জৌলুস হারাচ্ছে রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলো
প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১৩
লেকভর্তি স্বচ্ছ পানি। সবুজ গাছপালার সমারোহ। পরিকল্পিত ও সুপরিসর রাস্তাঘাট। এসবই ছিল একদিন ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী আর বারিধারা আবাসিক এলাকার আকর্ষণ। আর সে কারণেই তুলনামূলক স্বচ্ছল ও বিত্তবান মানুষদের বসতি গড়ে উঠে এসব পরিকল্পিত আবাসিক এলাকায়। নগরবাসীর কাছে এগুলো পরিচিত হয়ে উঠে অভিজাত এলাকা হিসাবে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে দৃশ্যপট অনেকটাই পাল্টে গেছে। এসব এলাকার শান্ত-নিরিবিলি পরিবেশ উধাও হয়ে গেছে বহু আগেই। কোলাহলের দিক থেকে মতিঝিল-দিলকুশা কিংবা পল্টন-ফকিরাপুলের সঙ্গে কোনোই অমিল নেই ধানমন্ডি বা গুলশান-বনানীর। বরং আজকাল নগরীর অন্য যে কোনো অংশের চেয়ে কথিত এসব অভিজাত এলাকায় যানজট সমস্যা অনেক বেশি প্রকট। ক্রমাগত বাণিজ্যিকীকরণ আর নানামুখী দূষণের প্রতিক্রিয়ায় ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী ও বারিধারার মতো এলাকাগুলো দিন দিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। নগরীর কেন্দ্রস্থল থেকে বেশ খানিকটা দূরে অবস্থান হলেও দূষণ এবং বাণিজ্যিকীকরণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না উত্তরা মডেল টাউনও। অতীতে বিভিন্ন সময়ে সরকারি উদ্যোগে গড়ে তোলা এসব এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষায় কর্তৃপক্ষের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই বললেই চলে। এ পরিস্থিতিতে রাজধানীর অভিজাত এলাকাসমূহের বাসিন্দাদের অনেকেই ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য নতুন আবাসিক এলাকার সন্ধান করছেন।
প্রসঙ্গত, পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে তত্কালীন কনস্ট্রাকশন্স অ্যান্ড বিল্ডিং ডিপার্টমেন্টের (সিঅ্যান্ডবি) উদ্যোগে গড়ে তোলা হয় রাজধানীর অন্যতম প্রধান পরিকল্পিত অভিজাত এলাকা ধানমন্ডি। এরপর পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে তত্কালীন ঢাকা ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্টের (ডিআইটি) উদ্যোগে গড়ে তোলা হয় গুলশান ও বনানী আবাসিক এলাকা। উত্তরাধিকার সূত্রে ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার মালিক বর্তমান গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং গুলশান ও বনানী আবাসিক এলাকার মালিক বর্তমান রাজউক। পরবর্তীকালে রাজউকের উদ্যোগেই গড়ে উঠে বারিধারা আবাসিক এলাকা, নিকুঞ্জ ও উত্তরা মডেল টাউন। এ পর্যায়ে রাজউকের উদ্যোগে আরো কয়েকটি আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। তাছাড়া এক সময়ের গৃহসংস্থান অধিদপ্তরের (বর্তমানে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ) উদ্যোগে তুলনামূলক সীমিত আয়ের লোকদের বাসানের জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও লালমাটিয়া আবাসিক এলাকা।
ধানমন্ডির একাধিক প্রবীণ বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিষ্ঠালগ্নে এটি ছিল রাজধানীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও কোলাহলমুক্ত আবাসিক এলাকা। স্বচ্ছ পানির লেকের দুই ধারে সুপরিসর সড়কগুলোর পাশে এখানকার বড় বড় প্লটগুলোতে ছিল দৃষ্টিনন্দন একতলা ও দোতালা বাংলো বাড়ি। তুলনামূলক নিরিবিলি পরিবেশের কারণে আশপাশের বিভিন্ন এলাকার লোকজন বৈকালিক ভ্রমণের জন্য ধানমন্ডি এলাকায় আসতো। কিন্তু আজকাল সেই দৃশ্য কল্পনা করাও দুঃসাধ্য। একতলা কিংবা দোতলা বাড়ি এখন ধানমন্ডি এলাকায় খুঁজে পাওয়া মুশকিল। অসংখ্য বহুতল ভবনের ভিড়ে এলাকার প্রবীণদের কাছে এ যেন এক অচেনা ধানমন্ডি। প্রতিটি সড়কে দিনভর তীব্র যানজট এখন এই এলাকার বাসিন্দাদের নিত্যসঙ্গী। অবস্থা এমন হয়েছে যে, ধানমন্ডিকে এখন ‘শপিং সেন্টার জোন’ বললেও ভুল হবে না। এছাড়া রয়েছে অনেক হাসপাতাল, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ এবং বিভিন্ন বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের হেড অফিস। সবমিলিয়ে আবাসিক চেহারা উধাও হয়ে ধানমন্ডি এখন রাজধানীর ব্যস্ততম এক বাণিজ্যিক এলাকার নাম।
