আমার ছোট ভাই
প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:২১
ওরা দু’ ভাই বোন খেলছিল। বানু বড়। বয়স তিন বছর। তার ছোট ভাইয়ের নাম বাদল। মা কাছে না থাকলে বানু ভাইকে কোলে তুলে আদর করে। কত কথা বলে ভাইয়ের সঙ্গে। ভাই শুধুই হাসে। মা দেখতে পেয়ে ছুটে আসে।
বলে, ‘ওরে ফেলে দিবি তো! আর একটু বড় হ। তারপর ভাইকে সারাদিন কোলে নিয়ে থাকবি।’
মা ভাইকে কোলে নিয়ে কত আদর করে। চোখে কাজল পরিয়ে কপালের পাশে একটা টিপ দিয়ে দেয়। কাছে বসে সব দেখে বানু। ভাই কী সুন্দর হাসে মায়ের কথা শুনতে শুনতে। তারপর দুধ খেয়ে ঘুমিয়ে যায়।
বানু বারান্দায় গিয়ে বসে। টবে লাল গোলাপ ফুটেছে। লাউ গাছের পাতায় কেমন সুন্দর রোদ। মন খারাপ বেশিক্ষণ থাকে না ওর। সেই শালিক পাখিটা আজও এসে বসেছে বারান্দার গ্রীলে। ডাকাডাকি করে চলে গেল। বানুকে দেখে চলে যায়। কোথায় থাকে ও? কেমন করে টের পায় যে মন খারাপ করে বানু বারান্দায় এসেছে? ওর গলাটা খুব সুন্দর। তাই ওকে দেখলেই বানুর মন ভালো হয়ে যায়। বানুর ইচ্ছে হয় ওর সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু ওতো শুধু ডাকাডাকি করে আবার হঠাত্ উড়ে চলে যায়।
বানু আবার ঘরে এসে ঢোকে। দেখে বাদল তখনও ঘুমুচ্ছে। ওর মুখজুড়ে একটা হাসি যেন ছড়ানো। গ্রামে নানা বাড়িতে ওর যখন জন্ম হয় খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। নানী তাই ওর নাম রেখেছেন বাদল। বানু ভাইকে দেখে খুব খুশি হয়েছিল।
মা’কে বলেছিল, ‘ও আমার সঙ্গে কথা বলবে, খেলবে তাই না মা?’
মা উত্তর দিয়েছিল, ‘হ্যাঁ। ও একটু বড় হোক তারপর তোমার কাছে ছড়া শুনবে, গান শুনবে। তোমার সঙ্গে কথা বলবে।’
শুনে তো বানু খুব খুশি। ভাইয়ের জন্য গান শিখেছে। ছড়া মুখস্থ করেছে। অবশ্য সবই মায়ের কাছে আর টেলিভিশনে শুনেছে।
বাদল এখন বসতে পারে। শুধু হাসে আর চারদিকে তাকায়। মুখ দিয়ে কোন শব্দ করতে পারে না। মা বলে, ‘আর ক’দিন যাক। ও এখনও ছোট্ট সোনা।’
বানু ঠোট বাঁকা করে জিজ্ঞেস করে, ‘কবে বড় হবে মা? কবে আমার সঙ্গে কথা বলবে?’
মা তাকে কাছে টেনে আদর করে বলে,‘আর একটু বড় হোক। হাঁটতে শিখুক। নিশ্চয় কথা বলবে।’
বানু ভাইয়ের মাথার চুলে হাত বুলোয়। কী সুন্দর ঘন কালো চুল তার। বাদল মাথা নাড়তে নাড়তে হাসে।
ওকে বানু ডাকে, ‘ও আমার সোনাভাই। আমার কুটু ভাই। তুমি গান শুনবে? আচ্ছা এবার তোমাকে গান শোনাবো।’
বাদল মাথা নাড়তে নাড়তে হাসে। বানু তাকে গান গেয়ে শোনায়, ‘আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী ...।’
দুই.
