয়াছেন যে, প্রয়োজনে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হইবে। যত প্রভাবশালীই হউক না কেন, কাউকেই কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হইবে না। সভায় ১৫ দিনের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ১৭টি পাহাড় অবৈধ দখলমুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে গত একযুগের তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের পক্ষে পুরাপুরি শঙ্কামুক্ত হওয়া কঠিন। অতীতেও বারবার অনুরূপ সতর্কবার্তার পাশাপাশি সময়সীমা বাধিয়া দেওয়া হইয়াছিল; কিন্তু তাহার ফলাফল তো আমাদের চোখের সম্মুখেই রহিয়াছে। অতএব, শুধু সতর্কবার্তাই যথেষ্ট নহে, সেই সতর্কবার্তা যাহাতে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়—তাহাও নিশ্চিত করিতে হইবে।  আমরা পাহাড় ধসিয়া আর একটিও অনভিপ্রেত মৃত্যুর ঘটনা দেখিতে চাহি না।