বহুতল ভবনে আগুন কেন এমন হচ্ছে?

একোনো ঘটনা ঘটে গেলে অবশ্যই তাত্ক্ষণিক মোকাবিলার প্রয়োজন, কিন্তু পাশাপাশি এই ঘটনার কারিগরি বিশ্লেষণ অত্যন্ত জরুরি। কারণ প্রতিটি দুর্ঘটনার ভেতর লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যত্ সমাধানের ইঙ্গিত। তাই আমি যেমন কাছ থেকে দেখেছি রানা প্লাজা, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া পুরনো ঢাকার চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, তেমনি ঐ দিন গিয়েছিলাম এফ আর টাওয়ার পরিদর্শনে। বুঝতে চেয়েছিলাম কেন এমন হচ্ছে, কোথায় ভুল হয়ে যাচ্ছে আমাদের। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম নাজমুল ইমাম, ড. আশিক মোহাম্মদ জোয়ারদার ও আমাদের সহযোগী মুহাম্মদসহ অন্যদের নিয়ে ভবনটি পরিদর্শনে যাই। আমরা খুব কাছে থেকে কারিগরি দৃষ্টিতে দুর্ঘটনা পরবর্তী এফ আর টাওয়ার ভবনটি সরেজমিনে পর্যালোচনা করি। সম্ভবত বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো ভবনের অগ্নিকাণ্ড বিশ্লেষণে ফায়ার ডায়নামিক সিমুলেশনের সহযোগিতা নেওয়া হলো। আমরা জনস্বার্থে পুরো ঘটনাটির একটি কারিগরি বিন্যাস করি এবং আমি মনে করি যা জানতে পারলাম তার কিছুটা হলেও জনসমক্ষে তুলে করা প্রয়োজন। যেহেতু বিষয়টি কারিগরি, জনগণের কাছে সহজবোধ্য করার জন্য প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তা উপস্থাপন করা হলো।

   আগুন লাগলো কেন?

প্রথমেই আগুন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নেওয়া দরকার। আগুন সৃষ্টি হয় তিনটি উপাদানের উপর ভিত্তি করে—  ক) দাহ্য পদার্থ খ) অক্সিজেন এবং গ) তাপ। একেই বলে অগ্নি-ত্রিভুজ (Fire Triangle)। এই তিনটির কোনো একটি যদি উপস্থিত না থাকে, আগুন লাগবে না। এফ আর টাওয়ারের অষ্টম তলায় ছিল অনেক পরিমাণে দাহ্য পদার্থ, যেমন কাগজ, প্লাস্টিক, আসবাবপত্র, দাহ্য ফলস সিলিং, কার্পেট, পর্দা ইত্যাদি। সব মিলেই সেখানে বিরাজ করছিল উচ্চমাত্রার আগুনের ঝুঁকিও। ঘটনার দিন কোনো এক উপায়ে তাপ সংযোজিত হয়ে অগ্নি-ত্রিভুজ সম্পন্ন হয়ে যায়। হতে পারে সেটা কোনো বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে অথবা তাপ উত্পন্নকারী কোনো যন্ত্র ব্যবহারের কারণে।

আগুন তো লাগলো নিচের কয়েকটা তলায় পরে নেভানোও হলো, কিন্তু উপরের তলার অনেক লোক আহত বা মারা গেলেন কেন?

কোনো দাহ্য পদার্থ যখন আগুনে পোড়ে, তখন তা অনেক সময় সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যায় না এবং  ফলশ্রুতিতে ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। এই ধোঁয়া বাতাসের চাইতে হালকা হওয়ায় উপরের দিকে ধাবিত হয়।  এফ আর টাওয়ারের খোলা সিঁড়ি দিয়ে ওই ধোঁয়া উপরের দিকে যায়, তাই ঐ সিঁড়ি ব্যবহারকারীরাও আক্রান্ত হন। একই পথে উপরের তলাগুলোতে পৌঁছে যায়। দাহ্য গ্যাস কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস এবং জলীয়বাষ্প মিশ্রিত এই ধোঁয়া উপরের খোলা কক্ষগুলোতে পৌঁছে যায়, ঘাটতি তৈরি হয় অক্সিজেনের। অক্সিজেনের অভাবেই শ্বাসক্রিয়া বন্ধ হয়ে অনেকে মারা যান উপরের তলাগুলোতে এবং সিঁড়িতে। তাই অগ্নি নিরাপদ ভবন ডিজাইনের আরেকটি অন্যতম দিক হচ্ছে স্থাপত্য ডিজাইনের মাধ্যমে ধোঁয়া পরিবহনে বাধা সৃষ্টি করা বা বিস্তার সীমিত করা।

 এফ আর টাওয়ারে অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম কি ছিল?