দুপুর বেলা মা ঘুমিয়েছিল। বানু বসে বসে খাতায় হাতের লেখা শেষ করে এক থেকে একশত পর্যন্ত লিখছিল। বাবা এসে দেখবে। রোজ তাকে এখন লেখাপড়া করতে হয়। বাবা বলেছে আগামী বছর বানুকে স্কুলে ভর্তি করে দেবে। স্কুলে যেতে হবে রোজ। নীচের তলায় থাকে ঝুমু, কাজল আর দীপ্ত। ওরাও রোজ বইয়ের ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যায়। স্কুলে অনেকক্ষণ থাকতে হয়। কিন্তু বাদলকে অনেকক্ষণ না দেখে সে থাকবে কী করে?
বাবা সেদিন বাদলকে কোলে নিয়ে কথা বলছিল, ‘এই যে খোকা বাবু, বলো বাবা। বা বা বা, বা। একবার বলো বা বা বা বা বা বাবা।’
বাদল শুধু হাসতেই থাকলো। মাথা নাড়তে থাকলো। বাবার দিকে তাকালই না। আবার হাসতে থাকলো। আপন মনে।
বাবা মাকে ডেকে বললো, ‘খোকা কবে কথা বলতে শিখবে?’
মা হেসে উত্তর দেয়, ‘শিখবে। মাত্র সাত মাস হলো। বসতে শিখেছে। হামাগুড়ি দিবে, তারপর হাঁটতে শিখবে।’
বাবা বলে, ‘ডাক্তারের কাছে নিয়ে চলো একদিন দেখিয়ে আনি। সেদিন হঠাত্ খিঁচুনি উঠলো কেন একবার দেখানো দরকার।’
‘ও বাচ্চাদের অমন হয়।’
বাদলের হঠাত্ জ্বর হলো। বানু তার কপালে হাত রেখে বলে ওঠে ‘ও মা, ভাইয়ের গা যে খুব গরম। এত্তো জ্বর?’
বাবা ওষুধ খাওয়ায়। মা মাথায় পানি ঢেলে দেয়। জ্বর একবার কমে তো আবার বাড়ে। এরমধ্যে আবার চোখ মুখ কাঁপিয়ে কেমন ঘুমিয়ে গেল। অনেকক্ষণ পর চোখ মেলে তাকায়। মা তাকে বোতলের দুধ খাওয়ায়।
বানুর একটুও ভালো লাগে না। ভায়ের জন্য মন খারাপ হয়ে থাকে। বারান্দায় গিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। শালিক পাখিটা সন্ধ্যা বেলা আসে না। আজ অবশ্য আকাশে গোল চাঁদ উঠেছে। তার আলো এসে পড়েছে বারান্দায়। ফুলগুলো গাছে গাছে দুলছে।
চাঁদের দিকে তাকিয়ে বানু বলে, ‘ও চাঁদ মামা, আমার ভাইকে তুমি ভালো করে দাও। ওকে তুমি বড় করে দাও। আমি ওকে ছড়া শেখাবো গান শেখাবো।’
ঘরে এসে দেখে ভাইকে নিয়ে মা-বাবা খুব ব্যস্ত। বানু ভেতরে গিয়ে খাবার টেবিলে বসে গ্লাসে পানি ঢেলে খায়। তারপর বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়তেই ঘুম নেমে আসে দু’চোখে।
তিন.
পরদিন বানুকে ঝুমুদের বাসায় রেখে মা-বাবা ভাইকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলো। ভাইয়ের জ্বর নেই, তবে কেমন ক্লান্ত হয়ে শুয়ে থাকে। শুধু হাসে আর চোখ মেলে এদিক ওদিক তাকায়। ঝুমুদের সঙ্গে বসে বসে কার্টুন ছবি দেখেছে বানু্ খালাম্মা ওদের ন্যুডলস রান্না করে খাওয়ালেন। ভাইকে নিয়ে মা-বাবা অনেক দেরী করে ফিরলো। বেশি রাত হয়ে যাওয়ায় ভাই ঘুমিয়ে পড়েছিল।
পরদিন সকালে উঠে ভাইয়ের কাছে গিয়ে দেখে সেই আগের মত বসে বসে হাসছে। আর মাথা নাড়ে। বানু একটা আঙ্গুল ভাইয়ের হাতের আঙ্গুলে মুঠিবদ্ধ করে জিজ্ঞেস করে, ‘কেমন আছ ভাই?’