অন্যদিকে রাজউকের আওতাধীন বনানী আবাসিক এলাকার বাণিজ্যিকীকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয় আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। সে সময় প্রধানত কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ সংলগ্ন বিভিন্ন সড়কে আবাসিক বাড়ির বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয়। শুরুর দিকে জনশক্তি রপ্তানিকারক ও গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা এসব বাড়িতে অফিস পরিচালনা করতো। কিন্তু পর্যায়ক্রমে এই ধারা সমগ্র বনানী ও গুলশান এলাকায় সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে বনানী ও গুলশানে এমন কোনো সড়ক খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে আবাসিক প্লটে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড চলছে না। রাজউক কর্মকর্তাদের চোখের সামনেই গুলশানের বিভিন্ন সড়কে আবাসিক প্লটে গড়ে উঠেছে বড় বড় হোটেল, রেস্তোরাঁ, শপিং মল ইত্যাদি। এমনকি রাজউকের অনুমোদিত নকশা ভঙ্গ করে বিপুল সংখ্যক ইমরাতও তৈরি হয়েছে গুলশান-বনানীতে। ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময় রাজউকের পক্ষ থেকে এ ধরনের অট্টালিকার তালিকা তৈরি করে সেগুলো ভেঙ্গে দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে শেষ পর্যন্ত তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ ধরনের ঘোষণার মাধ্যমে কার্যত রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অবৈধ অর্থ উপার্জনের সুযোগ করে দেয়া হয়।
ধানমন্ডি, গুলশান ও বনানী আবাসিক এলাকার বাণিজ্যিকীকরণের এই ধারা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে বারিধারা এবং উত্তরা মডেল টাউন এলাকায়ও। গুলশান আবাসিক এলাকার বাসিন্দা আনোয়ারুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, পরিস্থিতির যেভাবে অবনতি হচ্ছে তাতে এই এলাকায় আর বেশিদিন বসবাস করা যাবে না। বাড়ির আশপাশের সবগুলো প্লটেই বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়ে গেছে। এ কারণে ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের বসবাসের জন্য ইতিমধ্যেই পূর্বাচলে নতুন জায়গা কিনেছি। ভবিষ্যতে তারা সেখানেই বসতবাড়ি গড়ে তুলবে। তবে পূর্বাচল আবাসিক এলাকা বসবাসের উপযোগী হতে আরো কতদিন লাগবে, তাও এক বড় প্রশ্ন।
এ বিষয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, রাজধানীর আবাসিক এলাকাগুলোর চেহারা পাল্টে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করার উপায় নেই। এরমধ্যে ধানমন্ডির অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। গুলশান-বনানীও একই পথে যাচ্ছে। অতীতে রাজউকের নির্লিপ্ততার সুযোগেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আবাসিক এলাগুলোর পরিবেশ একদিনেই তো নষ্ট হয়নি। রাজউক যদি শুরুর দিকেই জোরালো পদক্ষেপ নিতো, তাহলে আজকের অবস্থা সৃষ্টি হতো না। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে রাতারাতি উদ্ধার হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে আইন ভঙ্গের এই ধারা থামানোর লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ইতিমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রয়োজনে রাজউকের কর্মকাণ্ডকে আরো জোরদার এবং কঠোর করা হবে।