এফ আর টাওয়ারে দেখা যায় অগ্নিঘন্টা বা ফায়ার অ্যালার্ম, ফায়ার এক্সটিংগুইসার, হোস পাইপ, গেট ভাল্ব ইত্যাদি সবই ছিল প্রতি তলায়। আবার বেজমেন্টের ওয়াটার রিজার্ভার বা আধারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পানির পাম্প, কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই সরঞ্জামাদি বন্ধ ছিল একটি তালাবদ্ধ খাঁচার ভেতর। কার দায়িত্ব ছিল এই তালা খুলে পাম্প চালু করা, কেউ জানে না আর কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাই ছিল না। তাই শেষ পর্যন্ত কিছুই কাজে আসলো না। এমনকি প্রথম বেজমেন্টে ওয়াটার রিজার্ভার এর সাথে সরাসরি যুক্ত করা ছিল ফায়ার ব্রিগেডের ব্যবহার্য ওয়াটার পয়েন্ট। এটা সচল রাখা ভবন ব্যবস্থাপনা দলের দায়িত্বেই পড়ে। নিয়মিত ড্রিল হলে অব্যবস্থাপনা হয়তো-বা দূর হতো।

সিঁড়ি তো বুঝি কিন্তু অগ্নিনিরাপদ/ জরুরি নির্গমন সিঁড়ি কী?

অগ্নিনিরাপদ সিঁড়ি এমন একটি সিঁড়ি যা কিনা বহুতল ভবনের যেকোনো এক বা একাধিক তলায় আগুন লাগলেও ভবনের সকল ব্যবহারকারী নির্বিঘ্নে ওই সিঁড়ি ব্যবহার করে ভবন থেকে বের হয়ে জীবন রক্ষা করতে পারবেন। এটা ইট বা কংক্রিটের দেয়াল দ্বারা আবদ্ধ, সাধারণ নির্মাণ সামগ্রী দিয়েই তৈরি একটি সিঁড়িঘর, তবে ঢোকার দরজা হতে হবে অগ্নিনিরোধক, অন্তত এক থেকে দুইঘন্টা অগ্নিমাত্রা বা আগুন সহনীয়। এর উদ্দেশ্য, অন্তত ঐ সময় অবধি দরজাটি আগুনে পুড়ে নষ্ট হবে না এবং এই সময়ের মধ্যেই সবাই এই ভবন থেকে বের হয়ে যেতে পারবেন। কখনোই  এই দরজায় তালা ঝোলানো যাবে না।

বহুতল ভবনে আগুন লাগলে নেভানোর দায়িত্ব কার? জরুরি নির্গমন নিশ্চিত করবে কে? কোথায়-বা যাবো আমরা?

বহুতল ভবনে আগুন লাগলে প্রথম পর্যায়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগুন নেভানোর দায়িত্ব ভবনের নিজেরই এবং ভবনে নিয়োজিত ফায়ার ওয়ার্ডেন ও তার দলের। জরুরি নির্গমনের ব্যাপারে নির্দেশনা পাওয়া যাবে ভবনের ফায়ার কমান্ড রুম থেকে এবং ব্যবহারকারীরা সজাগ হবেন অগ্নি ঘন্টার শব্দ শুনেই। পরবর্তী পর্যায়ে ফায়ার ব্রিগেডের লোকেরা এসে আগুন নেভাবেন এবং জরুরি উদ্ধার কাজ সম্পন্ন করবেন। এই সময় ভবনের সবাই নির্গমন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে পূর্ব নির্ধারিত একটি খোলা স্থানে বা অ্যাসেম্বলি পয়েন্টে সমবেত হবেন এবং পরবর্তী নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করবেন।

দেখা যায় ফায়ার ব্রিগেডের সিঁড়িগুলো ১৫-১৬ তলা পর্যন্তই যাচ্ছে, তাহলে সুউচ্চ বহুতল ভবনগুলোর কি হবে?

ঢাকা শহরের বেশিরভাগ ভবনকে হাইরাইজ বলা যায় না, মিডরাইজ বলা চলে। পঞ্চাশ থেকে একশ তলা বা তারও অধিক তলায় আগুন লাগলে ফায়ার ব্রিগেডের মই দিয়ে আগুন ফাইট করা যায় না। ভবনে নিয়োজিত স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র অগ্নিনির্বাপণের কাজে ব্যবহূত হয় যেমন হিট সেন্সর, স্মোক সেন্সর, গ্যাস সেন্সর, ওয়াটার স্প্রিং লার, ফোম, স্বয়ংক্রিয় স্মোক ভেন্ট, ফায়ার স্ক্রিন, ওয়েট রাইজার, ফায়ার হস, ফায়ারম্যানস লেফট  ইত্যাদি। এই সকল নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাপনা বাদ দিয়ে নিছক জমির মূল্য বা জমির সর্বাধিক ব্যবহার নিশ্চিত করার স্বার্থে বহুতল ভবন নির্মাণ করা একেবারেই উচিত নয় বা অন্যায় বলা চলে, তা সেটা দেশের যেখানেই হোক।

 পুরানো আইনে নির্মিত ভবনে নতুন আইন কিভাবে কার্যকর হবে? আদৌ কি প্রযোজ্য হবে?  ভবনে নিরাপত্তা সংক্রান্ত নতুন আইন হলে আমরা জানবো কিভাবে বা কেই-বা কাকে জানাবে?

ভবন যতই পুরানো হোক, নতুন আইন প্রবর্তন হলে জননিরাপত্তার স্বার্থে ঐ আইন বলবত্ হয়ে যায়। তাই পুরানো ভবনগুলোকে রেট্রোফিটিং-এর মাধ্যমে যথাসম্ভব পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করে নিরাপদ ব্যবহার উপযোগী করে তুলতে হবে। যেমন—  ভবনে খোলা  সিঁড়ি থাকলে দেয়াল দিয়ে ঘিরে অগ্নি নিরাপদ দরজা লাগিয়ে ঠিক করতে হবে। কিংবা অগ্নি নিরাপত্তা সিঁড়ি না থাকলে সেই সিঁড়ি স্থাপন করা। 

শুনেছি ভবনের অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামাদি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাহলে কি করা যায়?

এখন কিছু কিছু অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামাদি দেশেই তৈরি হয়, তবে তার পরেও অনেক যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় বলে অনেকটা ব্যয়বহুল, বিশেষ করে  স্বয়ংক্রিয় ফায়ার ফাইটিং ব্যবস্থাপনার সরঞ্জামাদি। অর্থ মন্ত্রণালয় তথা সরকার এখানে রেয়াতের ব্যবস্থা করে বা আমদানি কর লাঘব  করে অনেকটা সহজলভ্য করতে পারেন। এতে করে রাষ্ট্রের খানিকটা রাজস্ব ঘাটতি হলেও, এমন দুর্ঘটনা থেকে অনেক প্রাণ রক্ষা করা যাবে।

 দুর্ঘটনা মোকাবিলায় অনেক বাহিনী যুক্ত হতে দেখা যায়, অনেকটা বিছিন্ন বা সমন্বয়হীনভাবে। এমন দুর্ঘটনা মোকাবিলায় আরো কি করার আছে?

কোনো ঘটনা মোকাবিলার জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয় হচ্ছে সমন্বিত  উদ্যোগ,  গভীর পর্যালোচনা ও প্রায়োগিক মূল্যায়ন।  এ কাজটি শুধু করতে পারেন একটি আন্তঃবিভাগীয় কুশলী দল বা  ট্যাক্টিক্যাল টিম (Tactical Team), যারা সরাসরি অগ্নিনির্বাপণ করবেন না বা উদ্ধার কাজ করবেন না,  অনেকটা দূরে অবস্থান করেই সম্পূর্ণ ঘটনার পর্যালোচনা করবেন, তথ্য সংগ্রহ করবেন, প্ল্যানিং করবেন এবং দিক নির্দেশনা দিবেন। মনে রাখতে হবে, প্রতিটা দুর্ঘটনাই কিন্তু ইউনিক বা অতুলন, অনেক অনুশীলন করেও অজানা বা নতুন পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে। তাই সেখানে সাহস, নিষ্ঠা আর প্রযুক্তির পাশাপাশি  অধিকতর মেধা প্রয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনেই এমন  দক্ষ ট্যাক্টিক্যাল টিম গঠন করা যেতে পারে। এই দল দেশের সকল ধরনের দুর্ঘটনা বা অঘটন মোকাবিলায়ও  সহায়ক হবে। এ দল তৈরি করতে খুব একটা বড় আকারের অর্থ লগ্নির ব্যাপার নেই, শুধু দরকার নীতিমালা, পূর্বপরিকল্পনা ও সমন্বয়ের।

দুর্ঘটনা ঘটলেই, আমরা খুঁজতে থাকি চটজলদি সমাধান। এখানেই বিপত্তি। আমরা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিন্যাসের আগেই কার্যকারণকে ব্যক্তিত্ব আরোপ করি। তারপর খুঁজে বের করার চেষ্টা করি কে সেই ব্যক্তি, তারপর ধরপাকড় এবং পরিশেষে শাস্তি। তারপর ভুলে যেতে থাকি ঘটনাটিকে। কিন্তু প্রতিনিয়ত উপেক্ষা করি, ঘটনাগুলোর মধ্যে নিহিত সমাধানের ইঙ্গিত, অবকাশ থেকে যায় আরো জানার, আরো বোঝার, কিছু করার। তাই ঘটনাগুলো থেকে আমাদের শিখতে হবে, পরিবর্তন আনার জন্য। এগিয়ে চলার জন্য।

n লেখক : অধ্যাপক ও স্থপতি, বুয়েট