ভাই তার আঙ্গুল নিয়ে খেলে। আবার মুখে ঢুকিয়ে কামড়াতে থাকে, চুষতেও থাকে। বানুর খুব ভালো লাগে। ভাইয়ের মুখের লালা মুছিয়ে দেয় সে। মাকে ডাকে ‘ও মা ভাইকে খেতে দাও।’
বানু নাশতা খেয়ে বই খাতা নিয়ে বসে। হাতের লেখা শেষ করে বর্ণমালা বই খুলে পড়তে বসে জোরে জোরে উচ্চারণ করে। হঠাত্ বানু শুনতে পায় ভাই ‘আ আ’ শব্দ করে ডাকে। বানু ভাইয়ের কাছে গিয়ে ভালো করে শোনে। তারপর চীত্কার করে মাকে ডাকে ‘ও মা মা আসো। ভাই শব্দ করে ডাকছে।’
মা রান্নাঘর থেকে ছুটে আসে। বাদলকে কোলে তুলে খুশি ভরা কণ্ঠে বলে, ‘সত্যি! সত্যি তুই শুনেছিস?’
বানু বলে, ‘হ্যাঁ মা আমি স্পষ্ট শুনেছি। আমি ক খ গ ঘ ঙ পড়ছিলাম, তখনই ও আ আ আ শব্দ করছিল।’
বানুর কথা শুনে মা ওকে কত রকম শব্দ ও কথা শোনালো। কিন্তু বাদল আর কোন শব্দ করলো না। শুধু মায়ের ঘাড়ে মাথা রেখে দু’চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লো। মা ওকে বিছানায় শুইয়ে দিলে।
সন্ধ্যার পর ঘুমের মধ্যে আবার খিঁচুনি হলো বাদলের। মা-বাবা দুজনেই কাছে বসে থাকলো। খিচুনি থামলে মা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। বাবা ওকে সোজা করে শুইয়ে দিলেন। মা নীরবে কাঁদছিল। বানু মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। মনটা তারও খারাপ হয়ে যায়। ছোট্ট সোনা ভাইটার এমন অসুখ হলো কেন?
চার.
স্কুলে ভর্তি হয়েছে বানু। ভোর সাতটায় বাবা তাকে দিয়ে আসে। আবার বেলা এগারোটায় স্কুল ছুটি হলে মা তাকে ঘরে নিয়ে আসে। মায়ের কোলে চড়ে বাদলও তাকে আনতে যায়। বাইরে নিয়ে গেলে বাদল খুব খুশি হয়। তাকিয়ে তাকিয়ে সব কিছু দেখে। আর শুধুই হাসে।
বাদল এখন হামাগুড়ি দেয়, দাঁড়াতেও পারে। বিছানা থেকে নেমে পড়ে যায় মেঝেতে। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে একটা চেয়ার বা মোড়া ধরে দাঁড়ায়। আর ঠেলতে চেষ্টা করে। মা বলে, ‘করুক। একসময় ঠিক হাঁটতে পারবে।’ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেই আবার ধপ করে বসে পড়ে বাদল। বসেই শব্দ করে কাঁদতে শুরু করে।
মায়ের পাশে বসে বানু বলে, ‘ওমা শুনছ”?
মা’ও কান পেতে শোনে। তার সারা মুখে যেন বিশ্বজয়ের হাসি ছড়িয়ে পড়ে। মা চোখ বন্ধ করে কী যেন ভাবে। বলে ‘হ্যাঁ শুনেছি।’
অফিস থেকে ফিরে বাবা সেদিন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল বাদলকে। মায়ের সঙ্গে ঘরেই ছিল বানু। টিভিতে কার্টুন ছবি দেখতে দেখতে হঠাত্ ঘুম নেমে এসেছিল। ঘুম যখন ভাঙ্গলো তখন দেখে সে বিছানায় শুয়ে আছে। নিশ্চয় মা শুইয়ে রেখে গেছে। বানু মশারীর ভিতর দেখে বিছানায় বাবাও নেই।
রাতে মা তাকে আজ খাইয়েও দেয়নি। এখন যে তার খুব ক্ষিধে পেয়েছে। মা’কে ডাকবে কী? বাবা বাদলকে নিয়ে ফিরেছে নিশ্চয়। মা তাকে নিয়ে ব্যস্ত আছে। এখন গিয়ে খেতে চাইলে মা কী রাগ হবে?
কদিন থেকে মা কেমন যেন হয়ে গেছে। তার প্রতি লক্ষ্যই রাখে না। শুধু রান্না বান্না আর বাদলকে নিয়েই ব্যস্ত। তাকে খাওয়াচ্ছে ঘুম পাড়াচ্ছে। আর মাঝে মাঝে উদাস মুখ নিয়ে বসে। চোখ বেয়ে শুধু কান্না ঝরে? মা কেন এতো কাঁদে? মায়ের কী খুব কষ্ট হয়?
বাবা একদিন তাকে ‘দুয়োরাণী-সুয়োরাণী’ গল্প শোনাচ্ছিল, তখন বলেছিল ‘দুয়োরাণীর খুব কষ্ট তাই সে খুব কাঁদতো?’ মাকে মনে হয় তার সেই দুয়োরাণী।মায়ের জন্য বুক জুড়ে একটা ব্যথা বাজে বানুর। তাকে দেখবার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে সে।
বিছানা থেকে নেমে পাশের ঘরে ঢুকে দেখে বাদল মশারীর ভিতর ঘুমুচ্ছে। মুখ জুড়ে তার ফুলের মত হাসি। যেন কত শান্তির ঘুম। বানু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাকে দেখে। খুব মায়া হয় তার ছোট্ট ভাইটির জন্য। মনে মনে বলে ‘আমার ছোট্ট ভাই। আমার সোনা ভাইটি। তুমি বড় হয়ে, উঠো। তুমি ভালো হয়ে ওঠো। তোমাকে আমি কত আদর করবো।’
ঘর থেকে বের হয়ে বানু খাবার টেবিলে গিয়ে বসে। পানি ঢেলে খায়। দেখে আবুর মা টেবিলে রাতের খাবার সাজিয়ে রেখে গেছে। মা-বাবা কেউ খায়নি। রান্নাঘরেও তো কেউ নেই। ড্রইংরুমে ঢুকেও দেখে কেউ নেই। কিন্তু টিভিতে কার্টুন ছবি চলছে তখনও।
বারান্দায় যাবার দরোজায় দাঁড়িয়ে সে দেখতে পায় মা-বাবা অন্ধকারে বসে আছে। বাবার কোলে মাথা রেখে মা কাঁদছে। আর বলছে, ‘আমাদের ভাগ্যটা এমন হলো কেন?’
বাবা তাকে সান্তনা দিচ্ছে, ‘ছি: দুঃখ করো না। এমন করে বলতে নেই। ডাক্তার তো বলেছে চিকিত্সা, চলতে থাকুক। একদিন নিশ্চয় সুস্থ হবে কথা বলবে।’
মা কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘আর কবে বলবে?’
বাবা বলে, ‘খেয়াল রাখতে হবে যেন খিঁচুনি না হয়। ওষুধ খাওয়াতে হবে ঠিকমত। খিঁচুনি হলেই ওর মাথায় বুদ্ধি নষ্ট হবে। বুদ্ধিহীন শিশু হবে। আর যদি ভালো হয় তো ভালোই। ডাক্তার বলেছে কথা বলতেও পারে, তবে অস্পষ্ট হবে। একটু বড় হলে ওর আচরণ দেখে সব বোঝা যাবে।’
বাবার গলায়ও ব্যথা বাজে। বানু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব শোনে। তার দু’চোখ ভেঙ্গে যেন পানি ঝরতে থাকে। মনে মনে বলে, ‘আমার লক্ষ্মী ভাইটি সারাজীবন বুদ্ধিহীন হয়ে থাকবে, কখনও ভালো হবে না।’
বানু কাছে গিয়ে মা-বাবার গলা জড়িয়ে ধরে। মায়ের চোখের পানি মুছিয়ে দিতে দিতে
শুধু বলে, ‘মাগো, আমি ভাত খাবো। আমায় খাইয়ে দিবে ।’
মা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে।